ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা শান্তি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রাথমিকভাবে জাতিসংঘের সমর্থনপুষ্ট মার্কিন প্রেসিডেন্টের "নতুন আন্তর্জাতিক অন্তর্বর্তীকালীন সংস্থা" সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের সাথে সাথে এটি নিয়ে উদ্বেগ ও বিতর্ক তৈরি হচ্ছে।
এর নির্বাহী বোর্ডের সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন - সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার, যিনি ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণকে সমর্থন করেছিলেন। নির্বাহী সদস্য ইস্যু ছাড়াও বোর্ডে স্থায়ী সদস্যপদের জন্য ফি হিসাবে এক বিলিয়ন ডলার নির্ধারণ, জাতিসংঘের ভূমিকা সম্পর্কিত উদ্বেগ, ইত্যাদি ইস্যুতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এই প্রতিবেদনে সেসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে।
এই বোর্ডে যোগদানে কাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে?
জানা যাচ্ছে, ট্রাম্পের এই বোর্ডে যোগদানের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়ে ইতিমধ্যেই কয়েক ডজন বিশ্ব নেতাকে চিঠি পাঠানো হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছেন:
নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লুক্সনকেও বোর্ডে যোগদানের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এবং তিনি "যথাযথ বিবেচনা" করবেন বলে জানা যাচ্ছে।
থাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে যে তারা এর বিস্তারিত পর্যালোচনা করছে।
বোর্ডে যোগ দিতে কারা রাজি হয়েছেন?
যারা ইতিমধ্যেই প্রকাশ্যে এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন:
এছাড়া ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক টো লাম এই প্রস্তাব গ্রহণ করেছেন বলে জানা গেছে, অন্যদিকে; বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো বলেছেন যে তিনি "অংশগ্রহণ করতে প্রস্তুত"।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেও সদস্য হওয়ার জন্য অর্থ প্রদান করবেন না।
বোর্ডে যোগদানের জন্য কী কী প্রয়োজন?
একজন মার্কিন কর্মকর্তা সিবিএস নিউজকে জানিয়েছেন, বোর্ডে যোগদানের বাধ্যবাধকতা নেই - তবে যারা কেবল তিন বছরের সদস্যপদ থাকার পরিবর্তে স্থায়ী সদস্য হতে চান, তাদেরকে এক বিলিয়ন ডলার ফি দিতে হবে।
কর্মকর্তারা আরো জানান, এই অর্থ গাজার পুনর্গঠনে তহবিল যোগাতে সহায়তা করবে।
তবে রয়টার্স সংবাদ সংস্থার দেখা চিঠি ও খসড়া সনদের একটি অনুলিপি অনুসারে, এই বোর্ড, যেটিতে ট্রাম্প আজীবন সভাপতিত্ব করবেন, অন্যান্য সংঘাত মোকাবেলায় পরবর্তীতে আরো সম্প্রসারিত হবে।
ট্রাম্পের বোর্ড অব পিস কি জাতিসংঘকে দুর্বল করে দেবে?
