পরস্পরের ভূখণ্ড নিয়ে যুদ্ধ বা বিরোধের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে বিভিন্ন জাতি ও সাম্রাজ্যের মধ্যে। তবে ১৯৬৩ সালের মার্চ মাসে একটি বিরল ঘটনা ঘটায় পাকিস্তান। তারা হংকংয়ের চেয়ে পাঁচ গুণ বড় একটি ভূখণ্ড অন্য একটি দেশকে উপহার হিসেবে ছেড়ে দেয়, যা ছিল চীন।
বেইজিংয়ের সঙ্গে একটি সীমান্ত চুক্তির অধীনে পাকিস্তান কারাকোরাম পর্বতমালার শাক্সগাম উপত্যকার প্রায় ৫ হাজার ১৮০ বর্গকিলোমিটার (২ হাজার বর্গমাইল) এলাকার নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে হস্তান্তর করে। এই অঞ্চলটিকে ভারত বিতর্কিত কাশ্মীরের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। পাকিস্তানের এই পদক্ষেপের পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট কৌশলগত যুক্তি ছিল। অঞ্চলটির ওপর পাকিস্তানের অবিসংবাদিত সার্বভৌমত্ব ছিল না এবং এই বিরোধ আজও অমীমাংসিত রয়েছে। কিন্তু এই চুক্তির মাত্র তিন মাস আগে, ১৯৬২ সালের সীমান্ত যুদ্ধে চীন ভারতকে পরাজিত করেছিল। পাকিস্তানের নেতৃত্ব তখন সিদ্ধান্ত নেয়, ভারতের দাবি প্রতিহত করার চেয়ে বিতর্কিত পাহাড়ি অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে থাকা বেশি যুক্তিযুক্ত।
২১ মে পাকিস্তান ও চীন তাদের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭৫ বছর উদযাপন করছে। ছয় দশকেরও বেশি সময় আগের সেই সীমান্ত চুক্তিটিই মূলত এই দুই অসম অংশীদারের মধ্যকার বিরল বিশ্বাসের প্রাথমিক ইঙ্গিত দেয়, যার মূল ভিত্তি ছিল ভারতের সঙ্গে উভয়ের যৌথ শত্রুতা। একদিকে সমাজতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র চীন এবং অন্যদিকে ধর্মের ভিত্তিতে গঠিত রাষ্ট্র পাকিস্তান এই দুই দেশের সম্পর্ককে টিকিয়ে রেখেছে কৌশলগত ও কাঠামোগত উপযোগিতা।
সম্পর্কের এই ৭৫ বছর উপলক্ষে পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার দেশটির সিনেটে সফররত একটি চীনা সংসদীয় প্রতিনিধিদলের উপস্থিতিতে দুই দেশের ‘একীভূত দৃষ্টিভঙ্গি’ এবং সম্পর্কের গভীরতার কথা তুলে ধরেন। পরবর্তীতে সিনেটে সর্বসম্মতিক্রমে ‘চীন-পাকিস্তান বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্বের পুনর্ব্যক্তকরণ’ শীর্ষক একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। এই উদযাপনের অংশ হিসেবে আগামী ২৩ মে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জ্যেষ্ঠ সরকারি ও সামরিক কর্মকর্তাদের নিয়ে চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে বেইজিং যাবেন।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই সম্পর্কের মূল ভিত্তি পারস্পরিক আদর্শিক মিল নয়, বরং কৌশলগত প্রয়োজনীয়তা। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক মারিয়া অ্যাডেল ক্যারাই আল জাজিরাকে বলেন, ‘৭৫ বছরের এই ইতিহাস আসলে পরিবর্তিত পরিস্থিতির মধ্যে বারবার একে অপরের উপযোগিতা খুঁজে পাওয়ার গল্প।’
১৯৫০ সালের জানুয়ারি মাসে প্রথম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে পাকিস্তান বেইজিংয়ের কমিউনিস্ট সরকারকে স্বীকৃতি দেয়, যা ছিল মূলত ভারত প্রতিহত করার একটি কৌশল। পরবর্তীতে স্নায়ুযুদ্ধের সময় পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সিয়াটো ও সেন্টো জোটে যোগ দিলেও বেইজিংয়ের সঙ্গে গোপনে সম্পর্ক বজায় রাখে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের মধ্যস্থতাতেই মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার গোপনে বেইজিং সফর করেন, যা যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের এক ঐতিহাসিক মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
পারমাণবিক সহযোগিতা ও সামরিক মাত্রা
