ম্যাচ রোববার সকালে
অবিশ্বাস্য মেসি আর দুর্দান্ত আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত এটাই আর্জেন্টিনা ফুটবলের গল্প। যতটা টুর্নামেন্ট সামনের দিকে এগোচ্ছে, আর্জেন্টিনা যেন ততটাই অনন্য হয়ে উঠেছে। অসম্ভব সুন্দর ফুটবল খেলে লিখছে নতুন সব মহাকাব্য। এরই ধারাবাহিকতায় এবার আর্জেন্টিনার সামনে সুইজারল্যান্ড। যুক্তরাষ্ট্রের কনসাস সিটির মাঠে আগামীকাল রোববার বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টায় বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের শেষ ম্যাচে মাঠে নামবে দুদল। টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের লক্ষ্যে আর্জেন্টিনার আরেক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ। অন্যদিকে, ইতিহাস ডাকছে কখনো বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে খেলতে না পারা সুইজারল্যান্ডকে। এই দুই দলের মধ্যে কারা সেমিফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করবে—সেই রোমাঞ্চ দেখার অপেক্ষা।
সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ফেভারিট হিসেবেই মাঠে নামবে আর্জেন্টিনা। মেসি ম্যাজিক, দলের জয়ের ক্ষুধা আর আত্মবিশ্বাসী মনোভাব—সব মিলেই শক্ত অবস্থানে কোচ স্কালোনির দল। তাছাড়া অতীত রেকর্ডও আর্জেন্টিনার হয়ে কথা বলছে। এ পর্যন্ত সুইসদের বিপক্ষে সাত ম্যাচে খেলে অপরাজিত আর্জেন্টাইনরা। পাঁচ ম্যাচে জয় আর দুটিতে ড্র করেছে তারা। এর মধ্যে বিশ্বকাপের মঞ্চেও সুইজারল্যান্ডকে দুবার হারায় আর্জেন্টিনা। আর এবার আর্জেন্টিনা যে ফর্মের তুঙ্গে রয়েছে, তাতে সুইসদের বিপক্ষে সহজ জয় আশা করাই যায়। টুর্নামেন্টের গ্রুপ পর্বে একচেটিয়া ফুটবল খেলেছেন মেসিরা। তবে শেষ বত্রিশ আর রাউন্ড অব সিক্সটিনে জয় পেতে ঘাম ছুটেছে তাদের। কেপ ভার্দের বিপক্ষে ২-১ গোলের কষ্টার্জিত জয়ে নকআউট পর্ব শুরু মেসিদের। এরপর মিসরের বিপক্ষে ম্যাচে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের মহাকাব্য রচনা করেন তারা। দুই গোলে পিছিয়ে থাকার পর মেসির ম্যাজিক্যাল ফুটবলে ৩-২ ব্যবধানে ম্যাচ জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে আর্জেন্টিনা। হার্টবিট বাড়িয়ে দেওয়া এ জয়টি আর্জেন্টিনার আত্মবিশ্বাসের পারদ অনেক উঁচুতে নিয়ে গেছে। আর সেটিকে কাজে লাগিয়ে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে সফল হতে চাইবে স্কালোনির দল। এই ম্যাচেও মেসি ম্যাজিক দেখার অপেক্ষা থাকবে ফুটবল বিশ্ব। এবারের বিশ্বকাপে ৩৯ বছর বয়সী নতুন এক মেসিকে দেখছে বিশ্ব। টানা ম্যাচে গোল করে ইতোমধ্যে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে সবার চেয়ে এগিয়ে আছেন এই মহাতারকা। কঠিন মুহূর্তে দলের হাল ধরা, সঠিক নেতৃত্ব আর একক নৈপুণ্যে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেওয়ার যে ক্ষমতা মেসি দেখিয়ে যাচ্ছেন, সেটি অতিমানবীয় বটে। দুর্বার গতিতে ছুটে চলা মেসির সঙ্গে মার্টিনেজ, আলভারেজরাও দারুণ খেলছেন। সব মিলে আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগ বিশ্বসেরা, ভয়ংকর। তবে তাদের সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে সুইজারল্যান্ড। বিশেষ করে তাদের রক্ষণভাগ। এ পর্যন্ত বিশ্বকাপে