পর্তুগালের প্রথম ম্যাচে ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে ছায়া হয়ে ছিলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। সেই ম্যাচে তার দলও খুঁইয়েছে পয়েন্ট। ম্যাচের পর জমছিলো সমালোচনার ঝড়। তবে কি ধূসর হয়ে গেলেন সময়ের অন্যতম সেরা তারকা? এই প্রশ্নের উত্তর পর্তুগাল অধিনায়ক দিলেন উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে। জোড়া গোল করে জানালেন, তিনি এখনো রঙিন। আর তাতে গোল উৎসব করলো পর্তুগালও। উজবেকিস্তানকে ৫-০ গোলের বড় ব্যবধানে হারিয়েছে পর্তুগাল। রোনালদোর জোড়া গোলের সঙ্গে একটি গোল নুনো মেন্দেসের, একটি আত্মঘাতী গোল এবং বদলি খেলোয়াড় রাফায়েল লেয়াওর শেষ মুহূর্তের আঘাতে উজবেকিস্তানকে উড়িয়ে দিয়েছে পর্তুগাল। হিউস্টনে বিশ্বকাপের ‘কে’ গ্রুপের ম্যাচে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আধিপত্য দেখিয়ে বড় জয় তুলে নেয় পর্তুগিজরা। এই ম্যাচে গোল করে বিশ্বকাপের ছয়টি ভিন্ন আসরে গোল করা প্রথম ফুটবলার হিসেবেও ইতিহাস গড়েছেন রোনালদো।
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণের ঝড় তোলে পর্তুগাল। চতুর্থ মিনিটেই গোলের সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিলেন রোনালদো। নুনো মেন্দেসের নিখুঁত ক্রস থেকে ঠিকঠাক সংযোগ করতে না পারায় তখন লিড নেওয়া হয়নি। তবে মাত্র দুই মিনিট পরই ভুল শুধরে নেন পর্তুগিজ অধিনায়ক। ডান দিক থেকে পেদ্রো নেতোর ক্রস প্রথম ছোঁয়াতেই জালে জড়িয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপে নিজের প্রথম গোলের দেখা পান তিনি। শুরুতেই ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় পর্তুগাল।
গোলের পরও আক্রমণের ধার কমেনি। ব্রুনো ফার্নান্দেজ, জোয়াও নেভেস ও পেদ্রো নেতোর নেতৃত্বে একের পর এক আক্রমণে ব্যস্ত রাখে উজবেক রক্ষণকে। ১৯ মিনিটে নাসরুল্লায়েভের শট ঠেকিয়ে উজবেকিস্তানের সম্ভাব্য সমতা ফেরানোর সুযোগ নষ্ট করেন গোলরক্ষক দিয়োগো কস্তা। এরপর ১৭ মিনিটে পাওয়া এক ফ্রি-কিক থেকে ব্যবধান দ্বিগুণ করে পর্তুগাল। সবাই যখন রোনালদোর শটের অপেক্ষায়, তখন চমক দেখিয়ে নুনো মেন্দেস বাঁ পায়ের দুর্দান্ত শটে বল জালে পাঠান। নেমাতভের কোনো সুযোগই ছিল না।
২৯ মিনিটে উজবেকিস্তান ম্যাচে ফেরার আশা দেখেছিল। আজিজজন গনিয়েভের দূরপাল্লার শট জালে জড়ালেও ভিএআরের সাহায্যে গোল বাতিল করেন রেফারি। আক্রমণ গড়ার সময় ফাউলের প্রমাণ মেলায় গোলটি স্বীকৃতি পায়নি। সেই হতাশা কাটার আগেই আবারও আঘাত হানে পর্তুগাল। ৩৯ মিনিটে মাঝমাঠ থেকে বল টেনে এনে ব্রুনো ফার্নান্দেজ নিখুঁত থ্রু পাস দেন রোনালদোর উদ্দেশে। অফসাইডের ফাঁদ এড়িয়ে এগিয়ে গিয়ে ঠান্ডা মাথায় গোলরক্ষককে পরাস্ত করে নিজের দ্বিতীয় ও দলের তৃতীয় গোলটি করেন তিনি। প্রথমার্ধ শেষ হয় ৩-০ ব্যবধানে।