উভয় দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার করলেও, পাকিস্তানের পারমাণবিক কর্মসূচি গড়ে তোলার পেছনে চীনের বড় অবদান রয়েছে। ১৯৭৪ সালে ভারতের পারমাণবিক পরীক্ষার পর পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো যেকোনো মূল্যে পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের ঘোষণা দেন। ১৯৭৬ সালে দুই দেশ একটি দ্বিপক্ষীয় পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি সই করে।
বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৮০-র দশকে চীন পাকিস্তানকে অস্ত্র নকশার তথ্য এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরবরাহ করেছিল। ১৯৯৮ সালের মে মাসে পাকিস্তান যখন বালুচিস্তানের চাগাইতে পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়, তখন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে এর বিরুদ্ধে আনা বিবৃতিতে বাধা দেয় চীন।
বর্তমানে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী পুরোপুরি চীনা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের অস্ত্র আমদানির ৮০ শতাংশই আসে চীন থেকে। যৌথভাবে উৎপাদিত জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান থেকে শুরু করে ফ্রিগেট এবং এইচকিউ-৯ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখন পাকিস্তানের মূল শক্তি। ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার সামরিক সংঘাতের সময় চীনের তৈরি চেংদু জে-১০ যুদ্ধবিমান এবং পিএল-১৫ ক্ষেপণাস্ত্রের কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়, যা বেইজিং প্রকাশ্যে উদযাপন করেছিল।
সিপেক ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েন
২০১৫ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ইসলামাবাদ সফরে এসে ৬২ বিলিয়ন ডলারের চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি) প্রকল্পের ঘোষণা দেন, যা পাকিস্তানের গোয়াদর বন্দরকে চীনের জিনজিয়াং অঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। এই প্রকল্প পাকিস্তানের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ালেও দেশটির অর্থনৈতিক সংকট বা বৃত্তাকার ঋণ সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। উপরন্তু, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এই প্রকল্পের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২১ সালের পর থেকে পাকিস্তানে হামলায় অন্তত ২০ জন চীনা নাগরিক নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে গোয়াদরসহ বালুচিস্তানে বেলুচ লিবারেশন আর্মির সমন্বিত হামলা অন্যতম।
অর্থনৈতিকভাবে পাকিস্তানের ওপর চীনের ঋণের বোঝা বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, চীন বর্তমানে পাকিস্তানের বৃহত্তম দ্বিপক্ষীয় পাওনাদার, যার ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলার, যা পাকিস্তানের মোট বহিঃস্থ ঋণের ২২ শতাংশ। দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতিও প্রকট। ২০২৫ সালে পাকিস্তানে চীনের রপ্তানি ২০.২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও চীনে পাকিস্তানের রপ্তানি কমে মাত্র ২.৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। ঋণ পরিশোধের জন্য পাকিস্তান ক্রমাগত চীনের ওপর নির্ভর করছে, যার অংশ হিসেবে ২০২৫ সালের মার্চ ও জুনে যথাক্রমে ২ বিলিয়ন ও ৩.৪ বিলিয়ন ডলারের ঋণ মেয়াদ বৃদ্ধি করেছে বেইজিং।
২০২৬ সালের ১৪ মে পাকিস্তান চীনের অভ্যন্তরীণ পুঁজিবাজারে ২৫০ মিলিয়ন ডলার সমমূল্যের প্রথম তিন বছর মেয়াদি ‘পান্ডা বন্ড’ ইস্যু করেছে। বেইজিং ভিত্তিক গ্র্যান্ডভিউ ইনস্টিটিউটের পরিচালক জৌ রং বলেন, ‘বেইজিংয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে এই সম্পর্ক বিশাল কৌশলগত মূল্য এনে দিয়েছে। এটি সামরিক দিক থেকে সফল হলেও অর্থনৈতিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ। তবে ভারতের বিরুদ্ধে ভূ-রাজনৈতিক উপযোগিতার কারণে বেইজিং কখনোই পাকিস্তানকে ভেঙে পড়তে দেবে না।’
সূত্র: আল-জাজিরা
এএম