ব্রাজিল ১-১ মরক্কো
নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে শনিবার রাতের লড়াইয়ে জয় পায়নি কেউ। কিন্তু ম্যাচ শেষে করতালির বড় অংশটাই যেন ছিল মরক্কোর জন্য। স্কোরলাইন বলছে ১-১। অথচ এই ম্যাচের পুরো অংশজুড়ে লেখা হলো মরক্কোর মুগ্ধতার গল্প । বিশ্বফুটবলের নতুন শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরো একবার দৃঢ়ভাবে জানিয়ে দিল আটলাস লায়নরা। ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের একঝলক জাদু না থাকলে ১৯৩৪ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে হারের লজ্জায় পড়তে হতো ব্রাজিলকে।
কেউ জেতেনি এই ম্যাচে। তবে যদি প্রশ্ন ওঠে নম্বরের হিসাবে এই ম্যাচে কোন দল এগিয়ে, তাহলে এই প্রশ্নের উত্তরের বেশিরভাগই বলবেন— মরক্কো। পুরো ম্যাচে মরক্কো যে ফুটবল খেলেছে তাতে এটা স্পষ্ট যে, চার বছর আগে কাতার বিশ্বকাপে তাদের সেমিফাইনালে খেলাটা কোনো ফ্লুক ছিল না। এই বিশ্বকাপেও আফ্রিকার এই দেশটি প্রথম ম্যাচে যে পারফরম্যান্স দেখিয়েছে, তাতে তাদের এবারও শেষচারের অন্যতম দাবিদার মনে হতেই পারে।
শুরুর বাঁশি বাজতেই দুই দল আক্রমণাত্মক ফুটবল প্রদর্শনীতে নামল যেন। তবে প্রথম ২০ মিনিটে মাঠের নিয়ন্ত্রণ ছিল একচেটিয়াভাবে মরক্কোর। হাই প্রেসিং, দ্রুত পাস আদান-প্রদান আর বিদ্যুৎগতির ট্রানজিশনে তারা ব্রাজিলকে কার্যত দিশাহারা করে তোলে।
তবে গোলের সুযোগ প্রথম পায় ব্রাজিলই। ১৪ মিনিটে বাম দিক থেকে ভেসে আসা বলে মাথা ছোঁয়াতে পারেননি থিয়াগো। সংযোগটা ঠিকঠাক হলে গোলরক্ষকের কিছুই করার থাকত না। সেই সুযোগ নষ্টের মূল্য দিতে হলো ব্রাজিলকে মাত্র সাত মিনিট পরই।
মধ্যমাঠ থেকে ব্রাহিম দিয়াজের নিখুঁত থ্রু পাস ধরে দুই ডিফেন্ডারের মাঝখান দিয়ে ছুটে যান ইসমাইল সাইবারি। গোললাইন ছেড়ে বেরিয়ে আসা অ্যালিসনকে দেখে মাথার ওপর দিয়ে অসাধারণ এক চিপ শটে বল জালে জড়িয়ে দেন তিনি। ঠান্ডা মাথার বুদ্ধিদীপ্ত গোল।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে দক্ষিণ আমেরিকার কোনো দলের বিপক্ষে এটাই মরক্কোর প্রথম গোল। ১৯৭০ সালে পেরু ও ১৯৯৮ সালে ব্রাজিলের বিপক্ষে খেললেও গোল পায়নি আফ্রিকার লায়নরা।
গোলের পরও থামেনি মরক্কো। প্রথম ৩০ মিনিটেই তারা ১২টি শট নিয়ে ব্রাজিলের রক্ষণভাগকে অস্থির করে তোলে। ২০১৮ সালে মেক্সিকোর বিপক্ষে ম্যাচের পর বিশ্বকাপে এতটা চাপে আর পড়েনি ব্রাজিল। মাঝমাঠে কাসেমিরোকে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করে রাখে মরক্কোর মিডফিল্ড। বিরতির আগেই পরিস্থিতি বুঝে তাকে তুলে নেন কোচ কার্লো আনচেলত্তি।
চাপে পড়েও অবশ্য ভেঙে পড়েনি ব্রাজিল। ম্যাচে ফেরার পথ খোঁজে তারা। ৩২ মিনিটে আসে সেই মুহূর্ত। ব্রুনো গিমারায়েসের পাস বক্সের ভেতর নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বাঁ দিক থেকে ভেতরে কাট ইন করেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। এরপর ডান পায়ের তীব্র শটে ইয়াসিন বুনুর নাগালের বাইরে বল পাঠিয়ে সমতায় ফেরান ব্রাজিলকে (১-১)।
