অসহায় আত্মসমর্পণ!
শ্রীলঙ্কার কাছে বাংলাদেশের হারকে আপনি এই দুই শব্দ দিয়েই ব্যাখ্যা এবং বর্ণনা করতে পারেন। প্রথমে বোলিংয়ে। পরে ব্যাটিংয়ে। দুই বিভাগেই শ্রীলঙ্কার ‘বি’ টিম উড়িয়ে দিল বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে। আর এই ব্যর্থতায় ক্রিকেট দল প্রথমবারের মতো এশিয়ান গেমসের কোনো আসর থেকে শূন্য হাতে ফিরছে, পদক হারিয়ে!
একটু পেছনের ইতিহাসে ফিরে যাই। ২০১০ সালে এশিয়ান গেমসে ক্রিকেটের অভিষেকে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল স্বর্ণপদক জিতেছিল। ২০১৪ সালে সেই রংবদলে হয়ে গেল রুপা। ২০২৩ সালে মিলল ব্রোঞ্জ। আর এবার ২০২৬ এ অর্জনের ঘর ফকফকে ফাঁকা। ক্রিকেটে পদকশূন্য হয়ে ফিরছে বাংলাদেশ দল।
প্রথমে পাকিস্তানের কাছে সেমিফাইনালে পরাজয়। তারপর ব্রোঞ্জের লড়াইয়ে শ্রীলঙ্কার কাছে হার। ব্যর্থতা এবং ব্যর্থতা—এবারের এশিয়ান গেমস ক্রিকেটে বাংলাদেশের ফাইলে তাই লেখা হয়ে গেল।
দুই ম্যাচে বাংলাদেশ যে মানের ক্রিকেট খেলল তাতে আরেকবার প্রশ্নটা সামনে এলো—এই দল কি টি-টোয়েন্টি খেলাই ভুলে গেল! ১৬৫ রান তাড়ায় নেমে বাংলাদেশের প্রথম তিন ব্যাটার শূন্য রানে আউট। তানজিদ তামিম, সাঈফ হাসান ও লিটন দাস—শুরুর এই তিন ব্যাটার সবমিলিয় খেললেন ৯টি। তাদের সম্মিলিত সংগ্রহ শূন্য!
মূলত এই ম্যাচের ভাগ্য সেখানেই লেখা হয়ে গেল। পারভেজ হোসেন ইমন, তাওহিদ হৃদয় ও ইয়াসির আলী রাব্বী—তিনজনেই দুই অঙ্কে পৌঁছালেও ব্যাট হাতে তাদের শক্তপোক্ত কিছু মনে হয়নি। শুরুর তিনজন উইকেটে গিয়েই আউট হন চটজলদি। পরের তিনজন উইকেটে সেট হয়ে ফিরলেন।
পার্থক্য কেবল এটুকুই! ১০ ওভারের আগেই দলের স্কোর ৬০ রানে ৬ উইকেট নেই। এই ম্যাচের কাহিনির কার্যত ওখানেই ‘দি এন্ড’! বাকি সময়টা কেবল হারের সুনির্দিষ্ট রান সংখ্যা জানার অপেক্ষা আর কী! ৯ নম্বরে ব্যাট করতে নেমে নাসুম আহমেদ ধুমধাম মেরে ২৮ বলে ২৬ রান করায় দলের স্কোর তিন অঙ্ক পার করল। নাসুমের রানই বাংলাদেশ ইনিংসের সর্বোচ্চ!
কোটার পুরো ওভারও খেলতে পারেনি বাংলাদেশ। ১৭.৩ ওভারে ১০২ রানে অলআউট। হারের ৬৩ রানের ব্যবধানই জানাচ্ছে এই ম্যাচে বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা জাগাতে পারেনি বাংলাদেশ। অথচ ম্যাচের শুরুটা কি দারুণই না হয়েছিল! শ্রীলঙ্কার প্রথম চার ব্যাটার সিঙ্গেল ডিজিটে আউট। স্কোরবোর্ডে মাত্র ২১ রান জমা হতেই শ্রীলঙ্কার শুরুর চার উইকেট নেই। পাওয়ার প্লেতে শ্রীলঙ্কা ৪ উইকেট হারিয়ে তুলল মাত্র ২৯ রান। কিন্তু ড্যামেজ কিভাবে কন্ট্রোল করতে হয়, তার দারুণ উদাহরণ দেখাল শ্রীলঙ্কার মিডলঅর্ডার ব্যাটাররা। অধিনায়ক শাহান আর্চচিগে ৩৭ বলে ৩৩ রানের ইনিংস খেলে শুরুর সেই ধাক্কা সামাল দিলেন। আর সাত নম্বরে ব্যাট করতে নামা থারিন্দু রত্নায়েকে খেললেন ম্যাচসেরা ইনিংস। তার ৫ ছক্কা ও ৭ বাউন্ডারিতে ৩২ বলে ৬৫ রানের ইনিংস শ্রীলঙ্কাকে বড় স্কোরের পথে নিয়ে গেল।
