টাইব্রেকারের স্পটে বল রাখতেই বোস্টনের গিলেট স্টেডিয়াম যেন নিশ্বাস আটকে অপেক্ষা করছিল। চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানির ভাগ্য তখন নির্ভর করছে একটি শটের ওপর। গোললাইনে দাঁড়িয়ে থাকা লম্বা দেহের মানুষটি জানতেন না, পরের কয়েক সেকেন্ডেই তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিনগুলো যেন নতুন অর্থ খুঁজে পাবে।
কাই হাভার্টজের শট বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে ঠেকালেন। পরে নিক ওল্টেমাডেকেও ফিরিয়ে দিলেন খালি হাতে। জার্মানি বিদায় নিল, আর প্যারাগুয়ে পেল নতুন এক জাতীয় নায়ক; ওরলান্ডো গিল। ম্যাচসেরার পুরস্কার হাতে নিয়ে যখন সাংবাদিকদের সামনে দাঁড়ালেন, তখনো কণ্ঠ কাঁপছিল তার। বললেন, ‘আমি অনেক লড়াই করেছি, কিন্তু কখনো হাল ছাড়িনি।’
কিন্তু এই গল্পের শুরু বিশ্বকাপে নয়।
শুরুটা ছিল এমন এক ঘরে, যেখানে অনেক রাতই কাটত ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা নিয়ে।
২০১৮ সালে গিল তখনো অপেশাদার ফুটবলের গণ্ডি পেরোতে পারেননি। নিজের শহর সান লরেঞ্জোর ক্লাবে সুযোগ না পেয়ে এক বুক স্বপ্ন নিয়ে আর্জেন্টিনায় পাড়ি জমান। নিশ্চিত কোনো চুক্তি ছিল না, নিশ্চিত ছিল না আগামীকালও। ছিল শুধু বিশ্বাস, একদিন হয়তো সুযোগ আসবে।
তারপর জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর পরীক্ষা।
স্ত্রী মেলিসা আভালোস সন্তানসম্ভবা। নির্ধারিত সময়ের আগেই জন্ম নেয় তাদের ছেলে লাউতারো। নবজাতককে রাখতে হয় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ)। চিকিৎসার খরচ বাড়ছিল প্রতিদিন, অথচ সংসারে অর্থ বলতে কিছুই ছিল না। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই সময়ের কথা লিখেছিলেন মেলিসা, ‘আমাদের কিছুই ছিল না। আমাদের ছেলেটা জীবনের জন্য লড়ছিল। আর ওর বাবা সব সময় ওর পাশেই ছিল। ক্লাবের দেওয়া পোশাক, বুট, এমনকি অনূর্ধ্ব-২০ জাতীয় দলের জার্সিটাও বিক্রি করে দিয়েছিল। স্মৃতি হিসেবে রাখার মতো কিছুই আর অবশিষ্ট ছিল না।’
একজন ফুটবলারের কাছে নিজের জাতীয় দলের জার্সি শুধু কাপড় নয়; সেটি স্বপ্নের স্মারক। গিল সেই স্মৃতিকেও বিক্রি করেছিলেন এক প্লেট খাবার আর ছেলের চিকিৎসার জন্য। একসময় ফুটবল তার কাছে আর পেশা ছিল না। হয়ে উঠেছিল বেঁচে থাকার উপায়।
ভাগ্য ঘুরতে শুরু করে ২০২৪ সালের শেষ দিকে। আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী ক্লাব সান লরেঞ্জো দে আলমাগ্রো প্রথমে তাকে রিজার্ভ দলে নেয়। পরে আর্থিক কারণে কিংবদন্তি গোলকিপার কেইলর নাভাসকে দলে আনতে না পারায় সুযোগ এসে পড়ে গিলের সামনে। সেই সুযোগ তিনি আর হাতছাড়া করেননি। একের পর এক দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে ক্লাবের এক নম্বর গোলকিপার হয়ে ওঠেন। অল্প সময়ের মধ্যেই ডাক পান প্যারাগুয়ে জাতীয় দলেও।
বিশ্বকাপে আসার আগে তাকে নিয়ে সংশয়ও ছিল। প্যারাগুয়ের কিংবদন্তি গোলকিপার হোসে লুইস চিলাভার্ট প্রকাশ্যেই সমালোচনা করেছিলেন। বলেছিলেন, গিল নাকি রক্ষণভাগের সঙ্গে যথেষ্ট কথা বলেন না। গিল কোনো জবাব দেননি। উত্তর জমা রেখেছিলেন মাঠের জন্য। জার্মানির বিপক্ষে সেই উত্তর ছিল নিখুঁত।
নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ে ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ সেভ। টাইব্রেকারে দুটি পেনাল্টি ঠেকানো। বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবার জার্মানিকে টাইব্রেকারে হারিয়ে শেষ ষোলোয় ওঠা। পুরো কীর্তির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন সেই মানুষটি, যিনি কয়েক বছর আগেও সন্তানের চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতে নিজের বুট বিক্রি করেছিলেন।
ম্যাচ শেষে যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কয়েক বছর আগের ওরলান্ডো গিলকে যদি কিছু বলতে হতো, কী বলতেন? তিনি একটু থেমে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আমি তাকে ধন্যবাদ দিতাম—হাল না ছাড়ার জন্য। আমি অনেক যুদ্ধ করেছি, কিন্তু কখনো বিশ্বাস হারাইনি। আজ সব ত্যাগের মূল্য পেয়েছি।’
ফুটবলে গোলের গল্প অনেক লেখা হয়। কিন্তু কিছু গল্প গোলের নয়; কিছু গল্প মানুষের। ওরলান্ডো গিলের গল্পটিও তেমনই, যেখানে এক বাবা নিজের স্বপ্ন বিক্রি করেছিলেন সন্তানের জীবন বাঁচাতে। আর সময় অনেক দেরিতে হলেও সেই মানুষটির হাতেই তুলে দিয়েছে আরেকটি স্বপ্ন; একটি জাতির বিশ্বকাপের আশা।