জাতিসংঘের ১০ম মহাসচিব নির্বাচনের প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। আগামী ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে শুরু হওয়া পাঁচ বছর মেয়াদের জন্য নতুন মহাসচিব দায়িত্ব নেবেন। বিদায়ী মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের উত্তরসূরি হতে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চল থেকে আটজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন।
শুক্রবার অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় অনানুষ্ঠানিক মতামত যাচাইয়ে গায়ানার ক্যারোলিন রদ্রিগেস-বিরকেট সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন বলে নির্বাচনি প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। এখন পর্যন্ত আলোচনায় থাকা প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন কূটনীতিক, সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান, অর্থনীতিবিদ ও জাতিসংঘের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তারা।
রাফায়েল গ্রোসি
আর্জেন্টিনার ৬৫ বছর বয়সী কূটনীতিক রাফায়েল গ্রোসি গত ছয় বছর ধরে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং ইউক্রেন যুদ্ধসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংকটে তার কূটনৈতিক তৎপরতা ব্যাপক আলোচনায় এসেছে।
২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর চুক্তিটির কিছু অংশ টিকিয়ে রাখতে আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। তবে সমালোচকদের অভিযোগ, ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে গিয়ে তিনি কখনো কখনো অতিরিক্ত ছাড় দিয়েছেন।
আট সন্তানের বাবা ও বহুভাষী গ্রোসি রাশিয়ার দখলে থাকা ইউক্রেনের জাপোরিঝঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার একটি ছোট দল মোতায়েন করতে সক্ষম হওয়াকে তার বড় সাফল্যগুলোর একটি হিসেবে দেখা হয়। নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে সম্পর্ক বজায় রাখার কারণে তাকে শক্তিশালী প্রার্থী মনে করছেন অনেক কূটনীতিক। তবে তার প্রার্থিতা নিয়ে রাশিয়ার আপত্তি রয়েছে।
রেবেকা গ্রিনস্প্যান
কোস্টারিকার ৭০ বছর বয়সী রেবেকা গ্রিনস্প্যান নিজেকে সংস্কারপন্থী বহুপক্ষীয় সহযোগিতার সমর্থক হিসেবে তুলে ধরেছেন। বর্তমানে তিনি জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থার প্রধানের দায়িত্বে রয়েছেন।
কোস্টারিকার সাবেক এই ভাইস প্রেসিডেন্ট এর আগে দেশটির রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রচারণার সময় স্বার্থের সংঘাত এড়াতে তিনি সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
নির্বাচিত হলে তিনি জাতিসংঘের প্রথম নারী মহাসচিব হবেন। একজন অর্থনীতিবিদ গ্রিনস্প্যান মনে করেন, সহযোগিতার মাধ্যমে জাতিসংঘকে আরো কার্যকর ও গতিশীল করে তোলা সম্ভব, তবে একই সঙ্গে সংস্থাটির মূল মূল্যবোধও রক্ষা করতে হবে।
মিশেল ব্যাচেলেট
চিলির সাবেক দুই মেয়াদের প্রেসিডেন্ট মিশেল ব্যাচেলেটের বয়স ৭৪ বছর। তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের নারী অধিকারবিষয়ক সংস্থা ‘ইউএন উইমেন’-এর নির্বাহী পরিচালক ছিলেন।
ব্রাজিল ও মেক্সিকোর সমর্থন পেলেও গত মার্চে চিলির রাজনৈতিক নেতৃত্বে ডানপন্থী পরিবর্তনের পর দেশটি তার প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়। গর্ভপাতের অধিকারের পক্ষে অবস্থানের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল মহলের সমালোচনার মুখেও পড়েছেন তিনি।
এ ছাড়া উইঘুর মুসলিমদের বিরুদ্ধে চীনের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে উল্লেখ না করার অভিযোগে মানবাধিকারবিষয়ক দায়িত্ব পালনের সময়ও সমালোচিত হন ব্যাচেলেট। তার প্রার্থিতা নিয়ে বেইজিং এখনো প্রকাশ্যে কোনো অবস্থান জানায়নি।
ম্যাকি সাল
সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট ম্যাকি সাল ৬৪ বছর বয়সী একজন ভূতত্ত্ববিদ। ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা ১২ বছর তিনি সেনেগালের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তার নির্বাচনি ভাবনায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণের বোঝা কমানো এবং বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থায় তাদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য স্থায়ী সদস্যপদের সুযোগ তৈরির পক্ষেও তিনি।