২০ ওভারের ম্যাচকে দুই ভাগ করে শ্রীলঙ্কা যে সুদক্ষ পরিকল্পনায় ব্যাটিং ইনিংস সাজাল সেখানেই হেরে গেল বাংলাদেশের বোলিং। শুরুতে উইকেট হারানোয় শ্রীলঙ্কা প্রথম ১০ ওভারে রক্ষণে নামল। এ সময় তাদের স্কোর ৪ উইকেটে ৫১। আর উইকেটে সেট হয়ে শেষের ১০ ওভারে যা করল তাতেই ম্যাচে উড়ে গেল বাংলাদেশ। মাত্র ২ উইকেট হারিয়ে তুলল ১১৪ রান। হিসাব জানাচ্ছে শেষের ১০ ওভারে শ্রীলঙ্কার ওভারপ্রতি জোগাড় ১৪ রান। এই খরুচে সেশনে বল হাতে আরেকবার ব্যর্থ হলেন মুস্তাফিজুর রহমান। আগের ম্যাচে ২ ওভারে খরচা গুনেছিলেন ৪১ রান। এবার তিন ওভারে তার ব্যয় হলো ৪৩ রান। এর মধ্যে এক ওভারেই তার খরচা হলো ২৫ রান! ম্যাচে সেটাই তার প্রথম ওভার! ওয়াইড নো বল মিলিয়ে সেই ওভারে মুস্তাফিজ করলেন ১১ বল! উইকেটে যথেষ্ট বাউন্স পেলেন কিন্তু লেন্থ এবং নিশানায় গলদ করেই গেলেন। মুস্তাফিজকে এভাবে মার খেতে দেখে নার্ভাস হয়ে গেলেন স্পিনার রিশাদ হোসেনও। পরের ওভারে তিনি রান দিলেন ১৬। এই দুই ওভারে ৪১ রান খরচাই বাংলাদেশকে ম্যাচ থেকে ‘খরচ’ করে দিল!
যে শ্রীলঙ্কাকে একসময় মনে হচ্ছিল তিন অঙ্কে পৌঁছাতে পারবে কি না, সেই দলই শেষের ধন্ধুমার ব্যাটিংয়ে ১৬৫ রান জমা করল স্কোরবোর্ডে। শেষের ৬ ওভারে শ্রীলঙ্কার সংগ্রহ ছিল ৬১ রান। একটু মনে করিয়ে দিই, শুরুর পাওয়ার প্লেতে তাদের রান ছিল মাত্র ২৯। শেষের মারমার ব্যাটিং এবং বাংলাদেশের ভুল বোলিং পরিকল্পনায় শ্রীলঙ্কা পৌঁছে গেল অনেক উঁচুতে ১৬৫ রান চূড়ায়।
বাংলাদেশের পুরো ব্যাটিং সেই উঁচু চূড়া ছুঁতে পারেনি।
প্রথম ওভারে ২৫ রান খরচা করলেও এই ম্যাচে মুস্তাফিজকে আরো দুই ওভার বোলিংয়ে রাখেন অধিনায়ক লিটন দাস। তিন নম্বর ওভারে দুই উইকেট পেলেও মুস্তাফিজের ৪৩ রান খরচা জানিয়ে দিল এই উইকেটে বোলিং ছিল ভুল লেন্থ, কৌশল ও পরিকল্পনায় ভরা।
স্পিন সহায়ক উইকেটে নাসুম আহমেদের দুই ওভার কেন জমা রেখে দিলেন অধিনায়ক, সেটাও বোঝা গেল না। নাসুম তার ২ ওভারে মাত্র ৮ রান দেন। তারপরও তাকে আর বোলিংয়ে ডাকলেনই না অধিনায়ক। অভিষেক ম্যাচে স্পিনার আলিস আল ইসলাম ৪ ওভারে ১৮ রানে ১ উইকেট পান। কিন্তু দলীয় ব্যর্থতায় সেই সাফল্য উদযাপনের উপায় যে নেই।
এশিয়ান গেমস ক্রিকেটে বাংলাদেশের এই দলের রেজাল্ট শিটের ঘরে লাল রঙে বড় বড় অক্ষরে লেখা একটা শব্দ—ফেল!
সংক্ষিপ্ত স্কোর
শ্রীলঙ্কা : ২০ ওভারে ১৬৫/৯ (রত্নায়েকে ৬৫, আরাচাগে ৩৩, বান্দারা ১৮; মেহেদী ২/১৯, সাইফ ২/২৮, মুস্তাফিজ ২/৪৩, রিশাদ ১/৪৬)।
বাংলাদেশ : ১৭.৩ ওভারে ১০২ (নাসুম ২৬, ইয়াসির ২১, পারভেজ ২০, হৃদয় ১১, রিশাদ ১০ থুসারা ২/১৮. রত্নায়েকে ২/১৮, ভিসাকান্ত ২/২৬, সাহান ২/১৭)।
ফল : শ্রীলঙ্কা ৬৩ রানে জয়ী।