খেলায় হাইড্রেশন বিরতির সময় খেলোয়াড়রা যখন পানীয় পান করে সতেজ হচ্ছেন, তখন পরিসংখ্যানের পাতায় আরও একবার নিজের নাম উজ্জ্বল করলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। ইউরো ও বিশ্বকাপ মিলিয়ে বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত ১১টি ভিন্ন আসরে গোল করেছেন রোনালদো, যা ইউরোপের কোনো ফুটবলারের জন্য সর্বকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড। তার কাছাকাছিও নেই আর কেউ। জার্মানির কিংবদন্তি ইয়ুর্গেন ক্লিন্সমান, মিরোস্লাভ ক্লোসা এবং সুইজারল্যান্ডের জেরদান শাকিরি—এই তিনজনই গোল করেছেন ৬টি করে বড় টুর্নামেন্টে। অর্থাৎ তাদের চেয়ে পাঁচটি বেশি আসরে গোল করে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে গেছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো।
বিরতির পর দুটি পরিবর্তন নিয়ে মাঠে নামে পর্তুগাল। জোয়াও কানসেলো ও পেদ্রো নেতোর জায়গায় নামেন নেলসন সেমেদো এবং ফ্রান্সিসকো কনসেইসাও। দ্বিতীয়ার্ধেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছেই রাখে ইউরোপের দলটি। ৫৮ মিনিটে হ্যাটট্রিকের সুযোগ পেয়েছিলেন রোনালদো। ব্রুনো ফার্নান্দেজের লব করা বল থেকে নেওয়া তার শট দুর্দান্তভাবে ঠেকিয়ে দেন নেমাতভ। কিন্তু দুই মিনিট পর আর রক্ষা হয়নি উজবেকদের। ব্রুনোর কর্নার থেকে রোনালদোর স্পর্শের পর বল খুসানোভের গায়ে লেগে গোলমুখে যায়। সেটি ঠেকাতে গিয়ে উল্টো নিজের জালেই বল জড়িয়ে ফেলেন গোলরক্ষক নেমাতভ। আত্মঘাতী সেই গোলে ব্যবধান দাঁড়ায় ৪-০।
উজবেকিস্তান অবশ্য ৭৮ মিনিটে সান্ত্বনার গোলের খুব কাছাকাছি গিয়েছিল। শোমুরোদভের শট অল্পের জন্য ক্রসবারের ওপর দিয়ে চলে গেলে হতাশ হতে হয় তাদের। শেষদিকে আরও একবার জ্বলে ওঠে পর্তুগাল। ৮৭ মিনিটে ডান দিক থেকে নেলসন সেমেদোর দারুণ ক্রস পেয়ে বদলি খেলোয়াড় রাফায়েল লেয়াও জালের ওপরের বাঁ কোণায় নিখুঁত শটে বল পাঠিয়ে স্কোরলাইন ৫-০ করেন।
যোগ করা সময়ে হ্যাটট্রিকের সুযোগ পেয়েও গোল করতে পারেননি রোনালদো। তবে তাতে ম্যাচের গল্প বদলায়নি। রেকর্ডগড়া জোড়া গোল আর দলীয় আধিপত্যের প্রদর্শনীতে পর্তুগাল তুলে নেয় বিশ্বকাপের অন্যতম দাপুটে জয়। উদ্বোধনী ম্যাচের ধাক্কা ভুলে নকআউটের লড়াইয়ে নিজেদের শক্ত অবস্থানের বার্তাও দিয়ে রাখল রোনালদোর দল।