হোম > খেলা > ফুটবল

ইরানের বিশ্বকাপ উন্মাদনা হারিয়ে গেছে বিষণ্ণতার ছায়ায়

স্পোর্টস ডেস্ক

বিশ্বকাপ এলেই একসময় ইরানের শহরগুলো রূপ নিত উৎসবের নগরীতে। জাতীয় দল বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করলেই রাস্তায় নেমে আসত হাজারো মানুষ। গাড়ির হর্ন, পতাকার ঢেউ আর বিজয় মিছিলে রাতভর মুখর থাকত তেহরান থেকে তাবরিজ। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের আগে সেই ইরান যেন অনেকটাই অপরিচিত। বিশ্বকাপে জায়গা নিশ্চিত করেছে ইরান। অথচ নেই বড় কোনো উদযাপন, নেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উৎসবের বন্যা। যে অর্জন এক সময় জাতীয় উৎসবের উপলক্ষ হতো, এবার তা যেন নিঃশব্দেই পেরিয়ে গেছে।

প্রয়াত ইরানি চলচ্চিত্রকার আব্বাস কিয়ারোস্তামি একবার লিখেছিলেন, ভয়াবহ ভূমিকম্পে পরিবার হারানো এক ব্যক্তি ভাঙাচোরা গ্রামের মধ্যে দাঁড়িয়ে টেলিভিশনের অ্যান্টেনা ঠিক করছিলেন, শুধু আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল ম্যাচটি দেখার জন্য। সেই অভিজ্ঞতা থেকে কিয়ারোস্তামি লিখেছিলেন, ‘তখন আমি বুঝেছিলাম, ওই বিপর্যয়ের পরও মানুষের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল জীবন; তারপর ফুটবল।

এক সময় ফুটবল সত্যিই ছিল ইরানিদের কাছে জীবনেরই এক সম্প্রসারণ। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে জায়গা করে নেওয়ার স্মৃতি এখনো দেশটির ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তগুলোর একটি। অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে বিশ্বকাপে ওঠার পর যে উদযাপন হয়েছিল, তা অনেকের কাছে জাতীয় বিজয়ের সমার্থক হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সময় বদলেছে।

২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর শুরু হওয়া ‘নারী জীবনের স্বাধীনতা’ আন্দোলন ইরানি সমাজকে নতুনভাবে বিভক্ত করে। সে সময় জাতীয় দলের খেলোয়াড়রা বিক্ষোভ দমনের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেননি বলে অভিযোগ ওঠে। কাতার বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের আগে জাতীয় সংগীত না গেয়ে প্রতিবাদের একটি ইঙ্গিত দিলেও অনেকের ক্ষোভ কমেনি। এরপর থেকেই সমাজের একটি অংশের কাছে জাতীয় দল হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বকারী একটি প্রতীক, জনগণের নয়।

বহু বছর ধরে দেশের বাইরে বসবাস করা ৪২ বছর বয়সি নিমার কথায় সে হতাশার প্রতিফলন স্পষ্ট, ‘ইরানের জাতীয় দল এক সময় মানুষের প্রতিনিধিত্ব করত। এখন তারা সরকারের প্রচারের অংশ হয়ে গেছে। তাই তাদের ফলাফল নিয়ে আমার আর কোনো আগ্রহ নেই।’ জাতীয় দল থেকে এই মানসিক দূরত্বের সঙ্গে যোগ হয়েছে অর্থনৈতিক সংকট, মূল্যস্ফীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং যুদ্ধের ছায়া। ফলে বিশ্বকাপও আর মানুষের দৈনন্দিন উদ্বেগকে ছাপিয়ে উঠতে পারছে না। ৩৮ বছর বয়সি আরিয়া যেমন বলেছেন, ‘আমার জীবনে কখনো বিশ্বকাপকে এতটা গুরুত্বহীন মনে হয়নি। যুদ্ধ, অর্থনৈতিক অবস্থা আর গত বছরের কষ্টগুলো মানুষের মন থেকে ফুটবলকে সরিয়ে দিয়েছে।’ তার মতে, বর্তমান প্রজন্মের জাতীয় দল কখনই সাধারণ মানুষের সঙ্গে সেই আবেগী সংযোগ তৈরি করতে পারেনি, যা আগের দলগুলো পারত।

