ইরানের সঙ্গে যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের সম্পর্কের উল্লেখযোগ্য অবনতি ঘটেছে। ওয়াশিংটনের যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্তে রিয়াদ ক্ষুব্ধ হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরব থেকে মার্কিন সেনা কমিয়ে আনার বিষয়টি বিবেচনা করছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের একটি গোয়েন্দা সূত্র টাইমস অব ইসরাইলকে জানিয়েছে, ইরান যুদ্ধের কারণে দুই দেশের সম্পর্ক আগের তুলনায় অনেক বেশি শীতল হয়ে পড়েছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালও বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে একই ধরনের তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে আটকে পড়া জাহাজগুলো নিরাপদে বের করে এনে ইরানের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে একটি সামরিক অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করেছিল। এ অভিযানে সৌদি আরবের সামরিক ঘাঁটি ও আকাশসীমা ব্যবহারের প্রয়োজন ছিল। তবে সৌদি সরকার এতে অনুমতি না দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র পরিকল্পনাটি বাতিল করতে বাধ্য হয়।
সে সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতি হওয়ায় দুই দিনেরও কম সময়ের মধ্যে তিনি ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেন।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, সৌদি আরবের এ সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে হোয়াইট হাউস রিয়াদের কাছে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ইন্টারসেপ্টর সরবরাহ স্থগিত রাখার হুমকি দেয়। সৌদি আরব এসব ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভূপাতিত করছিল।
মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র এখন সৌদি আরবে তাদের সামরিক উপস্থিতি কমিয়ে আনার বিষয়টি বিবেচনা করছে।
গত সপ্তাহে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও উপসাগরীয় অঞ্চল সফরে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও বাহরাইন গেলেও সৌদি আরব সফর করেননি। রিয়াদ এটিকে কূটনৈতিক অবজ্ঞা হিসেবে দেখেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এর এক সপ্তাহ আগে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেন। ওই সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প উপস্থিত ছিলেন। বিষয়টি ইরান যুদ্ধ পরিচালনায় ওয়াশিংটনের ভূমিকার প্রতি সৌদি অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
প্রতিবেদন বলছে, যুদ্ধ শুরুর আগে সৌদি আরব ট্রাম্প প্রশাসনকে সামরিক অভিযান থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছিল। রিয়াদের আশঙ্কা ছিল, ইরানের সরকার উৎখাতের চেষ্টা সফল না হলে তেহরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে, যা পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করবে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ শুরু করলে সৌদি নেতৃত্বের মধ্যে এ ধারণা তৈরি হয় যে, ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার পরও মার্কিন নীতিনির্ধারণে তাদের প্রভাব খুবই সীমিত।
যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমে অনীহা থাকলেও সৌদি আরবসহ কয়েকটি উপসাগরীয় দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে দেয়। কারণ, ইরানের পাল্টা হামলার বড় চাপ তাদেরই মোকাবিলা করতে হচ্ছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরবও ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাগুলোতে কয়েকটি হামলা চালায়। এর জবাবে ইরান সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনাসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালায়। এরপর যুদ্ধের উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেয় রিয়াদ।
বিশেষ করে ইরানের বিরুদ্ধে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ধারাবাহিক হামলা নিয়ে সৌদি আরব উদ্বেগ প্রকাশ করে। তাদের আশঙ্কা ছিল, এতে আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামো আরও বেশি ঝুঁকির মুখে পড়বে। রিয়াদ চেয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র যেন আমিরাতকে হামলা বন্ধ করে কূটনৈতিক উদ্যোগে যোগ দিতে চাপ দেয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত এক বছরে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে যে টানাপড়েন তৈরি হয়েছে, ইরান ইস্যু তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। গত এপ্রিলে আমিরাত সৌদি নেতৃত্বাধীন ওপেক জোট থেকে সরে যায়।
যুদ্ধ চলার সময় সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বন্দর অবরোধ তুলে নেওয়ারও অনুরোধ জানায়। তবে সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এতে রাজি হননি।
পরে দুই পক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এতে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য একটি সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়। যদিও সাম্প্রতিক গোলাগুলির ঘটনায় ওই সমঝোতা নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার সহযোগীদের বলেছেন, এই সময়সীমা প্রয়োজনে পরিবর্তন করা যেতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সমঝোতা আলোচনায় ইসরাইলের কোনো ভূমিকা ছিল না। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও এ থেকে নিজেকে দূরে রেখেছেন। তবে সমঝোতার শর্তে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং তাদের মিত্রদের জন্য যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ রাখার বাধ্যবাধকতার কথা উল্লেখ রয়েছে।
এদিকে ইসরাইলের কর্মকর্তারা এই সমঝোতার বিরোধিতা করছেন। তাদের মতে, এতে যুদ্ধের মূল লক্ষ্য ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ করা এবং দেশটির বর্তমান শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের পরিবেশ তৈরি- কোনোটিই অর্জিত হয়নি।