বুরুন্ডি তাকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছে। নির্বাচিত হলে মিসরের বুত্রোস বুত্রোস-ঘালি ও ঘানার কফি আনানের পর তিনি হবেন আফ্রিকা থেকে আসা তৃতীয় জাতিসংঘ মহাসচিব।
মারিয়া ফার্নান্দা এস্পিনোসা
ইকুয়েডরের ৬১ বছর বয়সী মারিয়া ফার্নান্দা এস্পিনোসা দেশটির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী। অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডা তার প্রার্থিতা মনোনয়ন দিয়েছে।
জীববৈচিত্র্য, জলবায়ু পরিবর্তন ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নীতিবিষয়ক নানা ইস্যুতে জাতিসংঘ ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। জাতিসংঘে ইকুয়েডরের রাষ্ট্রদূত এবং পরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তাকে সংস্থাটির অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম সম্পর্কে গভীর ধারণা দিয়েছে।
তার মতে, জাতিসংঘকে অগ্রাধিকার নির্ধারণে সাহসী, কাজ বাস্তবায়নে শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও আত্মবিশ্বাসী হতে হবে।
ক্যারোলিন রদ্রিগেস-বিরকেট
গায়ানার ক্যারোলিন অ্যালিসন ফারিদা রদ্রিগেস-বিরকেট একজন অভিজ্ঞ কূটনীতিক ও সাবেক রাজনীতিক। ২০২০ সাল থেকে তিনি জাতিসংঘে গায়ানার স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এর আগে তিনি গায়ানার প্রথম নারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং দেশটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ পদে দায়িত্ব পালন করা আদিবাসী ব্যক্তি ছিলেন। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থাতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন।
নির্বাচিত হলে তিনি হবেন জাতিসংঘের প্রথম নারী এবং প্রথম ক্যারিবীয় অঞ্চলের নাগরিক মহাসচিব। সংঘাত প্রতিরোধ জোরদার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে জাতিসংঘকে আরো কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। সর্বশেষ অনানুষ্ঠানিক মতামত যাচাইয়ে তিনি অল্প ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
ওলারা ওতুনু
উগান্ডার মনোনীত প্রার্থী ওলারা ওতুনু একজন কূটনীতিক এবং জাতিসংঘের সাবেক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল। ৭৫ বছর বয়সী ওতুনু বর্তমানে প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বয়স্ক।
জাতিসংঘের নৈতিক কর্তৃত্ব পুনরুদ্ধারের ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। তার পরিকল্পনায় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার অব্যাহত রাখা এবং বিশ্বের বড় বড় সংঘাত নিরসনে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টি অগ্রাধিকার পেয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক জাতিসংঘের কার্যক্রম তদারকির জন্য একটি পৃথক সংস্থা গঠনের কথাও বলেছেন ওতুনু। পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়ন ব্যাহত না করে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
ইভোন বাকী
সর্বশেষ প্রার্থী হিসেবে আগস্টে টোঙ্গার মনোনয়নে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যোগ দিয়েছেন ইকুয়েডরের কূটনীতিক ইভোন বাকী। লেবানিজ অভিবাসী পরিবারের সন্তান ৭৫ বছর বয়সী বাকী লেবাননের ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সালের গৃহযুদ্ধের সময় সেখানে বসবাস করেছেন।
তার নির্বাচনি প্রচারণার মূল বিষয়গুলোর একটি হলো সংঘাত প্রতিরোধ। তিনি বলেছেন, শুধু নিউইয়র্কের কার্যালয়ে বসে নয়, যুদ্ধক্ষেত্র ও উত্তেজনাপূর্ণ এলাকাতেও সরাসরি গিয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আগেই তা থামানোর চেষ্টা করবেন।
এর আগে ইকুয়েডরের একটি রেডিওকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বাকী দাবি করেছিলেন, তার প্রার্থিতায় যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন রয়েছে। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সঙ্গে ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের কথাও প্রকাশ্যে উল্লেখ করেছেন। তবে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
নতুন মহাসচিব নির্বাচনের ক্ষেত্রে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের সমর্থন পাওয়ার পাশাপাশি সাধারণ পরিষদের অনুমোদনও প্রয়োজন হবে। ফলে অভিজ্ঞতা, কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং বিশ্বশক্তিগুলোর সমর্থন—সবকিছু মিলিয়ে এবারের নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সূত্র: আরব নিউজ
এআরবি