বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ। প্রথম দিনই তিনটি লাল কার্ড। বিশ্বকাপ শুরু হতেই রেফারি দেখালেন তিন তিনটি লাল কার্ড। তাও আবার এক ম্যাচে! প্রশ্ন উঠেছে, ২০২৬ বিশ্বকাপে কি আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর হতে যাচ্ছেন রেফারিরা?
চার বছর আগের কাতার বিশ্বকাপের পুরো আসরে লাল কার্ড দেখানো হয়েছিল মাত্র চারটি। আর এবার? প্রথম ম্যাচেই তিনটি! এবারের বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই কি রেফারিরা লাল নিশান উড়িয়ে দিলেন?
অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্বোধনী ম্যাচে লাল কার্ডের সেই সময়টায় একটু ফিরি।
৪৫+২ মিনিট : দক্ষিণ আফ্রিকার ইয়াইয়া সিথোলে গোলের সামনে একা ছুটে যাওয়া ব্রায়ান গুতিয়েরেসকে ফাউল করেন। ওয়ান টু ওয়ান কেইসে ইনফ্রিজমেন্ট, তাও আবার পেছন থেকে। হাত দু’পাশে ফেলিয়ে সিথোলে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে তিনি ধাক্কা দিচ্ছেন না। তবে এরই ফাঁকে দুবার তিনি গুতিয়েরেসের পায়ে পা বাঁধিয়ে দেন। মাটিতে পড়ে যান গুতিয়েরেস। পেছনে দাঁড়িয়ে পুরো দৃশ্য দেখলেন রেফারি উইল্টন সাম্পায়ো। সঙ্গে সঙ্গে লাল কার্ড দেখিয়ে সিথোলোকে মার্চিং অর্ডার দেন।
৭৪ মিনিট : ভিএআরের পর্যালোচনার পর থেম্বা জোয়ানে সহিংস আচরণের দায়ে লাল কার্ড দেখেন। বল ছাড়া রবার্তো আলভারাদোর সঙ্গে ধাক্কাধাক্কির সময় তার মাথায় থাপ্পড় বসিয়ে দেন জোয়ানে। মাঠে প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংহিংস আচরণ কোনো যুক্তিতেই গ্রহণযোগ্য নয়।
৯০+৪ মিনিট : মেক্সিকোর সিজার মন্টেস দক্ষিণ আফ্রিকার খুলিসো মুদাউকে গোলের সুস্পষ্ট সুযোগের মুহূর্তে ফাউল করেন। রেফারি সঙ্গে সঙ্গে লাল কার্ড দেখান।
মেক্সিকো ম্যাচে ২-০ গোলে জিতলেও ম্যাচের সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে এই তিনটি লাল কার্ড।
২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপ এবং ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ—দুটি আসরেই রেফারিদের সংযত অবস্থান ছিল চোখে পড়ার মতো। দুই বিশ্বকাপ মিলিয়ে লাল কার্ডের সংখ্যা ছিল মাত্র আটটি। বিশেষ করে কাতারে পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র চারটি লাল কার্ড দেখানো হয়েছিল। ফলে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, বিশ্বকাপে অযথা লাল কার্ড দেখানোর যুগ শেষ। কিন্তু মেক্সিকো-দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচ যেন সেই ধারণায় বড় ধাক্কা দিল।
তবে সব লাল কার্ডকে এক পাল্লায় মাপার সুযোগ নেই।
প্রথম লাল কার্ডটি নিয়ে তেমন কোনো বিতর্ক নেই। সিথোলে মেক্সিকোর ব্রায়ান গুতিয়েরেসকে নিশ্চিত গোলের সুযোগে ফাউল করেছিলেন। আন্তর্জাতিক ফুটবলের নিয়ম অনুযায়ী এটি সরাসরি লাল কার্ডের অপরাধ।
তৃতীয় লাল কার্ডটিও অনেকটা একই ধরনের। মুদাউ বক্সের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। তার সামনে ছিল গোলের স্পষ্ট সম্ভাবনা। সিজার মন্টেসের বেপরোয়া ট্যাকলে সেই সুযোগ নষ্ট হয়। রিপ্লে দেখেও সিদ্ধান্ত বদলানোর প্রয়োজন মনে করেনি ভিএআর।
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু দ্বিতীয় লাল কার্ডটি। থেম্বা জোয়ানে ও রবার্তো আলভারাদোর মধ্যে বলের বাইরে ধাক্কাধাক্কির পর ভিএআরের নির্দেশে মনিটরে রিপ্লে দেখেন রেফারি উইলটন সাম্পাইও। এরপরই সহিংস আচরণের অভিযোগে জোয়ানেকে লাল কার্ড দেখান।
অনেক ফুটবল বিশেষজ্ঞের মতে, ঘটনাটি হলুদ কার্ডেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারত। আবার কেউ বলছেন, খেলোয়াড়দের অসদাচরণ কমাতে ফিফা এবার কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
২০১৭ সালে পিয়েরলুইজি কলিনা ফিফার প্রধান রেফারিং কর্মকর্তা হওয়ার পর থেকেই রেফারিদের মূল নির্দেশনা ছিল—লাল কার্ড তখনই, যখন সেটি একেবারেই অনিবার্য। সেই কারণেই গত দুটি বিশ্বকাপে লাল কার্ডের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল।
তাহলে কি ২০২৬ বিশ্বকাপে নতুন বার্তা দেওয়া হচ্ছে?
এক ম্যাচ দেখে এমন সিদ্ধান্তে সিলমোহর মেরে দেওয়াটা অবশ্য যুক্তিযুক্ত হবে না। তবে উদ্বোধনী ম্যাচে তিনটি লাল কার্ড একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে—রেফারিরা নিয়ম প্রয়োগে কোনো ধরনের ছাড় দিতে রাজি নন। বিশ্লেষণ জানাচ্ছে, মাঠে দেওয়া দুটি সরাসরি লাল কার্ডের সিদ্ধান্তই যথেষ্ট গ্রহণযোগ্য ছিল। বিতর্ক রয়েছে মূলত ভিএআরের মাধ্যমে দেওয়া দ্বিতীয় লাল কার্ডটি নিয়ে। আর তাই একটি ম্যাচের ভিত্তিতে রেফারিদের নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। পুরো টুর্নামেন্ট শেষে তবেই বোঝা যাবে, ২০২৬ বিশ্বকাপ সত্যিই ‘লাল কার্ডের বিশ্বকাপ’ হয়ে ওঠে কি না।