গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা ও অন্যান্য প্রয়োজনের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ‘স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ’ পেয়েছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে এ বিষয়ে একটি চুক্তি হয়েছে বলে শুক্রবার ঘোষণা দেন তিনি। তবে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ পাঠ এখনো প্রকাশ করা হয়নি। ডেনমার্ক বলেছে, এতে গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন হবে না।
ডেনমার্কের ভাষ্য অনুযায়ী, আগামী সপ্তাহে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় চুক্তিটি সই হওয়ার কথা। এরপর এটি ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের পার্লামেন্টে অনুমোদন করতে হবে। গ্রিনল্যান্ড স্বায়ত্তশাসিত হলেও ডেনমার্কের রাজ্যের অংশ।
ট্রাম্পের ঘোষণা এসেছে এমন সময়ে, যখন এক বছরের বেশি সময় ধরে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের মধ্যে টানাপোড়েন চলছে। এর আগে ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকিও দিয়েছিলেন। এতে ন্যাটোর দুই সদস্য যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের সম্পর্কেও চাপ তৈরি হয়।
চুক্তির আনুষ্ঠানিক পাঠ প্রকাশ না হওয়ায় এর প্রকৃত পরিধি এখনো স্পষ্ট নয়। ট্রাম্পের দাবি, চুক্তির আওতায় গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা ও ‘অন্যান্য প্রয়োজনের’ ওপর যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ থাকবে। এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো অর্থ দিতে হবে না।
ট্রাম্প আরো বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ কোনো দেশ যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি ছাড়া গ্রিনল্যান্ডে সামরিক উপস্থিতি গড়তে বা ‘সংবেদনশীল বিনিয়োগ’ করতে পারবে না।
বিবিসির উদ্ধৃত মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তার ভাষ্য, ন্যাটোর বাইরের কোনো দেশ গ্রিনল্যান্ডে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করতে পারবে না। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে—এমন খাতেও তারা বিনিয়োগ করতে পারবে না।
এর অর্থ হলো, চীন ও রাশিয়া গ্রিনল্যান্ডে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন বা সেনা পাঠাতে পারবে না। পাশাপাশি সংবেদনশীল খাতে তাদের বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হবে। তবে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র আর কোন কোন দেশকে ‘প্রতিপক্ষ’ হিসেবে চিহ্নিত করবে, তা স্পষ্ট নয়।
ডেনমার্কের ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক মিকেল ওলেসেন মনে করেন, এ ক্ষেত্রে বড় ধরনের ছাড় দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট নয়।
তার মতে, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড কখনোই রাশিয়া বা চীনের সামরিক ঘাঁটি সেখানে চায়নি।
ট্রাম্প চুক্তিটিকে ‘ইনফিনিট লাইফ’ বা ‘অসীম মেয়াদের’ চুক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ এর কোনো শেষ নেই।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ওই কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রিনল্যান্ডে ডেনমার্ক বা গ্রিনল্যান্ডের অনুমোদন ছাড়াই আরো সামরিক স্থাপনা নির্মাণের অধিকারও যুক্তরাষ্ট্র পাবে। এমনকি ভবিষ্যতে গ্রিনল্যান্ড স্বাধীন হয়ে গেলেও চুক্তিটি কার্যকর থাকবে বলে দাবি করা হয়েছে।
গ্রিনল্যান্ডের বিপুল খনিজ সম্পদের বিষয়ে চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের খনির অধিকার নিয়ে নির্দিষ্ট কিছু বলা হয়নি। গ্রিনল্যান্ডে জিংক, লোহা, ইউরেনিয়াম ও গ্রাফাইটসহ গুরুত্বপূর্ণ খনিজের মজুত রয়েছে। এসব খনিজ মোবাইলফোন থেকে যুদ্ধবিমান পর্যন্ত শত শত প্রযুক্তিপণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
