আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষ ম্যাচ খেলার পর আবেগঘন বিদায়ী বক্তব্য দিয়েছেন লিওনেল মেসি। বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচ শেষে মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে দাঁড়িয়ে দুই দশকের বেশি সময়ের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার, সতীর্থ, সমর্থক ও আর্জেন্টিনার সঙ্গে তার গভীর সম্পর্কের কথা স্মরণ করেন বিশ্বকাপজয়ী এই তারকা।
শুরুতেই মেসি স্বীকার করেন, এমন মুহূর্তে কথা বলা তার জন্য মোটেও সহজ নয়। এত বছরের স্মৃতি আর আবেগ একসঙ্গে ফিরে আসায় কীভাবে শুরু করবেন, সেটাই যেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না তিনি। মেসি বলেন, ‘আজ কী বলব, সত্যিই বুঝতে পারছি না। মাথার মধ্যে একসঙ্গে কত কিছু ঘুরছে—এত স্মৃতি, এত আবেগ। সবার আগে বাবার কথাই মনে পড়ছে। এত বছর এই জার্সি পরতে পেরেছি, এর চেয়ে বড় সম্মান আমার কাছে আর কিছু হতে পারে না।’
কঠিন সময়ের কথাও স্মরণ করেছেন মেসি। জাতীয় দলের হয়ে ব্যর্থতা কিংবা সমালোচনার সময়েও কখনো লড়াই থেকে সরে যাননি বলে জানান তিনি। এ বিষয়ে মেসি বলেন, ‘‘সবচেয়ে কঠিন সময়েও আমি কখনো হাল ছাড়িনি। নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। দল থেকে কখনো মুখ ফিরিয়ে নিইনি। এই জার্সির জন্য সবসময় শেষ পর্যন্ত লড়াই করেছি।’
আর্জেন্টিনার জার্সিতে আর ফিরতে পারবেন না—এই বাস্তবতাই তার জন্য সবচেয়ে কষ্টের বলে জানান মেসি। বিদায় নিতে মন না চাইলেও ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে এসে সিদ্ধান্তটি সঠিক বলেই মনে করছেন তিনি, ‘সত্যি বলতে, আমার ইচ্ছে ছিল যতদিন সম্ভব এখানেই থেকে যাই। এই দলের সঙ্গে, এই মানুষগুলোর সঙ্গে আরও অনেকটা সময় কাটাই। কিন্তু মনে হচ্ছে, সরে দাঁড়ানোর জন্য এটাই সঠিক সময়। আর এই আকাশি-সাদা জার্সি পরে আর মাঠে ফিরতে না পারার অনুভূতিটা অবশ্যই খুব কষ্টের হবে।’
গত বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতাও উঠে আসে তার কথায়। সেই আসরটি মানসিক ও শারীরিকভাবে তাকে অনেকটাই নিঃশেষ করে দিয়েছিল বলে জানান মেসি, ‘শেষ বিশ্বকাপটা আমার জন্য খুব কঠিন ছিল। শারীরিকভাবে যেমন চাপ ছিল, মানসিকভাবেও ছিল অনেক কিছু। আমরা আবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে চেয়েছিলাম। খুব কাছেও পৌঁছে গিয়েছিলাম। আমরা নিজেদের সবটুকু দিয়েছিলাম।’
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটির প্রসঙ্গ টেনে মেসি বলেন, সেই লড়াই তাদের জন্য কতটা কঠিন ছিল। মেসি বলেন, ‘ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটা আমাদের শরীর ও মন—দুই দিক থেকেই অনেকটা শেষ করে দিয়েছিল। সত্যি বলতে, এরপর আমরা কোনোভাবে নিজেদের টেনে নিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু লড়াই থামাইনি। এই জার্সির জন্য আমরা সবসময় যেভাবে লড়েছি, সেভাবেই লড়ে গেছি।’
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে যেসব সতীর্থকে পাশে পেয়েছেন, তাদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন মেসি। আর্জেন্টাইন মহাতারকার ভাষ্য, ‘আমার সতীর্থদের ধন্যবাদ দেওয়ার মতো যথেষ্ট শব্দ আমার কাছে নেই। তারা আমার ছোটবেলার স্বপ্ন পূরণ করতে সাহায্য করেছে। বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা—যে শিরোপাগুলো আমরা জিতেছি, সেগুলোর প্রতিটি মুহূর্ত তাদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পেরেছি। মাঠের বাইরেও তাদের সঙ্গে কাটানো সময়গুলো আমার জীবনের অন্যতম সেরা স্মৃতি।’
সতীর্থদের নিয়ে নিজের আস্থার কথাও বলেছেন মেসি, ‘আমি সবসময় জানতাম, আমার পাশে এমন কিছু মানুষ আছে যারা এই জার্সির জন্য সবকিছু দিতে প্রস্তুত। তাই যেকোনো প্রতিপক্ষের বিপক্ষেই আমি আত্মবিশ্বাস নিয়ে মাঠে নামতে পেরেছি।’
