আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান নীতি ক্রমেই বিশৃঙ্খল ও বিতর্কিত হয়ে উঠছে। হরমুজ প্রণালিতে দ্রুত জয়ের প্রত্যাশা ডুবে যাওয়ার পর তিনি তা ঢাকতে বিভ্রান্তিকর ও তাৎক্ষণিক গল্প তৈরি করছেন। ফলে এই সংঘাত এখন দীর্ঘায়িত ও জটিল রূপ নিচ্ছে, যা অনেক বিশ্লেষকের মতে ট্রাম্পের জন্য এই যুদ্ধ ‘ব্যক্তিগত ভিয়েতনাম’-এ পরিণত হতে হচ্ছে।
শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসন ধারণা করেছিল, ইরান সহজেই চাপের কাছে নতিস্বীকার করবে এবং একটি অনুগত নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সম্ভব হবে, যা অনেকটা ভেনেজুয়েলার মতো। একইসঙ্গে তারা বিশ্বাস করেছিল তেলের বাজারেও বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
যুদ্ধের উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশাসনের ভেতরে-বাইরে স্পষ্ট বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। ট্রাম্প একদিকে এটিকে ‘স্বল্পমেয়াদি অভিযান’ হিসেবে উল্লেখ করছেন, অন্যদিকে এটিকে যুদ্ধ হিসেবেও স্বীকার করছেন। তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইরানের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কাকে কারণ হিসেবে তুলে ধরলেও ট্রাম্প নিজেই তা অস্বীকার করেছেন। পেন্টাগনও জানিয়েছে, তাৎক্ষণিক হুমকির সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য ছিল না।
এছাড়া ট্রাম্পের বক্তব্যে বারবার অসংগতি দেখা যাচ্ছে। কখনো তিনি ‘শাসন পরিবর্তনের’ কথা বলছেন, কখনো আবার আলোচনা ও দ্রুত সমাপ্তির ইঙ্গিত দিচ্ছেন। তার এই দ্বৈত অবস্থান নীতিনির্ধারণে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
এই যুদ্ধে ট্রাম্পের অবস্থান ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়কার আমেরিকার মতোই। বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট, স্পষ্ট লক্ষ্যহীনতা, দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা ও মিত্রদের বিচ্ছিন্নতা। তার বোমাবর্ষণ প্রতিপক্ষকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে পারছে না। বরং এটি একটি মানবিক বিপর্যয় ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করছে।
সমালোচকদের মতে, এই পরিস্থিতি ভিয়েতনাম যুদ্ধের সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায়। সে সময়ের মতোই এখনো স্পষ্ট লক্ষ্য নেই, যুদ্ধের পরিণতি অনিশ্চিত এবং প্রশাসনের বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক বাড়ছে। ইরানের প্রতিরোধও প্রত্যাশার চেয়ে বেশি শক্তিশালী প্রমাণিত হয়েছে।
এদিকে আমেরিকার ভেতরেও রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। কংগ্রেসে যুদ্ধের কারণ, পরিকল্পনা ও পরিচালনা নিয়ে শুনানির দাবি উঠেছে। বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটরা প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে চাপ দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এই যুদ্ধ ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে। অর্থনৈতিক চাপ, আন্তর্জাতিক সমালোচনা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।