নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আগামীকাল রাতে যখন বাঁশি বাজবে, তখন শুধু একটি ফুটবল ম্যাচের সূচনা হবে না; দুই ভিন্ন গল্পও ফুটে উঠবে। এক পাশে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে সফল দল ব্রাজিল; যাদের জার্সির হলুদ রঙে মিশে আছে পাঁচটি বিশ্বশিরোপার গৌরব। অন্য পাশে মরক্কো; যারা মাত্র চার বছর আগে আফ্রিকার ফুটবলকে নতুন উচ্চতায় তুলে নিয়ে ইতিহাসের পাতায় নিজেদের নাম লিখেছিল। ২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘সি’-তে নিজেদের প্রথম ম্যাচে মুখোমুখি হচ্ছে এই দুদল। রোববার বাংলাদেশ সময় ভোর ৪টায় মাঠে নামবে ব্রাজিল ও মরক্কো।
ব্রাজিলের জন্য এই বিশ্বকাপ কেবল আরেকটি টুর্নামেন্ট নয়। নিজেদের ঐতিহ্য ফিরে পাবার লড়াইও। সবশেষ ২০০২ সালে শিরোপা উচিয়ে ধরেছিল সেলেসাওরা। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ ২৪ বছর। এই সময়ে পাঁচটি বিশ্বকাপ গেলেও ব্রাজিলের “মিশন হেক্সা’ অপূর্ণই রয়ে গেছে। এর আগে ব্রাজিলের এই অবস্থা দেখা গিয়েছিল ১৯৭০ থেকে ১৯৯৪ সালের মধ্যে। ভাগ্যের এক অদ্ভুত মিল—সেই খরা যেমন শেষ হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে, এবারও বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্র। তবে কি কাকতালীয়ভাবে এবারও কাটছে সেলেসাওদের শিরোপা খরা? এই প্রশ্নের উত্তর মেলানোর মিশনে ব্রাজিলের সামনে প্রথম বাধা মরক্কো।
এই আশার কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন কার্লো আনচেলত্তি। ২০২৫ সালের মে মাসে ইতিহাস গড়ে প্রথমবারের মতো কোনো বিদেশিকে জাতীয় দলের কোচ হিসেবে নিয়োগ দেয় ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশন। ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে সাফল্যের পাহাড় গড়া এই ইতালিয়ান কোচ এখন নতুন এক অভিযানে নেমেছেন। তার কাঁধে দায়িত্ব ব্রাজিলকে আবারও বিশ্বসেরার আসনে ফিরিয়ে নেওয়ার।
তবে বিশ্বমঞ্চে পা রাখার পথটা মোটেও মসৃণ ছিল না। দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলের বাছাইপর্বে ১৮ ম্যাচে ৮ জয়, ৪ ড্র ও ৬ হারে পঞ্চম হয়ে বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে হয়েছে ব্রাজিলকে। শেষ বাছাই ম্যাচে বলিভিয়ার কাছে হার, আর সাম্প্রতিক সময়ে জাপান ও ফ্রান্সের বিপক্ষে পরাজয় প্রশ্ন তুলেছিল দলটির সামর্থ্য নিয়ে। যদিও বিশ্বকাপের আগে ক্রোয়েশিয়া, পানামা ও মিশরের বিপক্ষে টানা তিন জয়ে সেই সংশয়ের অনেকটাই দূর করেছে আনচেলত্তির শিষ্যরা। বিশ্বকাপ ইতিহাসও ব্রাজিলের পক্ষেই কথা বলে। ১১৪ ম্যাচ খেলে ৭৪ জয় এবং পাঁচটি শিরোপা—এই পরিসংখ্যান অন্য কোনো দেশের নেই। আফ্রিকার দলগুলোর বিপক্ষেও বিশ্বকাপে তাদের রেকর্ড ঈর্ষণীয়। আট ম্যাচের সাতটিতেই জয় পেয়েছে তারা। তবে ফুটবল যে শুধু ইতিহাসের খেলা নয়, তা সবচেয়ে ভালো করেই জানে মরক্কো।
