ডালাসের সবুজ গালিচায় আলোর বিকিরণ যেন খেলা করছিল। আর গ্যালারিতে বইয়ে যাচ্ছিল আকাশি-সাদা সমুদ্রের ঢেউ। সবটাই যেন আচড়ে পড়ছিল মাঠের ঘাসে। সেই জাদুকরী আবহে যেন মিশে গেলেন লিওনেল মেসি। ফুটবল দুনিয়ার সুপারস্টারের ম্যাজিকেল পারফরম্যান্সে বিশ্বকাপমঞ্চে নিজেদের অপরাজেয় অভিযাত্রার রাজকীয় তিলক যেন নিজেদের কপালে এঁকে নিলেন কোচ লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা। দারুণ এই অর্জনের মধ্য দিয়ে গ্রুপ পর্বের মিশনের পর্দা টেনে দিল ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। জর্ডানের মরুঝড়কে ৩-১ ব্যবধানে ধূলিসাৎ করে ‘জে’ গ্রুপের শীর্ষস্থান অক্ষুণ্ণ রাখল লিওনেল আলবিসেলেস্তেরা। প্রথমার্ধের জোড়া আঘাতে ম্যাচের ভাগ্য যখন প্রায় নিশ্চিত, ঠিক তখনই দ্বিতীয়ার্ধে দৃশ্যপটে আগমন ঘটল ফুটবল বিধাতার বরপুত্র লিওনেল মেসির। বেঞ্চ থেকে উঠে এসেই তার সেই তুলির আঁচড়ে আঁকা ফ্রি-কিক জর্ডানের প্রত্যাবর্তনের সব আশাকে এক নিমিষেই গুঁড়িয়ে দিল। তার মহাকাব্যিক পারফরম্যান্সে ফুটবল মহাযজ্ঞে রচিত হলো নতুন এক বিশ্বরেকর্ড।
নকআউট পর্বের রোমাঞ্চকর ও শ্বাসরুদ্ধকর মিশন শুরুর আগে স্কালোনি তার তূণীর থেকে নতুন তীর পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন। মূল একাদশে ৯টি পাহাড়সম পরিবর্তন এনে যেন দেখতে চেয়েছিলেন মাঠের নায়করা বিশ্রামে থাকলেও মাঠের পারফরম্যান্সে ধার কমে কি না! না, কমেনি। পরীক্ষা সফল। ম্যাচের শুরু থেকেই জর্ডানের রক্ষণভাগকে শৃঙ্খলিত করে ফেলে আলবিসেলেস্তেরা।
ম্যাচের ১৯ মিনিটে জর্ডানের ডিফেন্ডার আবু তাহার ফাউলে বক্সের ঠিক বাইরে ফ্রি-কিক পেয়ে যায় তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। এর পরের দৃশ্যটি ছিল কোনো দক্ষ পিয়ানোবাদকের সুর তোলার মতো। জিওভান্নি লো সেলসোর বাঁ পায়ের এক নিখুঁত জাদুকরী শটে জর্ডানের মানব দেয়াল ফাঁকি দিয়ে বল যখন জাল কাঁপাল, ডালাস স্টেডিয়াম তখন করতালিতে মুখরিত। বিশ্বকাপে লো সেলসোর এটিই প্রথম আত্মপ্রকাশের আনন্দধ্বনি।
ম্যাচের বয়স যখন ৩০ মিনিট, তখন ব্যবধান দ্বিগুণ করার মাহেন্দ্রক্ষণ চলে আসে। নিকোলাস তালিয়াফিকোর এক মাপা ক্রস খুঁজে নেয় লাউতারো মার্টিনেজকে। তার প্রথম শট জর্ডান প্রাচীর ইয়াজিদ আবু লায়লা প্রতিহত করলেও ফিরতি বল লুফে নিতে হেড বাড়ান জুলিয়ান আলভারেজ। কিন্তু বলের দখল নিতে গিয়ে আলভারেজকে বুট দিয়ে আঘাত করে বসেন এহসান হাদ্দাদ। রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজাতে দ্বিধা করেননি। স্পটকিক থেকে চলন্ত আসরে নিজের প্রথম গোলের খাতা খুলতে কোনো ভুল করেননি লাউতারো। ২-০ গোলের স্বস্তি নিয়ে বিরতিতে যায় বিশ্বমঞ্চের শিরোপাধারীরা।