চিঠিতে ট্রাম্প বলেছেন যে বোর্ড "বিশ্বব্যাপী সংঘাত সমাধানে একটি সাহসী নতুন পদ্ধতি গ্রহণ করবে"।
একে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে দুর্বল করে দেওয়ার শঙ্কা হিসাবে দেখা হচ্ছে, যা বর্তমানে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও শান্তিরক্ষার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত।
ইসরাইলি সংবাদপত্র হারেটজ জানিয়েছে যে, সনদটি "আরো দ্রুত ও কার্যকর আন্তর্জাতিক শান্তি-নির্মাণ সংস্থার" প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়ে করা হয়েছে, টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য "যেসব প্রতিষ্ঠান প্রায়শই ব্যর্থ হয়েছে, তাদের কাছ থেকে সরে যাওয়ার সাহস" প্রয়োজন।
বোর্ড সম্পর্কে বিবৃতিতে হোয়াইট হাউস বলেছে: "এই মাইলফলকটি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের রেজোলিউশন ২৮০৩ এর সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।"
কিন্তু ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র এএফপি সংবাদ সংস্থাকে বলেছেন যে এই সনদ "গাজার একমাত্র কাঠামোর বাইরে", তিনি আরো বলেন: "এটি বড় ধরনের প্রশ্ন উত্থাপন করে, বিশেষ করে জাতিসংঘের নীতি ও কাঠামোর প্রতি শ্রদ্ধা সম্পর্কে, যা কোনো অবস্থাতেই প্রশ্নবিদ্ধ করা যাবে না।"
এদিকে, কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপন্সিবল স্টেটক্রাফ্টের খালেদ এলগিন্ডি রয়টার্সকে বলেছেন: "প্রশাসনের পক্ষ থেকে এমন ধারণা আসছে যে তারা শান্তি বোর্ডের পরিধি আরো বিস্তৃত করতে এবং এমনকি বর্তমান জাতিসংঘ ব্যবস্থা প্রতিস্থাপনের কথাও বলতে চায়।
"সুতরাং এটা স্পষ্ট যে গাজা দিয়ে শুরু হতে পারে কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে এটি বোর্ডের শেষ নয়।"
ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যেই জাতিসংঘে মার্কিন তহবিল কমিয়ে দিচ্ছে। মার্কিন ভেটোর কারণে গাজা যুদ্ধ বন্ধে নিরাপত্তা পরিষদ পদক্ষেপ নিতে পারছে না।
এই বছরের ৭ই জানুয়ারি, ট্রাম্প একটি স্মারকলিপিতে স্বাক্ষর করেন যেখানে "মার্কিন জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করে" এমন ৩১টি জাতিসংঘ সত্তা থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করা হয়, যার মধ্যে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত জাতিসংঘের ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন এবং জাতিসংঘ ডেমোক্রেসি ফান্ড।
ট্রাম্পের বোর্ড কীভাবে চলবে?
বোর্ড অব পিসের পাশাপাশি, দুটি সহায়ক সিনিয়র বোর্ডও ঘোষণা করা হয়েছে:
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে যে এই বোর্ডগুলির জন্য নির্বাচিতরা "কার্যকর শাসন এবং গাজার জনগণের জন্য শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি অর্জনে সর্বোত্তম পরিষেবা প্রদান" নিশ্চিত করতে কাজ করবেন।
হোয়াইট হাউস অনুসারে, ট্রাম্প সাত সদস্যের শক্তিশালী "প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী বোর্ড"-এর সভাপতিত্ব করবেন যা গাজা পুনর্গঠনের পরবর্তী পর্যায়ে নেতৃত্ব দেবে। অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন:
এই বোর্ডে সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার টনি ব্লেয়ারও রয়েছেন, যার অন্তর্ভুক্তি বিতর্কিত কারণ ২০০৩ সালে তিনি ইরাকের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে বলে দাবি করে যুক্তরাজ্যকে ইরাক যুদ্ধে নিয়ে গিয়েছিলেন, যা পরে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছিল।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে যে প্রতিটি সদস্যের নিজস্ব পোর্টফোলিও থাকবে "গাজার স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ"।
বোর্ডে কি ফিলিস্তিনি ও ইসরাইলি প্রতিনিধিত্ব রয়েছে?