ইরানের ক্রীড়া সাংবাদিক ও টেলিভিশন উপস্থাপক আলি মোঘানির পর্যবেক্ষণও একই রকম, ‘বিশ্বকাপের আগের মৌসুম হওয়া সত্ত্বেও এবারের লিগে কোনো উত্তেজনা ছিল না। মনে হচ্ছিল সবাই শুধু দায়িত্ব পালন করছে। ফুটবল এখন আর ইরানি সমাজের প্রধান আলোচ্য বিষয় নয়।’ দেশের বাইরে থাকা ফারসি ভাষার গণমাধ্যমগুলোর সমালোচনাও এই দূরত্ব বাড়িয়েছে বলে মনে করেন অনেক পর্যবেক্ষক। বিশেষ করে জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের সরকারঘনিষ্ঠ হিসেবে উপস্থাপন করার ফলে জনমতের একটি অংশ আরো নেতিবাচক হয়েছে। তবুও আশার আলো পুরোপুরি নিভে যায়নি।

ইরানের জনপ্রিয় ক্রীড়াবিষয়ক ওয়েবসাইট ভারজেশ থ্রির সম্পাদক পেজমান রাহবার মনে করেন, যুদ্ধপরিস্থিতি ও দীর্ঘদিনের ইন্টারনেট সীমাবদ্ধতা কেটে গেলে বিশ্বকাপের আবহ আবারও ফিরতে পারে। তবে তারও প্রশ্ন রয়ে গেছে, ‘বিশ্বকাপের উন্মাদনা ফিরবে; কিন্তু জাতীয় দলের প্রতি আগের সেই আবেগ কি ফিরবে? আমি নিশ্চিত নই।’

হয়তো এটাই আজকের ইরান ফুটবলের সবচেয়ে বড় সংকট। মাঠে জয়-পরাজয়ের হিসাব নয়, বরং মানুষের হৃদয়ের সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া সম্পর্ক পুনর্গঠন। আর তাই ২০২৬ বিশ্বকাপে ইরানের সবচেয়ে বড় লড়াই হয়তো প্রতিপক্ষের বিপক্ষে নয়, নিজেদের মানুষদের আবার পাশে ফিরিয়ে আনার। হয়তো গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে ইতিহাস গড়ার মতো কোনো সাফল্যই আবার ফুটবলকে ইরানিদের কাছে সেই পুরোনো অর্থ ফিরিয়ে দিতে পারে। যে অর্থ একদিন কিয়ারোস্তামি দেখেছিলেন ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও। ইরানিদের কাছে ফের বেঁচে থাকার অর্থটাই হয়ে উঠবে কেবল ফুটবল।

হুমকির মুখে বিশ্বকাপের পাঁচ রেকর্ড

গরিলা-হাতি-জিরাফ-পুমা এখন বিশ্বমঞ্চের জ্যোতিষী

ফুটবল ইতিহাসে নিজের নাম লিখেছি : নেইমার

ভারতের কাছে হেরে স্বপ্নভঙ্গ বাংলাদেশের

জিতলেও দলের দুর্বলতা দেখছেন কোচ ডুলি

শুরুর আগেই বিশ্বকাপ শেষ জার্মানির কার্লের!

গোল লাইনে বল নিয়ে বিতর্ক

ঋতুপর্ণার গোলে স্বস্তির সমতায় বিরতিতে বাংলাদেশ

‘পানি নিয়েও ব্যবসা’ অভিযোগের পর অবস্থান বদলাল ফিফা

ভিসা পেলেন ইরানের ফুটবলাররা, অনিশ্চয়তায় কর্মকর্তারা