দ্বিতীয়ার্ধে যেন আহত সিংহের মতো ঘুরে দাঁড়াতে চাইল জর্ডান। ৫৫ মিনিটে খেলার ধারার বিপরীতে এক নান্দনিক দলগত আক্রমণে এহসান হাদ্দাদের কোনাকুনি পাস থেকে স্লাইড করে জর্ডানের পক্ষে ব্যবধান কমান আল তামারি। স্কোরবোর্ডে তখন ২-১ ব্যবধান, ম্যাচে টানটান উত্তেজনা।
তবে নাটকের সেরা দৃশ্যটি তখনো বাকি ছিল। ম্যাচের ৬০ মিনিটে রাজকীয় ভঙ্গিতে বদলি হিসেবে মাঠে নামেন ফুটবল বিশ্বের বরপুত্র লিওনেল মেসি।
মাঠে নামার ঠিক ২০ মিনিটের মাথায়, মানে ৮০ মিনিটে ফুটবল জাদুকর যেন আবারও তার জাদুর কাঠি স্পর্শ করলেন। নিলেন বক্সের বাইরে থেকে এক অনবদ্য ফ্রি-কিক! বলটি বাতাসে বাঁক খেয়ে যখন জর্ডানের জালে জড়াল, তখন গ্যালারির গর্জন আছড়ে পড়ল ডালাসের আকাশে। সেই চিৎকারে গগনবিদারী জমে থাকা মেঘ যেন মাথার ওপর ভেঙে পড়ার উপক্রম! ৩-১ গোলের এই জয় শুধু আর্জেন্টিনার আধিপত্যই নিশ্চিত করেনি, মেসিকে পৌঁছে দিয়েছে এক অনন্য উচ্চতায়।
এ গোলের মাধ্যমে রেকর্ড সর্বোচ্চ ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে নামা মেসি ফুটবল ইতিহাসে এক অদ্বিতীয় কীর্তি লিখে ফেললেন। বিশ্বকাপে টানা সাত ম্যাচে গোল করার একক বিশ্বরেকর্ড এখন শুধুই এই আর্জেন্টাইন মহাতারকার। ফুটবল ইতিহাসের দুই কিংবদন্তি ফ্রান্সের জাস্ট ফন্টেইন (১৯৫৮) ও ব্রাজিলের জেয়াজিনহোকে (১৯৭০) পেছনে ফেলে তিনি এখন এক নিঃসঙ্গ শেরপা। একইসঙ্গে চলতি বিশ্বকাপে এটি মেসির ষষ্ঠ গোল এবং বিশ্বকাপে সব মিলিয়ে তার গোলসংখ্যা গিয়ে দাঁড়াল ১৯-এ।
গ্রুপ পর্বের এই মহাকাব্যিক সমাপ্তির পর নকআউটের কঠিন রণাঙ্গনেও যে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা ফেভারিটের রাজমুকুট পরেই মাঠে নামবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। শেষ ৩২ পর্বের লড়াইয়ে ৪ জুলাই ভোর ৪টায় আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ ফুটবলের এবারের বিশ্ব আসরে চমক দেখিয়ে চলা নবাগত দল কেপ ভার্দে। অভিষিক্ত দলের বিপক্ষে ম্যাচ হলেও দারুণ এক জমজমাট লড়াই উপভোগের অপেক্ষায় এখন ফুটবল দুনিয়া।