ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক আরো গভীর করার সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে মরক্কোর বিভিন্ন শহরে ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে বিক্ষোভ-সমাবেশ হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।
২৭ সেপ্টেম্বর দেশটির বিভিন্ন শহরে সর্বশেষ এই বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। ফিলিস্তিনের সমর্থন ও ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের বিরোধিতায় মরক্কান ফ্রন্ট ফর সাপোর্টিং প্যালেস্টাইন অ্যান্ড অ্যাগেইনস্ট নরমালাইজেশনের ডাকে তিন দিনের কর্মসূচির অংশ হিসেবে এ বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়।
এর আগে ১৬ সেপ্টেম্বর মরক্কো ও ইসরাইল তাদের কূটনৈতিক মিশন পূর্ণাঙ্গ দূতাবাসে উন্নীত এবং দুই দেশে রাষ্ট্রদূত নিয়োগের ঘোষণা দেয়। এর প্রতিবাদে ২৫ সেপ্টেম্বর মরক্কান কমিটি ফর সাপোর্টিং দ্য নেশনস কজেস জানায়, ‘আল-আকসার জন্য এবং সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের বিরুদ্ধে শুক্রবার’ স্লোগানে তারা ৪৫টি শহরে ৭৬টি কর্মসূচি আয়োজন করেছে।
মরক্কোর গণমাধ্যমের খবরে রাজধানী রাবাত, কাসাব্লাঙ্কা, মারাকেশ, তানজিয়ার, ফেজ, আগাদির, ওজদা, তেতুয়ান, কেনিত্রা ও সালে শহরে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
রাবাতে বিক্ষোভকারীরা পার্লামেন্টের সামনে জড়ো হন। মারাকেশে একটি সমাবেশ পরে শহরের কয়েকটি প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে মিছিলে রূপ নেয়। কিছু শহরে বিক্ষোভে বিধিনিষেধ ও আটকের ঘটনাও ঘটেছে বলে স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে।
তানজিয়ারে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ২৭ সেপ্টেম্বরের নির্ধারিত একটি বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করে। পরে আচকাইন-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, নিরাপত্তা বাহিনী কয়েকশ বিক্ষোভকারীকে ছত্রভঙ্গ করে এবং ১২ জনের বেশি মানুষকে আটক করে। লাকোম জানিয়েছে, মদিকেও বিক্ষোভ ঠেকানো হয়। আগাদিরে একটি সমাবেশ যাতে মিছিলে রূপ নিতে না পারে, সে জন্য নিরাপত্তা বাহিনী সেটি ঘিরে রাখে।
মরক্কান কমিটি ফর সাপোর্টিং দ্য নেশনস কজেস পরে এসব নিষেধাজ্ঞা, বিধিনিষেধ ও আটকের নিন্দা জানায়।
২০২০ সালে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন
মরক্কো ২০২০ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের কাঠামোর আওতায় ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করে। যার বিনিময়ে ওয়াশিংটন পশ্চিম সাহারার ওপর মরক্কোর সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দেয়।
১৬ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্র, মরক্কো ও ইসরাইলের ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে মরক্কোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী নাসের বুরিতা ও ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সা'আর বৈঠক করেন। বৈঠকে দুই দেশের কূটনৈতিক মিশন পূর্ণাঙ্গ দূতাবাসে উন্নীত ও রাষ্ট্রদূত বিনিময়ের পরিকল্পনা নিশ্চিত করা হয়।
এ ছাড়া বিনিয়োগ সুরক্ষা ও দ্বৈত কর এড়ানো, সরাসরি ফ্লাইট বাড়ানো এবং উচ্চপর্যায়ের পারস্পরিক সফরের বিষয়ে চুক্তি করার সিদ্ধান্ত হয়। ফলে ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠিত কূটনৈতিক সম্পর্কের বাইরে দুই দেশের অর্থনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও পরিবহন যোগাযোগ আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে ফিলিস্তিনপন্থি সংগঠনগুলো শুরু থেকেই এই সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের বিরোধিতা করে আসছে। গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধের মধ্যে সম্পর্ক আরও গভীর করার সিদ্ধান্ত সেই বিরোধিতাকে নতুন করে সামনে এনেছে।
