ফুটবল বিশ্ব এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বুয়েনস এইরেসের বিখ্যাত মনুমেন্তালে বেনিনের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচের মধ্য দিয়ে আর্জেন্টিনার জার্সিতে বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টেনেছেন লিওনেল মেসি। সর্বকালের অন্যতম সেরা এই ফুটবল জাদুকরের জাতীয় দলের বিদায়ে পুরো ক্রীড়াজগৎ শ্রদ্ধায় অবনত, তখন সবচেয়ে বিশেষ বার্তাটি এসেছে তার দীর্ঘদিনের বন্ধু ও চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ব্রাজিলের তারকা নেইমার জুনিয়রের কাছ থেকে।
বার্সেলোনা থেকে শুরু করে পিএসজি—মাঠের লড়াইয়ে দীর্ঘ পথচলায় দুজনে গড়ে তুলেছিলেন রূপকথার মতো এক বন্ধুত্বের গল্প। প্রিয় বন্ধুর এই শেষ ম্যাচে নেইমারের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া আবেগঘন বার্তাটি ছুঁয়ে গেছে বিশ্বজুড়ে কোটি ভক্তের হৃদয়।
মেসিকে নিয়ে নেইমার লিখেছেন, ‘যারা ফুটবল ভালোবাসেন, তারা এত বছর ধরে তোমাকে উপভোগ করার সুযোগ পেয়েছেন...’
ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার ঐতিহাসিক ফুটবল বৈরিতা এবং ২০২১ কোপা আমেরিকার ফাইনালের স্মৃতি রোমন্থন করে নেইমার আরও যোগ করেন, মারাকানায় সেবার ব্রাজিল হেরে গেলেও মেসির প্রথম আন্তর্জাতিক ট্রফি জয়ের মুহূর্তটি ছিল অনন্য। বন্ধুকে শুভকামনা জানিয়ে তিনি লেখেন, ‘আজ তোমার দেশের, তোমার জাতীয় দলের জার্সিতে শেষ ম্যাচ। আশা করি, প্রতিটি সেকেন্ড উপভোগ করবে। আজকের সব শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা যেন তোমাকে আনন্দ দেয়।’
শুধু আর্জেন্টিনা বা লাতিন আমেরিকা নয়, ফুটবলের জন্য মেসির অবদান যে বিশ্বব্যাপী, সেটিও মনে করিয়ে দিয়েছেন এই ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড। ৩৪ বছর বয়সী নেইমারের ভাষায়— ‘তুমি ফুটবলের জন্য যা কিছু করেছ, তার জন্য শুধু আর্জেন্টিনা নয়, পুরো বিশ্ব তোমার কাছে কৃতজ্ঞ।’
বার্তাটির সবচেয়ে আবেগপ্রবণ অংশটিতে নেইমার তুলে ধরেছেন তাদের দুই মহারথীর পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের গল্প। তিনি লিখেছেন— ‘ফুটবলকে আরও বেশি ভালোবাসতে শেখানোর জন্য তোমাকে ধন্যবাদ। তোমার বিপক্ষে খেলতে পেরেছি, সেটাই ছিল সম্মানের। আর তোমার সঙ্গে ইতিহাসের অংশ হতে পারা ছিল আরও বড় সম্মানের।’
ফুটবলের ইতিহাসে এই ‘ইতিহাসের অংশ’ হওয়া মানেই ২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বার্সেলোনাতে মেসি, নেইমার ও লুইস সুয়ারেজের গড়া সেই ত্রয়ী— ‘এমএসএন’। এই অপ্রতিরোধ্য আক্রমণভাগ বার্সেলোনাকে এনে দিয়েছিল ৯টি বড় শিরোপা, যার মধ্যে ২০১৫ সালের উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ ও ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ ছিল অন্যতম উজ্জ্বল অর্জন। পরবর্তীতে প্যারিস সেন্ট জার্মেইয়ে (পিএসজি) আরও দুই মৌসুম একসঙ্গে কাটিয়েছেন তারা। ক্লাব ও আন্তর্জাতিক আঙিনায় মিলিয়ে ২০৬টি ম্যাচে একসঙ্গে লড়াই করার সঙ্গে তারা বুনে গেছেন এক অটুট বন্ধুত্বের জাল।
আজ মাঠে লিওনেল মেসি আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে শেষবারের মতো আলো ছড়িয়েছেন ষ। আর গ্যালারি বা টিভি স্ক্রিনের ওপারে থেকে সেই দৃশ্য দেখেছেন নেইমার। কিন্তু দূর থেকেও ব্রাজিলিয়ান তারকার এই কথাগুলো বুঝিয়ে দিচ্ছে— মেসির এই বিদায় কেবল একটি দেশের বা একটি দলের নয়, এটি ফুটবল নামের বিশাল পৃথিবীর এক অনন্য অধ্যায়ের সমাপ্তি।