দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়ার পরিসর ‘উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার’ ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতে দক্ষিণ কোরিয়া অংশ না নেওয়ায় ট্রাম্প অসন্তুষ্ট হয়েছেন বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প এ ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উনের সঙ্গে তার ‘খুব ভালো সম্পর্কের’ কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
ট্রাম্প বলেন, সম্প্রতি ইরানের ‘পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ’ প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগ দিতে দক্ষিণ কোরিয়া রাজি হয়নি।
তিনি লেখেন, যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়া শুধু ব্যয়বহুলই নয়, এর বড় অংশের খরচও ‘বরাবরের মতো’ যুক্তরাষ্ট্রকে বহন করতে হয়। একই সঙ্গে এসব মহড়া ‘পুরোপুরি অনুচিত ও বৈরী একটি বার্তা’ দেয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে ট্রাম্পের ঘোষণার পর দক্ষিণ কোরিয়া জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের যৌথ সামরিক মহড়া নির্ধারিত সূচি অনুযায়ীই চলবে। উত্তর কোরিয়ার রাজধানী পিয়ংইয়ং এ বিষয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করেনি।
সোমবার থেকেই মহড়া শুরু
ট্রাম্প বলেন, মহড়া বাতিল করার জন্য এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। কারণ, সোমবার থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার বার্ষিক যৌথ সামরিক মহড়া শুরু হওয়ার কথা।
তিনি আরো বলেন, সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টকে তিনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ইরানের পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ মিশনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়া যোগ দিতে চায় কি না। জবাবে দক্ষিণ কোরিয়া তাকে ‘না, ধন্যবাদ’ বলেছে বলে দাবি করেন ট্রাম্প।
ট্রাম্পের এই ঘোষণার ২৪ ঘণ্টারও কম সময় আগে তিনি কিম জং-উনের সঙ্গে ২০১৮ সালে তোলা নিজের একটি পুরোনো ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেন। ছবিটি সম্পর্কে ট্রাম্প লেখেন, তাদের দেখতে বন্ধুত্বপূর্ণ মনে না হলেও বাস্তবে তারা দু’জন ‘খুব ভালো বন্ধু’।
১১ দিনের মহড়ায় ১৮ হাজার দক্ষিণ কোরীয় সেনা
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক কর্মকর্তারা ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ নামে যৌথ সামরিক মহড়ার ঘোষণা দেন। তারা জানান, ১১ দিনের এই মহড়া আগের বছরগুলোর মতোই হবে। এতে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রায় ১৮ হাজার সেনাসদস্য অংশ নেবেন।
সংবাদ সম্মেলনে সামরিক কর্মকর্তারা রাশিয়ার হয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার সেনাদের অংশ নেওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেন।
যুদ্ধ শেষে উত্তর কোরিয়ার সেনাদের দেশে ফিরে আসার প্রসঙ্গে মার্কিন সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র রায়ান ডোনাল্ড বলেন, তাদের সামরিক প্রশিক্ষণে ওই হুমকির বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রায় ২৮ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে।
শুক্রবার উত্তর কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়ার নিন্দা জানায়। তারা এ মহড়াকে ‘আগ্রাসী যুদ্ধের প্রস্তুতি’ বলে অভিহিত করে।
মহড়া শুরুর কয়েক দিন আগে অল্প সময়ের ব্যবধানে উত্তর কোরিয়ার দ্বিতীয় ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার বিষয়টি দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের নজরদারিতে ধরা পড়ে।
কিমের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্কের প্রসঙ্গ
২০১৯ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে কিম জং-উনের সঙ্গে তার কূটনৈতিক আলোচনা ব্যর্থ হয়। এরপর থেকেই উত্তর কোরিয়া তার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি আরো জোরদার করেছে।
এর সাত বছর আগে, ২০১৮ সালে উত্তর কোরিয়া সফর করেছিলেন ট্রাম্প। ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় উত্তর কোরিয়ায় যাওয়া প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট ছিলেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দক্ষিণ কোরিয়াকে নিয়ে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কড়া মন্তব্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতে সিউল সরাসরি সামরিক বা অন্য কোনো সহায়তা দিতে রাজি না হওয়ায় তিনি অসন্তুষ্ট।
এর আগে জাপান, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যসহ অন্যান্য মিত্র দেশ ওই সংঘাতে জড়াতে না চাওয়ায়ও ট্রাম্প অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন।
আগেও মহড়া কমিয়েছিলেন ট্রাম্প
দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়ার পরিসর কমানোর সিদ্ধান্ত ট্রাম্প এবারই প্রথম নেননি।
২০১৮ সালে কিম জং-উনের সঙ্গে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে আলোচনার সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়া পুরোপুরি স্থগিত করেছিলেন।
এরপর কোভিড-১৯ মহামারির সময় ২০২০ সালেও মহড়ার পরিসর কমানো হয়।
এদিকে গত সপ্তাহে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধের অবসান ঘটানোর বিষয়ে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন।
১৯৫৩ সালে অস্ত্রবিরতি চুক্তির মাধ্যমে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার যুদ্ধ থেমেছিল। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ শেষ করার কোনো শান্তিচুক্তি হয়নি।
ফলে আইনের দিক থেকে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া এখনো যুদ্ধরত অবস্থায় রয়েছে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
এএম