ফুটবলের আজ রাতটা কার হবে
বিশ্বকাপের রাতগুলো শুধু গোলের গল্পই বলে না। ফুটবলের বিশাল অধ্যায় জুড়ে গতির কিংবা ড্রিবলিংয়ের গল্পও থাকে, কখনো দেখা মেলে শিল্পের নিপুণতা। চলতি বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালে সব মিশে গেছে একবিন্দুতে, যার দুই প্রান্তে কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লামিনে ইয়ামাল। এমবাপ্পের দৌড় যেন বজ্রপাতের মতো, চোখের পলকে রক্ষণ চিরে গোলপোস্টের সামনে পৌঁছে যান। ইয়ামালের পায়ে বল থাকলে মনে হয় ফুটবলটা যেন রং-তুলি আর সবুজ ঘাসই তার ক্যানভাস। একজন প্রতিপক্ষকে হারান গতি দিয়ে, অন্যজন হারান বুদ্ধি আর কল্পনাশক্তি দিয়ে। একজনের শক্তি শেষ স্পর্শ, অন্যজনের শক্তি সেই শেষ স্পর্শের আগে পুরো গল্পটা লিখে ফেলা।
২০২৬ বিশ্বকাপে দুজনই নিজেদের দলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। তবে পথ দুজনের সম্পূর্ণ আলাদা। ফ্রান্সের হয়ে এমবাপ্পে সেমিফাইনালের আগে পর্যন্ত করেছেন ৮ গোল, সঙ্গে ৩টি অ্যাসিস্ট। গোল্ডেন বুটের দৌড়েও তিনিই শীর্ষে। তার প্রত্যাশিত গোল (xG) প্রায় ৬.৯, অর্থাৎ সুযোগের তুলনায়ও বেশি গোল করেছেন তিনি। এমনটা কেবল একজন বিশ্বমানের ফিনিশারের থেকেই আশা করা যায়।
অন্যদিকে স্পেনের বিস্ময়বালক ইয়ামাল গোলসংখ্যায় এমবাপ্পের ধারেকাছেও নেই। ৬ ম্যাচে মাত্র ১ গোল কিন্তু পরিসংখ্যানের অন্য পাতাগুলো খুললেই বদলে যায় দৃশ্যপট। নকআউট পর্ব পর্যন্ত ইয়ামাল তৈরি করেছেন টুর্নামেন্টের অন্যতম সর্বোচ্চ সংখ্যক গোলের সুযোগ। সফল ড্রিবলের তালিকাতেও তিনি শীর্ষ সারিতে। একের পর এক ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়া, ছোট ছোট জায়গায় বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা এবং সঠিক সময়ে সঠিক পাস তাকে স্পেনের আক্রমণের নিউক্লিয়াসে পরিণত করেছে।
এমবাপ্পের ফুটবলটা অনেকটা খোলা আকাশে উড়ে যাওয়া বাজপাখির মতো। একবার জায়গা পেলে তাকে আর ধরা যায় না। বিপরীতে ইয়ামাল যেন দাবাড়ু। প্রতিটি স্পর্শ, প্রতিটি ফেইন্ট, প্রতিটি পাসের পেছনে থাকে আগের কয়েক চালের হিসাব। এমবাপ্পে মূলত ডিফেন্ডারের পেছনের ফাঁকা জায়গা খোঁজেন। তাঁর প্রথম তিন ধাপের গতি এতটাই বিস্ফোরক যে বিশ্বের সেরা রক্ষণও মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে। গোলপোস্টের সামনে পৌঁছালে তিনি খুব কমই দ্বিতীয় সুযোগ নষ্ট করেন। ইয়ামালের খেলার ভাষা আবার সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি প্রতিপক্ষকে হারান গতি দিয়ে নয়, সিদ্ধান্ত দিয়ে। কখন ড্রিবল করবেন, কখন পাস দেবেন, কখন শট নেবেন—এই তিনটির ভারসাম্যই তাকে আলাদা করে। এক-একটি মুহূর্তে মনে হয়, তিনি যেন অন্যদের চেয়ে কয়েক সেকেন্ড আগেই খেলার ভবিষ্যৎ দেখে ফেলেন।
সেমিফাইনালেও দুদলের আক্রমণভাগের লড়াইটা হবে এই দুজনকে ঘিরেই। ট্যাকটিক্যাল লড়াইটাও হবে দুজনের মধ্যেই। ফ্রান্সের আক্রমণ অনেকটাই এমবাপ্পেকে ঘিরে। তাকে থামাতে প্রতিপক্ষকে ডিফেন্স অনেক নিচে নামাতে হয়, ফলে অন্য ফরোয়ার্ডদের জায়গা তৈরি হয়। অন্যদিকে স্পেনের আক্রমণে ইয়ামাল শুধু গোল করেন না, পুরো আক্রমণের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করেন। তাঁর কারণে ফুল-ব্যাক ও সেন্টার-ব্যাকদের অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে হয়। ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে আরেকবার নিজেকে প্রমাণের পালা দুজনের সামনেই।
এমবাপ্পে ইতোমধ্যে বিশ্বকাপ ফাইনাল, নকআউট ও গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে নিজের সামর্থ্য দেখিয়েছেন। এদিকে, ইয়ামালের জন্য এবারই প্রথম সুযোগ। একই সঙ্গে নিজেকে প্রমাণের আরো বড় মঞ্চ। সেমিফাইনালে তিনি কতটা ভালো খেলতে পারেন সেটার ওপর নির্ভর করছে স্পেনের ফাইনালে ওঠার ভাগ্যও।
বিশ্বকাপে অনেক কিংবদন্তির পরিচয় তৈরি হয়েছে সেমিফাইনাল ও ফাইনালে। পেলে, ম্যারাডোনা, জিদান, রোনালদো, ইনিয়েস্তা, মেসি; সবার ক্যারিয়ারে এমন ম্যাচ রয়েছে, যা তাদের কিংবদন্তিতে পরিণত করেছে। এবার সেই সুযোগ এমবাপ্পে ও ইয়ামালের সামনে। সেমিফাইনালে নির্ধারক পারফরম্যান্স শুধু দলকে ফাইনালে তুলবে না, তাদের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায়গুলোর একটিও হয়ে উঠতে পারে।
দেখা যাক, কে স্মরণীয় করে রাখতে পারেন আজ রাতের সেমিফাইনালের মহারণের মঞ্চ; বিদ্যুতের গতিতে ছুটে চলা এমবাপ্পে, নাকি জাদুর ছোঁয়ায় প্রতিপক্ষকে সম্মোহিত করা ইয়ামাল।