যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে কানাডার রাজনীতিকেরা—এমন অভিযোগ তুলেছে ওয়াশিংটন। আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচন সামনে রেখে কানাডার কর্মকর্তাদের বিভিন্ন বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডকে এ অভিযোগের ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেছে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস। তবে কানাডার কর্মকর্তারা নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকের উদ্দেশ্য কানাডার অর্থনীতিতে বিনিয়োগ আকর্ষণ করা।
বুধবার প্রকাশিত এক তথ্যপত্রে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস অভিযোগ করে, মার্কিন নির্বাচনে হস্তক্ষেপের বিষয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগকে গুরুত্ব দিচ্ছে না কানাডা।
তথ্যপত্রে বলা হয়, কানাডার মন্ত্রীরা ও প্রাদেশিক সরকারপ্রধানেরা সরকারি নথি ও প্রকাশ্য বক্তব্যে মার্কিন রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের পরিকল্পনার কথা বলছেন।
২০২৫ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকেই দেশ দুটির মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধ চলছে। ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপ করা শুল্কের জবাবে কানাডাও মার্কিন পণ্যে আমদানি শুল্ক আরোপ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস কানাডার পাল্টা শুল্ক আরোপের পক্ষে দেওয়া বিভিন্ন বক্তব্যকে আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
তথ্যপত্রে কানাডার শিল্পমন্ত্রী মেলানি জোলির বক্তব্য বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। গত আগস্টে ট্রাম্পের শুল্কের জবাবে কানাডার পদক্ষেপ নিয়ে কথা বলেছিলেন তিনি। ওই সময় জোলি বলেছিলেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রের এমন কিছু অঙ্গরাজ্যের পণ্যকেও লক্ষ্যবস্তু করছি, যেগুলোতে এর প্রভাব পড়বে। রাজনৈতিক চাপ তৈরির জন্য আমরা বিচক্ষণতার সঙ্গে কৌশলগতভাবে এগোচ্ছি।’
গত সেপ্টেম্বরে বোস্টন ও শিকাগোতে ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতাদের সঙ্গে জোলির বৈঠক নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস। ওই সময় এক সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন করেছিলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা জয়ী হলে শুল্কের বিষয়ে কী পরিবর্তন আসতে পারে বলে তিনি মনে করেন? জবাবে জোলি বলেছিলেন, ‘এ কারণেই আমি এত গভর্নর ও সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর সঙ্গে বৈঠক করছি।’
তবে নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ নাকচ করেছেন জোলি। তার বক্তব্য, কানাডা কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করবে না। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় দলের রাজনীতিকদের সঙ্গে তার বৈঠকের উদ্দেশ্য কানাডার অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা। গত ১৪ অক্টোবর সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘মূলত যুক্তরাষ্ট্রে আমি যা করেছি, তা হলো বিনিয়োগ আকর্ষণ করা।’
যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের তথ্যপত্রে অন্টারিও প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ডাগ ফোর্ডের কর্মকাণ্ডের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। মার্কিন পণ্যে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে বক্তব্য দেওয়ার পাশাপাশি ট্রাম্পের শুল্কনীতির বিরুদ্ধে বিজ্ঞাপন প্রচার চালিয়েছিল তার সরকার।
গত বছর শুরু হওয়া ওই প্রচারে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের ১৯৮৭ সালের একটি বেতার ভাষণের অংশ ব্যবহার করা হয়। ওই ভাষণে রিগ্যান শুল্কের সমালোচনা করেছিলেন। এই বিজ্ঞাপন প্রচারের জেরে ২০২৫ সালের অক্টোবরে কানাডার সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা বন্ধ করে দেন ট্রাম্প।
তবে কানাডার কর্মকর্তাদের বাণিজ্যনীতি প্রভাবিত করার চেষ্টার এসব উদাহরণ তুলে ধরলেও সেগুলো কীভাবে মার্কিন নির্বাচনে হস্তক্ষেপের শামিল, তা ব্যাখ্যা করেনি যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস।
তথ্যপত্রে কানাডার লিবারেল পার্টির সংসদ সদস্য অ্যান্থনি হাউসফাদারের একটি কর্মকাণ্ডের কথাও বলা হয়েছে। অভিযোগ করা হয়েছে, গত আগস্টে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রতিনিধি ডেবি ওয়াসারম্যান শুলৎজের দলীয় প্রাথমিক নির্বাচনের আগে তার পক্ষে ফ্লোরিডায় প্রচার চালিয়েছিলেন হাউজফাদার।
এ ছাড়া ২০১২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে অবৈধভাবে ভোট দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত বা দণ্ডিত ১১ জন কানাডীয় নাগরিকের নাম তথ্যপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব নাগরিকের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কানাডা সরকারের নির্বাচনে হস্তক্ষেপের কোনো উদ্যোগের যোগসূত্র তুলে ধরার মতো প্রমাণ দেওয়া হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘সব কানাডীয় নাগরিকের উচিত যেকোনোভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে অংশ নেওয়া বা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা থেকে বিরত থাকা। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন নির্ধারণ করবেন মার্কিনরাই।’
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে কানাডার কর্মকাণ্ডের ওপর ওয়াশিংটন নজর রাখছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিট হোকস্ট্রা জানানোর এক সপ্তাহ পর এ তথ্যপত্র প্রকাশ করা হলো। কানাডীয় সংবাদমাধ্যম দ্য কানাডিয়ান প্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘দ্য রিয়েলি বিগ শো’ পডকাস্টে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হোকস্ট্রা বলেছিলেন, ‘আমরা বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছি, মূল্যায়ন করছি। এর কোনো কিছু নির্বাচনে হস্তক্ষেপের পর্যায়ে পড়লে যুক্তরাষ্ট্র তার জবাব দেবে।’
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা দীর্ঘদিনের মিত্র হলেও ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় ফেরার পর দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন বেড়েছে। বাণিজ্যযুদ্ধ শুরুর পাশাপাশি কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য বানানোর হুমকিও একাধিকবার দিয়েছেন ট্রাম্প।
এদিকে চলতি সপ্তাহে আলবার্টা প্রদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোট আয়োজনের উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার আগে সেখানকার বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতারা ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে সমর্থন চেয়েছিলেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
সোমবারের প্রাদেশিক ভোটের আগে সম্ভাব্য মার্কিন হস্তক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। তিনি বলেছিলেন, কানাডা আশা করে, বিদেশি সরকারগুলো তাদের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করবে না।
গ্লোবাল নিউজকে কার্নি বলেন, ‘বিদেশি সরকারগুলোর ক্ষেত্রে আমাদের প্রত্যাশা একেবারে স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রসহ কোনো দেশের নির্বাচনে আমরা হস্তক্ষেপ করি না, তারাও আমাদের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করবে না।’
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে আলজাজিরা কানাডার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা, অন্টারিওর মুখ্যমন্ত্রী ডাগ ফোর্ডের কার্যালয় এবং শিল্পমন্ত্রী মেলানি জোলির সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তবে প্রতিবেদনটিতে তাঁদের কোনো জবাব উল্লেখ করা হয়নি।
এএম