আরব সেন্টার ফর রিসার্চের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ক্যাথিয়া কে বেরাদা আলজাজিরাকে বলেন, গাজা যুদ্ধের কারণে জনমত ও সরকারি কূটনীতির মধ্যে দূরত্ব আরও স্পষ্ট হয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের পক্ষে বা বিপক্ষে মরক্কোর কত শতাংশ মানুষ রয়েছেন, তা নির্ধারণের মতো নির্ভরযোগ্য জনমত-তথ্য পর্যাপ্ত নয়।
নির্বাচনের পর নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
বিক্ষোভের কয়েক দিন আগে ২৩ সেপ্টেম্বর মরক্কোতে পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ৩৯৫ আসনের পার্লামেন্টে অথেনটিসিটি অ্যান্ড মডার্নিটি পার্টি ৯৭টি, ন্যাশনাল র্যালি অব ইন্ডিপেনডেন্টস ৬৬টি, ইস্তিকলাল পার্টি ৬৫টি এবং জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (পিজেডি) ৫৪টি আসন পেয়েছে।
২০২১ সালের নির্বাচনে পিজেডি পেয়েছিল মাত্র ১৩টি আসন। এবারের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৩৮ দশমিক ০৮ শতাংশ, যা ২০২১ সালের ৫০ দশমিক ৮৬ শতাংশ এবং ২০১৬ সালের ৪২ দশমিক ২৭ শতাংশের চেয়ে কম।
২০২০ সালে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের সময় মরক্কোর ক্ষমতায় ছিল পিজেডি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সাদেদ্দিন আল-ওসমানি ওই বছরের ডিসেম্বরে মরক্কো-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যৌথ ঘোষণায় স্বাক্ষর করেন।
পরে দলটি ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের বিরোধিতা করে আসছে। ১৬ সেপ্টেম্বর নতুন করে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের ঘোষণা আসার পরও পিজেডির সাধারণ সম্পাদকমণ্ডলী ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক ও চুক্তির বিরোধিতা পুনর্ব্যক্ত করে।
নির্বাচনের পর দলটির জাতীয় কাউন্সিল সর্বসম্মতভাবে পরবর্তী সরকারে অংশ না নিয়ে পার্লামেন্টে বিরোধী দলে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে পিজেডি পার্লামেন্টে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ পেলেও সরকার পরিচালনায় তাদের সরাসরি ভূমিকা থাকবে না।
রাজপথের আন্দোলন কতটা প্রভাব ফেলবে?
সেপ্টেম্বরের বিক্ষোভগুলো দেখিয়েছে, ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের বিরোধী সংগঠনগুলো মরক্কোর বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষকে সংগঠিত করার সক্ষমতা ধরে রেখেছে। তবে এসব বিক্ষোভ সরাসরি সরকারি নীতিতে পরিবর্তন আনবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
গবেষক বেরাদার ভাষায়, সরকারি নীতি ও জনমতের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত হলেও এ বিষয়ে সাধারণ মরক্কানদের সমর্থন বা বিরোধিতার মাত্রা নির্ধারণের মতো নির্ভরযোগ্য তথ্য সীমিত।
অন্যদিকে, পশ্চিম সাহারার বিষয়টিও এই সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ অক্টোবরে পশ্চিম সাহারায় জাতিসংঘের মিশন মিনুরসোর (MINURSO) ম্যান্ডেট নিয়ে আলোচনা করার কথা রয়েছে। এর বর্তমান ম্যান্ডেট ২০২৬ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত রয়েছে।
ফলে ফিলিস্তিন ইস্যুতে মরক্কোর জনগণের একটি বড় অংশ রাজপথে নেমে ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধির বিরোধিতা করলেও, সরকার পশ্চিম সাহারা নীতি এবং মার্কিন সমর্থনের মতো কৌশলগত বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে ইসরাইলের সাথে প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক আরও গভীর করে চলেছে।
সূত্র: আলজাজিরার
এমএমআর