উভয় নির্বাহী বোর্ডে কোনো ফিলিস্তিনি নেই। গাজার নির্বাহী বোর্ডে একজন ইসরাইলি আছেন, রিয়েল এস্টেট বিলিয়নেয়ার ইয়াকির গাবে, যিনি ইসরাইলে জন্মগ্রহণ করেছেন কিন্তু এখন সাইপ্রাসে বসবাস করছেন। তবে এতে কাতার ও তুরস্কের মতো দেশের সিনিয়র রাজনীতিবিদরাও রয়েছেন যারা গাজা উপত্যকায় ইসরাইলের যুদ্ধ পরিচালনার সমালোচনা করেছেন।
ফিলিস্তিনিরা "অনেক বিস্তৃত প্রতিনিধিত্ব" আশা করেছিল, রাজনীতিবিদ মুস্তাফা বারঘৌতি বিবিসি নিউজ ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের উইকএন্ড প্রোগ্রামে বলেন।
"মনে হচ্ছে এটি কেবল একটি আমেরিকান বোর্ড, কিছু আন্তর্জাতিক উপাদান সহ," তিনি বলেন।
কায়রোতে শান্তি আলোচনায় অনুমোদিত ফিলিস্তিনি প্রশাসনিক গোষ্ঠীর ভূমিকা "স্পষ্ট না থাকা" "সমস্যাজনক" হবে বলে বারঘৌতি বলেন।
এবং গাজার পুনর্গঠনের সুবিধার্থে রাফাহ ক্রসিং খোলার ব্যাপারে ইসরাইলের ইচ্ছা নিয়ে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
এদিকে, ইসরাইল বলেছে যে নির্বাহী বোর্ড গঠনের আলোচনা থেকে তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে। এটি "ইসরাইলের সাথে সমন্বিত ছিল না এবং এটি তাদের নীতির পরিপন্থী", প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় বলছে।
ইসরাইলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার ল্যাপিড এই ঘোষণাকে "ইসরাইলের জন্য কূটনৈতিক ব্যর্থতা" বলে অভিহিত করেছেন। এবং এর অতি-ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী, ইতামার বেন-গভির,এক্স হ্যান্ডলে লিখেছেন: "গাজা উপত্যকার 'পুনর্বাসন' তত্ত্বাবধানের জন্য কোনো 'প্রশাসনিক কমিটির' প্রয়োজন নেই - এটি থেকে হামাস সন্ত্রাসীদের সরিয়ে দিয়ে পরিষ্কার করা দরকার।"
ট্রাম্পের বোর্ড অব পিস কি গাজার সমস্যা সমাধান করতে পারবে?
জাতিসংঘের হিসাব বলছে, গাজার প্রায় ৮০ শতাংশ ভবন ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ফলে ছয় কোটি টন ধ্বংসস্তূপ তৈরি হয়েছে। বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলি শীতকালীন আবহাওয়া, সীমিত আশ্রয় এবং খাদ্য সংকটের মুখোমুখি।
সাহায্যকারী গোষ্ঠীগুলি বলছে যে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে কিন্তু ইসরাইল তাদের কাজের উপর বিধিনিষেধ আরোপ করে চলেছে।
ইসরাইল বলেছে, তারা মানবিক সহায়তা প্রদান করছে এবং যেকোনো বিধিনিষেধ হামাসের অনুপ্রবেশ এবং ত্রাণ প্রচেষ্টার অপব্যবহার বন্ধ করার জন্যই প্রয়োগ করা হয়েছে। তারা গাজায় ইতিমধ্যেই সরবরাহ বিতরণে ব্যর্থতার জন্য জাতিসংঘকে দোষারোপ করছে।
এখন সম্ভবত সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা।
হামাস বলেছে যে তারা কেবল একটি বৃহত্তর চুক্তির অংশ হিসেবে নিরস্ত্রীকরণ করবে। এবং ইসরাইল, যার স্থল সেনারা এখনও গাজা উপত্যকার বেশিরভাগ অংশ নিয়ন্ত্রণ করে, বলেছে যে হামাস নিরস্ত্রীকরণ করলেই তারা সেনা প্রত্যাহার করবে।
ট্রাম্পের বোর্ড অব পিস কত দ্রুত পরিবর্তন আনতে পারে এবং গুরুত্বপূর্ণভাবে, স্থায়ী শান্তির দিকে কিছু দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে পারে সেটাই এখন দেখার বিষয়।
অতিরিক্ত তথ্য সংগ্রহ করেছেন বিবিসি নিউজ ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের স্যান পেক
সূত্র: বিবিসি বাংলা