পাঁচ ম্যাচেই অপরাজিত থাকা সুইসরা মাত্র তিনটি গোল হজম করেছে। তাদের রক্ষণভাগ খুবই সুশৃঙ্খল ও দক্ষ। প্রতিপক্ষের আক্রমণ সুইস-রক্ষণ দেয়ালে এসে আটকে যায়। লম্বা সময় ধরে প্রতিপক্ষকে গোলশূন্য রাখতে পারে তারা। আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের ক্ষিপ্র গতি আর পায়ের জাদু বনাম সুইস ডিফেন্ডারদের নিখুঁত স্লাইডিং ও পজিশনিং লড়াই-ই দেখা যেতে পারে। লিওনেল মেসিদের গোল করার জন্য ফাঁকা জায়গা তৈরিতে বাধা এবং অফ-সাইড ট্র্যাপ তৈরির কৌশল নেবে সুইজারল্যান্ড। মেসিকে বোতলবন্দির রাখার চেষ্টা করবে তারা। কেননা তাদের মাথাব্যথার বড় কারণ মেসি। অল্প জায়গা পেয়েই ততটা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারেনি এই ফুটবল জাদুকর, সেই প্রমাণ অসংখ্যবার দিয়েছেন। টুর্নামেন্টে এ পর্যন্ত ১৭ বার অন টার্গেটে শট নিয়েছেন মেসি। আর ১৫ বার গোলের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন তিনি। তবে মেসির নেতৃত্বাধীন আর্জেন্টাইন গতিময় আক্রমণভাগের সামনে মিডফিল্ড ও ডি-বক্সের ভেতরের সলিড ডিফেন্স অর্থাৎ ‘সুইস দেয়াল’ তৈরি করে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের ব্যর্থ করার চেষ্টা করবে সুইসরা। জমাট রক্ষণের পাশাপাশি সুইজারল্যান্ডের গোলরক্ষক গ্রেগর কোবেল গোলপোস্টের নিচে অনন্য পারফরম্যান্স শো করছেন। রাউন্ড অব সিক্সটিনে কলম্বিয়ার বিপক্ষে টাইব্রেকারে জয়ের ম্যাচে সুইজারল্যান্ডের নায়ক ছিলেন কোবেল। তাছাড়া তার দুর্দান্ত সব সেভ নজর কেড়েছে সবার। সুইজারল্যান্ডের রক্ষণ দেয়াল আর গোলরক্ষক কোবেলের সামনে দ্রুত গোল বের করা আর্জেন্টিনার জন্য বড় চ্যালেঞ্জিং কাজ হবে। এছাড়া প্রতি আক্রমণ থেকে গোল করার ক্ষেত্রেও বেশ পারদর্শী সুইসরা। ফলে আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগ যদি একটুও খেই হারিয়ে ফেলে, তাহলে চড়া মূল্য দিতে হতে পারে।
অন্যদিকে, বরাবরের মতোই আর্জেন্টিনার রক্ষণ-দুর্বলতা গত কয়েক ম্যাচে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। বিশেষ করে নকআউট পর্বে কেপ ভার্দে ও মিসরের বিপক্ষে চারটি গোল হজম করেছে আর্জেন্টিনা। সেখানে তাদের রক্ষণ দুর্বলতা দেখা গেছে। আর্জেন্টিনার রক্ষণের ঘাটতির কথা চিন্তা করেই মাঠে নামবে সুইসরা। ২০১৪ বিশ্বকাপে নকআউট পর্বের ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিল তারা। সেবার অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো ম্যাচে ডি মারিয়ার গোলে স্বস্তির জয় পায় আর্জেন্টিনা। এবারও যে আর্জেন্টিনার জন্য অস্বস্তির নাম সুইজারল্যান্ড, সেটি আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে আর্জেন্টিনার বর্তমান ফর্ম দুর্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছে। ৪-১-৩-২ ফরমেশনে একাদশ সাজাতে পারেন কোচ স্কালোনি। অপরদিকে আর্জেন্টিনাকে আটকাতে ৪-২-৩-১ ফরমেশন দল সাজাতে পারেন সুইজারল্যান্ড কোচ মুরাত ইয়াকিন। সব মিলে আগামীকাল আর্জেন্টিনা ও সুইজারল্যান্ড ম্যাচে ফুটবলপ্রেমীরা নিশ্চিতভাবেই একটি কৌশলগত এবং রোমাঞ্চকর লড়াই দেখতে যাচ্ছেন। মেসির জাদু কি আর্জেন্টিনাকে সেমিফাইনালে নিয়ে যাবে, নাকি সুইজারল্যান্ডের লড়াকু ফুটবল জন্ম দেবে নতুন কোনো রূপকথার—সেটি দেখার বিষয়।