জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী আসনের নির্বাচনে বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়েছে জার্মানি। জার্মানিকে হারিয়ে ২০২৭ ও ২০২৮ মেয়াদের জন্য নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হয়েছে পর্তুগাল ও অস্ট্রিয়া। এর মধ্য দিয়ে গত ৪০ বছর ধরে প্রতি আট বছর পর পর নিরাপত্তা পরিষদের আসন পাওয়ার যে ধারাবাহিকতা জার্মানির ছিল, তার অবসান ঘটল।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনের ফল প্রকাশ পাওয়ার পর জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ওয়াডেফুল অত্যন্ত গম্ভীর মুখে তা গ্রহণ করেন। কেন্দ্রে ডানপন্থি ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটস/ক্রিশ্চিয়ান সোশ্যাল ইউনিয়ন (সিডিইউ/সিএসইউ) এবং কেন্দ্র-বামে থাকা সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির জোট সরকারের এক বছরের মেয়াদে এটিই সবচেয়ে বড় বৈদেশিক নীতি বা পররাষ্ট্রনৈতিক পরাজয়।
পরাজয়ের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াডেফুল পদত্যাগের কথা ভাবলেও পরে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে বলেন, ‘নিজেকে দোষ দেওয়ার কিছু নেই।’
তবে এই ফলাফলকে একটি ‘প্রকৃত হতাশা’ উল্লেখ করে এর কারণ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
উন্নয়ন সহায়তা হ্রাস এবং ভোটের সমীকরণ
যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও জাপানের পর জার্মানি জাতিসংঘের বাজেটে সবচেয়ে বড় অবদানকারী দেশ। তা সত্ত্বেও গ্লোবাল সাউথ বা অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ভোট পেতে ব্যর্থ হয়েছে বার্লিন।
বিরোধীদের দাবি, জার্মানি কর্তৃক উন্নয়ন সহায়তা বা এইড বাজেট হ্রাস করার কারণেই এই পরাজয় এসেছে।
আফ্রিকা বিষয়ক বিনিয়োগ সংস্থা ‘ওয়ান’-এর জার্মানি শাখার পরিচালক লিসা ডিটলম্যান বলেন, ‘যারা পর পর পাঁচবার উন্নয়ন সহায়তায় ব্যাপক কাটছাঁট করে, আন্তর্জাতিক মঞ্চে সমর্থন না পেয়ে তাদের অবাক হওয়া উচিত নয়।’
পাশাপাশি, অস্ট্রিয়া ও পর্তুগাল ১০ বছর আগে থেকেই এই আসনের জন্য জোরালো প্রচারণা চালাচ্ছিল এবং জাতিসংঘের সদর দপ্তরে তাদের সরব সরকারি উপস্থিতি ছিল।
অন্যদিকে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মার্জ গত বছর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে নিজে অংশ না নিয়ে ওয়াডেফুলকে পাঠিয়েছিলেন, যা প্রচারণায় দুর্বলতার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
আন্তর্জাতিক আইন ও দ্বিমুখী নীতির সমালোচনা
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, আন্তর্জাতিক আইনের বিষয়ে জার্মানির অবস্থান স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে চলতি বছরের জানুয়ারির শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভেনিজুয়েলার সাবেক নেতা নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করার ঘটনাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দিতে চ্যান্সেলর মার্জ ব্যর্থ হয়েছেন, যা তিনি করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে অসন্তুষ্ট না করার উদ্দেশ্যে।
জোট সরকারের অংশীদার সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আদিস আহমেতোভিচ বার্লিনে বলেন, ‘যারা নিয়ম-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অভিভাবক বলে দাবি করে, তারা আন্তর্জাতিক আইনের ক্ষেত্রে দ্বিমুখী নীতি বা ডাবল স্ট্যান্ডার্ড প্রয়োগ করতে পারে না। এতে গ্রহণযোগ্যতা সংকটে পড়ে।’
এছাড়া সমাজতান্ত্রিক বিরোধী দল ‘লেফট পার্টি’র কো-চেয়ারম্যান জান ভ্যান অ্যাকেনও আন্তর্জাতিক আইনকে ক্ষুণ্ণ করার কারণে এই ফল হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন।
ইসরাইল ও রাশিয়া ইস্যু
আন্তর্জাতিক আইনের প্রসঙ্গে ইসরাইলের সাথে জার্মানির সম্পর্ককে একটি বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। গাজায় হামলার পর লেবাননে আক্রমণ এবং ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরাইলি যুদ্ধের কারণে জার্মানি ইসরাইলের সমালোচনা করলেও, ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার কারণে দেশটির ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপের তীব্র বিরোধিতা করে আসছে।
সরকারি সূত্রগুলো জানিয়েছে, জার্মানি গোপনে অনেক দেশের কাছ থেকেই দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার মতো প্রতিশ্রুতির আশ্বাস পেয়েছিল। কিন্তু গোপন ব্যালটে অনেক দেশ তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রাখেনি। এছাড়া জার্মানি ইউক্রেনের বড় সমর্থক হওয়ায় রাশিয়াও পর্দার আড়াল থেকে জার্মানির এই আসন প্রাপ্তি ঠেকাতে প্রভাব বিস্তার করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ৫টি স্থায়ী সদস্য দেশের বাইরে নিরাপত্তা পরিষদে ১০টি অস্থায়ী আসন রয়েছে, যা প্রতি দুই বছর পর পর আবর্তিত হয়। ১৯৮৭ সালের পর থেকে জার্মানি নিয়মিতভাবে প্রতি আট বছর পর পর এই সংস্থায় নির্বাচিত হয়ে আসছিল, যা এবার থমকে গেল।
সূত্র: ডয়েচে ভেলে
এএম