জাতীয় দলের হয়ে ৫০তম ম্যাচে এটি ছিল ভিনির দশম আন্তর্জাতিক গোল। ভিনিসিয়ুসের গোল করা কোনো ম্যাচে এখনো হারেনি ব্রাজিল। নিউ জার্সিতেও সেই পরিসংখ্যান অক্ষুণ্ণ থাকল।
রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে দুর্দান্ত মৌসুম কাটানো এই ফরোয়ার্ড বুঝিয়ে দিলেন, নেইমারের অনুপস্থিতিতে ব্রাজিলের আক্রমণের সবচেয়ে বড় ভরসা তিনিই।
প্রথমার্ধের ঝোড়ো ফুটবলের পর দ্বিতীয়ার্ধ যেন অন্য এক ম্যাচ। দুই দলই আক্রমণের চেয়ে নিজেদের রক্ষণ গোছাতেই বেশি মনোযোগ দেয়। গতি কমে যায়, কমে যায় ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতাও। প্রথমার্ধের ছন্দ আর তীব্রতা আর ফিরে আসেনি। ফলে শেষ পর্যন্ত ১-১ ব্যবধানই ম্যাচের ন্যায্য প্রতিফলন হয়ে থাকে।
কাতার বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে ওঠাকে অনেকে রূপকথা বলেছিলেন। কিন্তু নিউ জার্সির এই ম্যাচের পর সেই ধারণা টিকিয়ে রাখা কঠিন। আফ্রিকান চ্যাম্পিয়নরা দেখিয়ে দিলেন, তারা এখন বিশ্বফুটবলের প্রতিষ্ঠিত শক্তি। তাদের সংগঠিত রক্ষণ, দুর্দান্ত প্রেসিং এবং মাঝমাঠের আধিপত্য বারবার ব্রাজিলকে বিপাকে ফেলেছে।
আফ্রিকার ১০টি দল এবার বিশ্বকাপে খেলছে। প্রথম ম্যাচেই মরক্কো যেন পুরো মহাদেশের পক্ষ হয়ে ঘোষণা দিল— বিশ্বমঞ্চে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সামর্থ্য এখন তাদেরও সমান।
ম্যাচে মরক্কোর ১৮ বছর বয়সি আইয়ুব বুয়াদ্দি জানিয়ে দিলেন, সামনের দিনের তারকা হতে চলেছেন তিনি। এত অল্প বয়সে তার পরিণত মানসিকতা ও আত্মবিশ্বাস সত্যিই চোখে পড়ার মতো, তাও আবার বিশ্বকাপের মাঠে নিজের প্রথম ম্যাচেই!
বিল্ড-আপের সময় আইয়ুব সব সময় নিজেকে এমন জায়গায় রাখছিলেন, যাতে গোলরক্ষক বা সেন্টার-ব্যাকরা সহজে তাকে বল দিতে পারেন। এতে তাদের ওপর বল নিয়ে খেলার চাপও কমেছে। বল নিজেদের দখলে থাকলে, বল যে পাশে থাকত, সেদিকেই তিনি দ্রুত সরে গিয়ে নিজেকে পাস নেওয়ার জন্য প্রস্তুত রাখছিলেন। স্পেস তৈরি করা, প্রতিপক্ষের পা থেকে বলা কাড়া, দ্রুতগতিতে আক্রমণে বল সাপ্লাই দেওয়া, নিখুঁত পাসিং, ওভারল্যাপিং করে একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্ত পর্যন্ত সারাক্ষণ দৌড়ের ওপর রাখেন ব্রাজিলকে। চমৎকার টেকনিক, শারীরিক শক্তি এবং প্রতিপক্ষকে ধোঁকা দেওয়ার দক্ষতা দিয়ে তিনি নিজের জন্য সময় বের করে নিয়েছেন। একই সঙ্গে ম্যাচজুড়ে মরক্কোকে বলের দখল ধরে রাখতে এবং খেলায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় এই তরুণ ছিলেন সত্যিকার অর্থেই ম্যান অব দ্য ম্যাচ!
এই ড্রয়ের ফলে গ্রুপ ‘সি’র সমীকরণ আরো জটিল হয়ে উঠেছে। বোস্টনে হাইতিকে ১-০ গোলে হারিয়ে আপাতত শীর্ষে স্কটল্যান্ড। ব্রাজিল ও মরক্কো এখনো নকআউটের বড় দাবিদার। ব্রাজিলের সমান পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপে মরক্কোর অবস্থান দ্বিতীয়। ব্রাজিল আছে তিন নম্বরে। কারণ আর কিছু নয়, হলুদ কার্ড একটু বেশি দেখেছে তারা।