হোম > খেলা > ফুটবল বিশ্বকাপ

শেষ নৃত্য আজ কার?

স্পোর্টস ডেস্ক

বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল মানেই চাপ, স্বপ্ন আর ইতিহাসের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা। চলতি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের লড়াইও এসে দাঁড়িয়েছে সেই মাহেন্দ্রক্ষণে, যে মহারণের কেন্দ্রবিন্দুতে দুই অধিনায়ক লিওনেল মেসি ও হ্যারি কেইন। একজন ইতোমধ্যেই ফুটবল ইতিহাসের প্রায় সব ধাপ পেরিয়ে শিখর ছুঁয়ে ছুটছেন অমরত্বের মহামঞ্চের দিকে, অন্যজন এখনো অপেক্ষায় নিজের সবচেয়ে বড় স্বপ্নের। মেসি উত্তরাধিকারকে আরো উজ্জ্বল করতে চান, কেইন উত্তরাধিকার গড়ার পথে হাঁটছেন। বয়সের কাটা দুজনেরই পেরিয়েছে ঢের। আজকের সেমিফাইনাল তাই শুধু দুটি দলের নয়, দুই অধিনায়কেরও শেষ নৃত্যের সুর।

দুজনের পথচলা দুই ভিন্ন উপন্যাস। মেসির গল্প পূর্ণতার। আটবারের ব্যালন ডি’অর, চারটি চ্যাম্পিয়নস লিগ, অসংখ্য লিগ শিরোপা, কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা, আর ২০২২ সালের বিশ্বকাপ—ফুটবলে জেতার মতো আর কিছুই অবশিষ্ট নেই তার। একসময় যে ট্রফির জন্য সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হয়েছিলেন, সেই বিশ্বকাপই আজ তার মুকুটের সবচেয়ে উজ্জ্বল রত্ন। অন্যদিকে হ্যারি কেইনের গল্পটি অপূর্ণতার। গোলের পর গোল করেছেন, ক্লাব ও দেশের ইতিহাসে নিজের নাম লিখিয়েছেন, কিন্তু বড় কোনো আন্তর্জাতিক ট্রফি এখনো তার হাতে ওঠেনি। ইংল্যান্ডের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েও তিনি জানেন, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত গোলসংখ্যা দিয়ে নয়, লেখা হয় সোনালি ট্রফির আঁচে। যে আঁচ পেতে মুখিয়ে ইংলিশদের মহানায়ক।

মেসি ও কেইনের মধ্যে একটি মিল রয়েছে। দুজনেরই জাতীয় দলের জার্সির প্রতি অদ্ভুত এক দায়বদ্ধতা। মেসি বহুবার সমালোচিত হয়েছেন, অবসরও ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু আবার ফিরেছেন দেশের টানে। কেইনও বছরের পর বছর ইংল্যান্ডের স্বপ্ন নিজের কাঁধে বহন করে চলেছেন। ব্যর্থতার পরও দায়িত্ব এড়িয়ে যাননি কখনো। মেসির নেতৃত্ব নিঃশব্দ। তিনি খুব কম কথা বলেন, কিন্তু বল পায়ে পুরো দলকে বদলে দেন। কঠিন মুহূর্তে তার একটি পাস, একটি ড্রিবল কিংবা একটি সিদ্ধান্ত ম্যাচের গতিপথ পাল্টে দেয়। সতীর্থরা বারবার বলেছেন, ড্রেসিংরুমে তার উপস্থিতিই আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। কেইনের নেতৃত্ব অন্যরকম। তিনি কথা বলেন, নির্দেশ দেন, সামনে থেকে লড়াই করেন। শুধু গোল করেন না, মাঝমাঠে নেমে খেলা গড়েন, সতীর্থদের সুযোগ তৈরি করেন। আধুনিক স্ট্রাইকারের সংজ্ঞাই যেন নতুন করে লিখেছেন তিনি।