এরপর আর্জেন্টিনার সমর্থকদের কথা বলতে গিয়ে আরও আবেগী হয়ে পড়েন মেসি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জাতীয় দলের হয়ে খেলার স্মৃতি তার কাছে বিশেষ হয়ে থাকবে, ‘আমি দেশের বিভিন্ন জায়গায় খেলার সুযোগ পেয়েছি। যেখানেই গিয়েছি, মানুষের কাছ থেকে অসাধারণ ভালোবাসা পেয়েছি। বিশ্বকাপ হোক কিংবা কোপা আমেরিকা—সব জায়গাতেই গ্যালারি ভরা দেখেছি। অনেক মানুষ অনেক দূর থেকে, অনেক কষ্ট করে আমাদের খেলা দেখতে এসেছেন। তাদের সেই ভালোবাসা আমরা সবসময় অনুভব করেছি।’
মেসির কাছে সবচেয়ে বড় ব্যাপার ছিল, দেশের যেকোনো প্রান্তে খেললেও সমর্থকদের কারণে নিজের মাঠে খেলার অনুভূতি পাওয়া। বিশ্বসেরা তারকা বলেন, ‘আপনারা আমাদের এমনভাবে গ্রহণ করেছেন যে, দেশের বাইরে তো নয়ই, দেশের অন্য কোনো মাঠেও কখনো মনে হয়নি আমরা অপরিচিত জায়গায় খেলছি। সবসময় মনে হয়েছে, আমরা নিজেদের ঘরের মাঠেই আছি।’
মনুমেন্তালের বিশেষ একটি স্মৃতির কথাও বলেন মেসি। বিশ্বকাপ জয়ের পর এই মাঠেই জাতীয় দলের হয়ে আবার খেলতে নেমেছিলেন তারা, ‘এই মাঠেই আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সুন্দর দিনগুলোর একটি কাটিয়েছি। বিশ্বকাপ জেতার পর যখন আবার এখানে খেলতে এসেছিলাম, সেই দিনটার কথা আমি কখনো ভুলতে পারব না। এখনো সেই দিনের ভিডিও দেখলে আমার চোখে পানি চলে আসে। সেদিন যা হয়েছিল, সেটা শুধু আমার জীবনের নয়, আমার পরিবারের এবং পুরো দেশের ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। এত সুন্দর একটা মুহূর্ত উপহার দেওয়ার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ।’
কিন্তু সেই একই মাঠে এবার দাঁড়িয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন অনুভূতি নিয়ে কথা বলতে হচ্ছে তাকে, ‘আজ আবার এই মাঠে দাঁড়িয়ে আছি, কিন্তু আজকের দিনটা আমার ফুটবল জীবনের সবচেয়ে কষ্টের দিনগুলোর একটি। কারণ আজ আমাকে জাতীয় দলকে, আপনাদের সবাইকে বিদায় বলতে হচ্ছে। এই জার্সি পরে লড়াই করাটা আমি খুব মিস করব।’
তবে জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়ালেও আর্জেন্টিনার সঙ্গে তার সম্পর্ক শেষ হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন মেসি। তার ভাষায়, ‘আমি হয়তো আর মাঠে আপনাদের সঙ্গে থাকব না। কিন্তু আপনাদের থেকে দূরে যাচ্ছি না। এখন থেকে বাইরে দাঁড়িয়ে এই ছেলেদের সমর্থন করব। যারা ভবিষ্যতে জাতীয় দলে আসবে, তাদেরও পাশে থাকব। আমরা সবসময় একসঙ্গেই থাকব।’
আর্জেন্টিনার সাম্প্রতিক সাফল্যের পেছনে ঐক্যকে সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে দেখেন মেসি, ‘আমরা যখন একসঙ্গে থেকেছি, তখনই সবচেয়ে শক্তিশালী হয়েছি। আমরা দেখিয়ে দিয়েছি, একতাবদ্ধ থাকলে অনেক কঠিন কাজও সম্ভব। সামনে কঠিন সময় আসতেই পারে। কারণ আমরা গত কয়েক বছরে এমন কিছু অর্জন করেছি, যা ধরে রাখা সহজ নয়। তাই কঠিন সময়ে এই ছেলেদের আরও বেশি সমর্থন করতে হবে। আমাদের পাশে থাকতে হবে। আমি ওদের সবসময় একটা কথাই বলি—বড় কিছু অর্জন করতে হলে আগে একটা শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ দল তৈরি করতে হয়।’
জাতীয় দলের ব্যর্থতার অপেক্ষায় থাকা মানুষদেরও ইঙ্গিত করেছেন মেসি, ‘কিছু মানুষ সবসময় অপেক্ষা করে থাকে, কখন জাতীয় দল ব্যর্থ হবে। আমরা কোনোভাবেই তাদের সেই আনন্দ দিতে পারি না। কঠিন সময়েই আসলে বোঝা যায় একটা দলের ভেতরে কতটা শক্তি আছে। দলের ভেতরের সম্পর্ক যদি শক্ত না হয়, তাহলে বড় কিছু অর্জন করা খুব কঠিন। আমরা ভাগ্যবান যে আমাদের মধ্যে সেই বন্ধনটা ছিল। আমরা একে অন্যের ওপর বিশ্বাস করেছি, একসঙ্গে থেকেছি। আর এ কারণেই এত কিছু অর্জন করতে পেরেছি।’
সবশেষে নিজের আবেগ আর ধরে রাখতে পারেননি মেসি। তার শেষ কথা, ‘সত্যি বলতে, আজ আমি অনেক বেশি কথা বলে ফেললাম। কিন্তু আমার আসলে যেতে ইচ্ছে করছে না। এই মাঠ, এই সবুজ গালিচা, এই জার্সি—সবকিছু ছেড়ে চলে যেতে মন চাইছে না। আমি শুধু এটুকু বলতে চাই, আমি আপনাদের ভালোবাসি। আপনাদের খুব মনে পড়বে। একজন আর্জেন্টাইন হয়ে জন্মাতে পেরেছি, এ জন্য আমি ঈশ্বরের কাছে সবসময় কৃতজ্ঞ থাকব। আর্জেন্টাইন হিসেবে আমি গর্বিত। আপনাদের সঙ্গে থেকে আমার স্বপ্নগুলো পূরণ করতে পেরেছি—এর চেয়ে বড় গর্ব আর কী হতে পারে? আপনাদের সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আমি আপনাদের ভালোবাসি।’