ফুটবল শুধু ৯০ মিনিটের খেলা নয়। কখনো এটি হয়ে ওঠে সীমান্ত, রাজনীতি, ক্লান্তি আর ভাগ্যের বিরুদ্ধে এক দীর্ঘ লড়াই। ২০২৬ বিশ্বকাপে ইরানের গল্পটা ঠিক তেমনই। একটি দলের গল্প, যারা প্রতিপক্ষের বিপক্ষে যতটা লড়েছে, তার চেয়ে কম লড়েনি মাঠের বাইরের বাস্তবতার সঙ্গেও।
বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ৪৮ দলের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে অস্বাভাবিক প্রস্তুতি ছিল ইরানের। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে তারা যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বেস ক্যাম্প গড়তে পারেনি। আশ্রয় নিতে হয়েছে মেক্সিকোর সীমান্ত শহর তিজুয়ানায়। প্রতিটি ম্যাচের আগে সীমান্ত পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া, ম্যাচ শেষেই আবার মেক্সিকোতে ফিরে আসা—এই ছিল তাদের রুটিন। এমনকি দলের কয়েকজন লজিস্টিকস স্টাফও ভিসা জটিলতায় টুর্নামেন্টজুড়ে দলের সঙ্গে থাকতে পারেননি। কোচ আমির গালেনোয়ি একে বলেছিলেন, ‘বিশ্বকাপের সবচেয়ে নিপীড়িত দল’। অধিনায়ক মেহদি তারেমি আরো কঠোর ভাষায় বলেছিলেন, ‘ডিজাস্টার ওয়ার্ল্ড কাপ’।
তবু হাল ছাড়েনি টিম মেল্লি।
প্রথম ম্যাচে দুবার পিছিয়ে পড়েও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২-২ ড্র। এরপর শক্তিশালী বেলজিয়ামের বিপক্ষে দুর্দান্ত রক্ষণে গোলশূন্য সমতা। দুই ম্যাচে দুই পয়েন্ট নিয়ে শেষ ম্যাচে মিসরের বিপক্ষে নেমেছিল তারা। সমীকরণ ছিল সহজ—জিতলেই নিশ্চিত নকআউট।
কিন্তু ফুটবল কখনো কখনো সবচেয়ে নিষ্ঠুর গল্পও লিখে।
ম্যাচের শুরুতেই এগিয়ে যায় মিসর। এর খানিকবাদেই পেনাল্টি পায় ইরান। এগিয়ে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ। কিন্তু মেহদি তারেমির শট ফিরিয়ে দেন মিসরের গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইর। যদিও ফিরতি বলে রামিন রেজাইয়ান গোল করে সমতা ফেরান, তবু সেই পেনাল্টি মিস পরে আরো বড় আফসোস হয়ে ফিরে আসে।
এরপর ম্যাচ যত শেষের দিকে গড়িয়েছে, তত বেড়েছে উত্তেজনা। স্টপেজ টাইমে যেন স্বপ্নের দরজাটাই খুলে গিয়েছিল। যোগ করা তৃতীয় মিনিটে ফ্রি-কিকের পর সৃষ্ট জটলায় বল জালে পাঠিয়ে উল্লাসে মেতে ওঠেন শোজা খলিলজাদেহ। ইরানি বেঞ্চ ছুটে আসে, গ্যালারিতে সবুজ-সাদা-লাল পতাকা দুলতে থাকে।
তারপর...
কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা।
ভিএআরের ডাক।
স্ক্রিনে ভেসে ওঠে অফসাইড।
গোল বাতিল।
রিপ্লে বিশ্লেষণের পর দেখা যায়, আক্রমণের শেষ মুহূর্তে খলিলজাদেহের শরীরের যে অংশ দিয়ে তিনি বৈধভাবে গোল করতে পারেন, সেটির একটি অংশ মিসরের শেষ ডিফেন্ডারের চেয়ে সামান্য এগিয়ে ছিল। বিশেষ করে তার ডানপায়ের বুটের সামনের অংশটি অফসাইড লাইনের সামনে থাকায় আন্তর্জাতিক ফুটবলের আইন অনুযায়ী সেটিকে অফসাইড ধরা হয়। তাই দীর্ঘ পর্যালোচনার পর গোলটি বাতিল করে দেন ম্যাচ কর্মকর্তারা।
এক মুহূর্তেই উল্লাস বদলে যায় স্তব্ধতায়। যে গোল সরাসরি ইরানকে রাউন্ড অব ৩২-এ নিয়ে যেতে পারত, সেটিই হয়ে যায় তাদের সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন। আইএফএবির অফসাইড আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল, তবে ব্যবধান ছিল এতটাই সূক্ষ্ম যে, সেটি ইরানি ফুটবলপ্রেমীদের বুকে দীর্ঘশ্বাস হয়ে থেকে যাবে।
শেষ বাঁশি বাজতেই মিশর উৎসব করেছে। আর ইরানের খেলোয়াড়রা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন মাঠের ঘাসে। কেউ মাথা নিচু করে, কেউ আকাশের দিকে তাকিয়ে। তিন ম্যাচে তিনটি ড্র—একটিও হার নয়। তবু নকআউটের টিকিট নিজেদের হাতে রইল না। ভাগ্য ঝুলে গেল অন্য গ্রুপের ফলাফলের ওপর। ইতোমধ্যে সেই ফলাফল জেনে গেছেন দর্শকেরা।
একটি মিস করা পেনাল্টি, কয়েক মিলিমিটারের অফসাইড, হাজার কিলোমিটারের যাত্রা আর রাজনীতির অদৃশ্য দেয়াল। সব মিলিয়ে ইরানের বিশ্বকাপ যেন শেখাল, ফুটবলে কখনও কখনও সবচেয়ে বড় পরাজয় স্কোরলাইনে লেখা থাকে না; লেখা থাকে কয়েক সেকেন্ডের অপেক্ষায়, একটি উঁচু হয়ে ওঠা পতাকায়, আর বাতিল হয়ে যাওয়া এক টুকরো স্বপ্নে। ফুটবলের ইতিহাসে এমন অনেক দল আছে, যারা হারেনি; তবু জিততেও পারেনি। ইরান সেই তালিকায় আরেকটি নাম। তবে শেষ সময়ে এসে তাদের বিশ্বকাপ অভিযানের গল্পে সবচেয়ে বড় শব্দটি হয়ে রইলো ‘অফসাইড’।