এই বিশ্বকাপে দুজনই নিজেদের প্রমাণ করেছেন। মেসি এখন আর আগের মতো প্রতি মুহূর্তে দৌড়ান না। বরং ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় উপস্থিত হয়ে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেন। ৩৯ বছর বয়সেও যেন সময়কে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছেন খুদে জাদুকর। টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত ছয় ম্যাচে আট গোল এবং একটি অ্যাসিস্ট। অর্থাৎ আর্জেন্টিনার ৯টি গোলে সরাসরি অবদান তার। গোল্ডেন বুটের লড়াইয়েও কিলিয়ান এমবাপ্পের সঙ্গে যৌথভাবে শীর্ষে অবস্থান করছেন। তবে অ্যাসিস্টের বিচারে আপাতত পিছিয়ে থাকায় আনুষ্ঠানিক তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন। শুধু গোলই নয়, আক্রমণে মেসির প্রভাবও চোখে পড়ার মতো। এই বিশ্বকাপে তিনি ২৯টি শট নিয়ে লক্ষ্যে রেখেছেন ১৬টি। বয়সের কারণে আগের মতো পুরো ম্যাচে দৌড়ান না, কিন্তু ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় উপস্থিত হয়ে ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা এখনো অটুট। মেসি এখন অনেক বেশি বুদ্ধিমত্তা দিয়ে খেলা নিয়ন্ত্রণ করেন। হাঁটতে হাঁটতেই প্রতিপক্ষের রক্ষণ বিশ্লেষণ করেন, তারপর একটি পাস, একটি ড্রিবল কিংবা একটি ফিনিশে ম্যাচের গল্পে মোড়। সেমিফাইনালেও মেসির প্রভাব মাঠজুড়েই থাকবে সেটা অনুমেয়।

হ্যারি কেইনও দারুণ ছন্দে রয়েছেন। ইংল্যান্ড অধিনায়ক ছয় ম্যাচে করেছেন ছয় গোল এবং একটি অ্যাসিস্ট। গোলে সরাসরি অবদান সাতটি। গোল্ডেন বুটের দৌড়ে তিনি রয়েছেন চতুর্থ স্থানে। এই বিশ্বকাপে ১৮টি শট নিয়েছেন, যার ৯টি ছিল লক্ষ্যে। তবে কেইনের অবদান শুধু গোলসংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। আধুনিক স্ট্রাইকার হিসেবে তিনি মাঝমাঠে নেমে খেলা তৈরি করেন, সতীর্থদের জন্য জায়গা তৈরি করেন এবং প্রয়োজনে নিজেই আক্রমণ শেষ করেন। টমাস টুখেলের কৌশলে তিনি একদিকে যেমন প্রধান গোলদাতা, অন্যদিকে আক্রমণভাগের সৃজনশীলতারও অন্যতম উৎস। তাই ইংল্যান্ডের আক্রমণের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তেই দেখা যায় কেইনের ছোঁয়া। ইংল্যান্ডকে ফাইনালে তোলার লড়াইয়েও কেইনের দিকেই পাখির চোখ থাকবে ইংলিশ দর্শকদের।

তবে এই সেমিফাইনালের আবেগের সবচেয়ে বড় জায়গা অন্যত্র। অনেকের বিশ্বাস, এটি হতে পারে দুই অধিনায়কেরই শেষ বিশ্বকাপ। মেসির বয়স এখন উনচল্লিশের কাছাকাছি, কেইনও ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছেন। চার বছর পর আরেকটি বিশ্বকাপ তাদের জন্য কতটা বাস্তবসম্মত হবে, তার নিশ্চয়তা নেই। তাই এই ম্যাচ শুধু একটি ফাইনালের টিকিট নয়, হয়তো একটি যুগের শেষ বড় সুযোগ। শেষ বাঁশি বাজার পর একজন এগিয়ে যাবেন বিশ্বকাপের আরেকটি ফাইনালের দিকে। অন্যজন ফিরে যাবেন দীর্ঘশ্বাসে ভেসে। মেসি বনাম কেইনের লড়াইটা তাই শুধু মহারণই নয়; দুই স্বপ্ন, দুই উত্তরাধিকার আর দুই জীবনের শেষ নৃত্যও।

ইংল্যান্ডের মূল ইঞ্জিন ‘ডেক্লান রাইস’ নিষ্ক্রিয় করার আর্জেন্টাইন ছক

ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা ম্যাচের টিকিটের দামে আগুন

আমরা সবাই এক সুতায় বাঁধা

‘হতাশা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন’, বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর এমবাপ্পে

ফ্রান্সকে বোতলবন্দি করে বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেন

আটলান্টায় অগ্নিপরীক্ষা আজ, আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড বারুদ ম্যাচ!

‘বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের মতো খেলতে পারিনি’

নিস্তব্ধ ছায়া থেকে সূর্যের আলো

‘এই দল ইতিহাস গড়তে চায়’, ফাইনালে উঠেই আত্মবিশ্বাসী দে লা ফুয়েন্তে

১০৫ মিটারের বোর্ডে দুই মাস্টারের যুদ্ধ