২০২২ সালে কাতারের মরুভূমি থেকে যে রূপকথার জন্ম হয়েছিল, তার নাম মরক্কো। আফ্রিকার প্রথম দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌঁছে তারা শুধু নিজেদের নয়, পুরো মহাদেশের স্বপ্নকে নতুন রঙে রাঙিয়েছিল। সেই দলের অনেক মুখ এখনো আছেন, সেই আত্মবিশ্বাসও রয়ে গেছে অটুট। বর্তমান ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে সপ্তম স্থানে থাকা মরক্কো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের অন্যতম ধারাবাহিক দল। ২০২৩ সালের শুরু থেকে ৪৫ ম্যাচে মাত্র দুই হার তাদের উত্থানের গল্পই বলে। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে আট ম্যাচের সবকটিতে জয় পেয়েছিল তারা। যদিও বিশ্বকাপের ঠিক আগে কোচ ওয়ালিদ রেগরাগুইয়ের পদত্যাগ কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি করেছিল, নতুন কোচ মোহাম্মদ ওয়াহবির অধীনেও দলটি অপরাজিত রয়েছে।
মরক্কোর শক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবেন অধিনায়ক আশরাফ হাকিমি। তার সঙ্গে আক্রমণভাগে ব্রাহিম দিয়াজ, ইসমাইল সাইবারি ও বিলাল এল খান্নুসের মতো প্রতিভাবান ফুটবলাররা ব্রাজিলের রক্ষণকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলতে পারেন। বিশেষ করে দিয়াজের সাম্প্রতিক ফর্ম মরক্কোর জন্য বাড়তি আত্মবিশ্বাসের উৎস।
অন্যদিকে, ব্রাজিলকে কিছুটা ভাবাচ্ছে ইনজুরি। সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা নেইমার এখনো পুরোপুরি ফিট নন। রাইট-ব্যাক ওয়েসলিও ছিটকে গেছেন। তবে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রাফিনিয়া, ব্রুনো গিমারায়েস, গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েস এবং গোলবারের নিচে অ্যালিসন বেকারের মতো তারকারা ব্রাজিলকে এখনও শিরোপাপ্রত্যাশীদের কাতারে রাখছে।
ব্রাজিল ও মরক্কো এখন পর্যন্ত মুখোমুখি হয়েছে মাত্র তিনবার। সেই লড়াইয়ে সামান্য এগিয়ে আছে ব্রাজিল। সেলেসাওরা জিতেছে দুটি ম্যাচ, আর মরক্কোর ঝুলিতে আছে একটি জয়। দুই দলের প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল প্রায় তিন দশক আগে, ১৯৯৭ সালের অক্টোবরে। ম্যাচটি ২-০ ব্যবধানে জিতে মারিও জাগালোর কোচিংয়ে থাকা ব্রাজিল। এর ঠিক এক বছর পর ১৯৯৮ বিশ্বকাপে আবার মুখোমুখি হয় দুই দল। সেই ম্যাচে ৩-০ ব্যবধানে সহজ জয় পায় সেলেসাওরা। ব্রাজিলের বিপক্ষে প্রতিশোধ নিতে মরক্কোকে অপেক্ষা করতে হয়েছে প্রায় ২৫ বছর। ২০২৩ সালের মার্চে তানজিয়ারে অনুষ্ঠিত একটি প্রীতি ম্যাচে ২-১ ব্যবধানে জয় পায় আটলাস লায়ন্সরা।
রোববারের ম্যাচে হয়তো কোনো শিরোপা জেতা হবে না, কোনো দল বিদায়ও নেবে না। কিন্তু বিশ্বকাপের দীর্ঘ যাত্রাপথে প্রথম পদক্ষেপটিই অনেক সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ব্রাজিল চাইবে তাদের সোনালি অতীতকে সামনে রেখে নতুন স্বপ্নের পথে হাঁটতে। আর মরক্কো চাইবে প্রমাণ করতে, কাতারের সেমিফাইনাল কোনো দুর্ঘটনা ছিল না, বরং নতুন এক ফুটবল শক্তির উত্থানের ঘোষণা।
মেটলাইফ স্টেডিয়ামের আলো ঝলমলে রাতে তাই বিশ্বকাপ দেখবে দুই মহাদেশের দুই স্বপ্নের মুখোমুখি দাঁড়ানো। একদিকে ট্রফি জয়ের তৃষ্ণা, অন্যদিকে ইতিহাস পুনর্লিখনের আকাঙ্ক্ষা। আর ফুটবলপ্রেমীরা অপেক্ষায় থাকবে—শেষ পর্যন্ত কার গল্পে নতুন অধ্যায় যোগ হয়।