কাতার বিশ্বকাপের সেই অপরাজেয় আর্জেন্টিনা আর আজকের ২০২৬ এর আর্জেন্টিনার মধ্যে তফাত্ কতটা?
চলুন আর্জেন্টিনার শক্তি-দুর্বলতার অংক কষে সেই হিসেবটা মেলাই।
আর্জেন্টিনার সাম্প্রতিক ফর্ম এবং কাতার বিশ্বকাপ জয় সঙ্গে টানা দুটি কোপা আমেরিকা ট্রফি ঘরে তোলার পর দলটির আত্মবিশ্বাস ও মানসিক শক্তি এখন তুঙ্গে৷ বিশ্বকাপ ক্যাম্পের ঠিক আগের প্রীতি ম্যাচগুলোতে আর্জেন্টিনা তাদের চেনা ছন্দ বজায় রেখেছে। জাম্বিয়ার বিরুদ্ধে জিতেছে ৫-০ গোলের সহজ ব্যবধানে।
মৌরিতানিয়াকেও হারিয়েছে সহজেই। তবে আসল পরীক্ষা হবে গ্রুপ জে তে আলজেরিয়া, অস্ট্রেলিয়া আর জর্ডানের বিপক্ষে। আর্জেন্টিনা সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা মিডফিল্ডে গভীরতা। অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, এনজো ফার্নান্দেজ এবং রদ্রিগো ডি পল এই ত্রয়ী বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা মিডফিল্ড কম্বিনেশন।এদের ব্যাক আপ হিসেবে আছেন এজেকুয়েল পালাসিওস এবং জিওভানি লোসেলসোর মতো তারকারা। গোলবারের নিচে আছেন ‘বাজপাখি’খ্যাত এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। তিনি পোস্টে থাকা মানেই নির্ভার ভরসা। বড় ম্যাচে তাঁর গোল কিপিং এবং সাইকোলজিক্যাল গেম আর্জেন্টিনার অন্যতম বড় প্লাস পয়েন্ট। এই দলটায় মেসি আছেন, তবে শুধুমাত্র মেসির ওপর দলটা নির্ভর না। দলকে জেতাতে পারে, গোল করতে পারে, ছক অনুযায়ী খেলা তৈরি পারে- এমন আরো অনেকে রয়েছেন।
সিচুয়েসন কোচ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া স্কালোনি প্রয়োজন অনুযায়ী ৪-৩-৩ ফরমেশন থেকে বেরিয়ে ৪-৪-২ ডায়মন্ড শেপ ফর্মেশনে খুব সহজেই সুইচ করতে পারেন। তবে সব কিছুর পরেও এই দলের কিছু দুর্বলতা বা চিন্তার জায়গা আছে যা স্কালোনিকে ভাবাচ্ছে। নিকোলাস ওটামেন্ডির অভিজ্ঞতা প্রচুর তবে আধুনিক ফুটবলের কাউন্টার অ্যাটাকিং উইংগারদের ঝড় সামাল দিতে তার গতি অবশ্যই দলের বড় চিন্তার বিষয়।ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো এবং লিয়েন্দ্রো মার্তিনেজ তাই বাড়তি দায়িত্ব নিতে হবে।
তবে আর্জেন্টিনা মানেই মেসি। আর মেসির পায়ে বল মানেই আর্জেন্টিনার চোখে স্বপ্ন, বুকে শক্তি, গ্যালারিতে চিৎকার! চার বছর আগে বিশ্বকাপ জেতা মেসি এখনো দলের প্রাণভোমরা। বিগ ম্যাচে ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে এখনও মেসির ম্যাজিক মেমেন্টের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। মিডফিল্ডের তিন মার্শাল, প্লে মেকিংয়ে মেসি, আক্রমণে লাউতারো মার্তিনেজ এবং আলভারেজ- এই ছয়জনের পারফরমেন্সই এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ভাগ্য নির্ধারণ করবে।
লাউতারো মার্তিনেজ এবং হুয়ান আলভারজের জায়গায় বদলি হিসেবে খেলানোর জন্য একটা চমক নিজের ঝুলিতে রেখেছেন স্কালোনি। যার নাম নিকো পাজ। ইতালিয়ান ক্লাব কোমোতে চমক দেখানো তরুণ তুর্কি নিকো পাজ হতে পারেন স্কালোনির সারপ্রাইজ প্যাকেজ। এই তরুণ আক্রমণভাগে যে কোনও সময় ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন।
এবারের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে আর্জেন্টিনার রিজার্ভ বেঞ্চও দারুণ শক্তিশালী। তরুণ ও অভিজ্ঞদের নিয়ে অবিশ্বাস্য শক্তিমান একটা কম্বিনেশনের দল গড়েছে তারা। কাতার বিশ্বকাপের চেনা মুখ যেমন রডরিগো ডি পল বা নিকোলাস তাগলিয়াফিকো রা যখন দলে অভিজ্ঞতার কুশলতা জোগাচ্ছেন ঠিক তখনই স্কালোনি দলে ইনজেক্ট করেছেন একঝাঁক ক্ষুরধার তরুণ তুর্কিদের। রিজার্ভ বেঞ্চে থাকা থিয়াগো আলমাদাও ম্যাচ উইনার। আলমাদাকে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের বিগ ম্যাচ গুলোতে মেসির অনুপস্থিতিতে সুযোগ দিয়েছিলেন স্কালোনি। কোচের আস্থার প্রতিদান দিয়েছেন আলমাদা। সেরা একাদশে আলমাদার হয়তো সুযোগ হবে না। তবে আক্রমণভাগে বদলি হিসেবে সম্ভবত তিনিই হবেন আর্জেন্টাইন কোচের প্রথম পছন্দ।
দলের আরেক খেলোয়াড় জুলিয়ানো সিমিওনে। যাকে আপনি অলরাউন্ডার বলে ডাকতেই পারেন! উইং থেকে শুরু করে রাইট, মিডফিল্ড কিংবা উইং ব্যাক- সব জায়গায় খেলতে পারেন সিমিওনে। রিজার্ভ বেঞ্চের এই ফুটবলারদের ব্যবহার করে কোচ স্কালোনি যে কোনও মুহূর্তে উইং প্লে বা কাউন্টার অ্যাটাকের গতিপথ বদলে দিতে পারেন। বেঞ্চের এই গভীরতার কারণেই প্রতিপক্ষ দলগুলো ম্যাচের শেষের দিকে আর্জেন্টিনার ডিফেন্স বা মিডফিল্ডের সঙ্গে পেরে উঠতে পারবে না। অভিজ্ঞদের মস্তিস্ক আর তরুণদের ক্ষিপ্রতা এই দুইয়ের যুগলবন্দি শক্তি আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপের ট্রফি রক্ষা করতে নামছে। আর এই মিশনে তারা প্রথম প্রতিপক্ষ হিসেবে পাচ্ছে আলজেরিয়াকে।
সম্ভবত এই ম্যাচ জয়ের জন্য আর্জেন্টিনাকে তাদের সব কৌশল, ও তীর বের করতে হবে না। আর্জেন্টিনা ৩, আলজেরিয়া ০, সকালে ম্যাচ শেষে এমন কোনো স্কোর দেখার জন্যই আপনি প্রস্তুতি নিতে পারেন!