কিছু পর্যবেক্ষকের ধারণা, ট্রাম্পের উল্লেখ করা ‘সংবেদনশীল বিনিয়োগ’-এর মধ্যে এসব খাত থাকতে পারে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বজুড়ে বিরল খনিজে নিজেদের প্রবেশাধিকার বাড়াতে চাইছে। অন্যদিকে প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে শীর্ষস্থানীয় চীন বিশ্বে পরিচিত মজুতের প্রায় ৬০ শতাংশ বিরল খনিজের অধিকারী। দেশটি এসব খনিজের রপ্তানি সীমিত করছে।
শুক্রবার গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্ক উভয়েই চুক্তির বিষয়টি স্বীকার করেছে। তবে কেউই এর সুনির্দিষ্ট শর্ত প্রকাশ করেনি। গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ইয়েন্স-ফ্রেডেরিক নিলসেন বলেছেন, চুক্তিটি ‘গ্রিনল্যান্ডের স্বার্থকে স্বীকৃতি দেয়’ এবং ‘সবার জন্য কল্যাণকর’।
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন বলেছেন, চুক্তিটি ন্যাটো ও ইউরোপের জন্য ভালো।
তার মতে, এটি আর্কটিক ও উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলে যৌথ নিরাপত্তা জোরদার করবে।
তবে ওলেসেন সতর্ক করে বলেছেন, চুক্তির বিস্তারিত এখনো অস্পষ্ট। এ পর্যন্ত বেশির ভাগ তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এসেছে। তাই সেগুলো সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
তাহলে কি গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা যুক্তরাষ্ট্রের হাতে যাচ্ছে? এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, না। এটি ট্রাম্পের আগে বলা ‘মালিকানা’ নেওয়ার লক্ষ্য পূরণ করে না।
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী ফ্রেডেরিকসেন বলেছেন, চুক্তিতে ডেনমার্কের রাজ্যের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং গ্রিনল্যান্ডের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার স্বীকৃত হয়েছে।
ওলেসেনের মতে, চুক্তিটি ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের জন্য ইতিবাচক হতে পারে। কারণ এর মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের বিষয়ে ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের চাপ থেকে তৈরি সংকটের অবসানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে সার্বভৌমত্বও অক্ষুণ্ন থাকতে পারে।
গ্রিনল্যান্ডের ৫৬ হাজার মানুষের বড় অংশ এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে যাওয়ার বিরোধিতা করেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারির একটি জনমত জরিপে দেখা যায়, ৮৫ শতাংশ গ্রিনল্যান্ডবাসী যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হতে চান না।
গ্রিনল্যান্ডে অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অধিকার নতুন নয়। ১৯৫১ সালের একটি চুক্তির আওতায় দেশটির সেখানে বিমান চলাচল ও সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের ব্যাপক অধিকার রয়েছে। ঘাঁটি নির্মাণ ও সেনা রাখার পাশাপাশি জাহাজ, বিমান ও জলযানের অবতরণ, উড্ডয়ন, নোঙর, চলাচল ও পরিচালনাও নিয়ন্ত্রণের অধিকার যুক্তরাষ্ট্রকে দেওয়া হয়েছে।
ওই চুক্তির আওতায় বর্তমানে উত্তর-পশ্চিম গ্রিনল্যান্ডের প্রত্যন্ত এলাকায় একটি স্পেস ফোর্স ঘাঁটি পরিচালনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। পিতুফিক স্পেস বেস নামের ওই ঘাঁটিতে ১০০ জনের বেশি মার্কিন সামরিক সদস্য রয়েছেন।
নতুন চুক্তিতে তাহলে বাস্তবে কী বদলাবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘তাৎক্ষণিকভাবে’ গ্রিনল্যান্ডে বড় ধরনের সামরিক উপস্থিতি গড়ে তুলবে। কিন্তু ১৯৫১ সালের চুক্তিতেই যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি নির্মাণ ও সেনা মোতায়েনের অধিকার রয়েছে।
পেন্টাগনের সাবেক কর্মকর্তা ইমরান বায়োমি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, নতুন চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে ঘাঁটি নির্মাণ করতে পারলে সেটি নতুন বিষয় হবে। তবে
তার মতে, ন্যাটোর বৃহত্তর সম্পর্কের ওপর চাপ না দিয়ে কূটনীতি ও আলোচনার মাধ্যমেও ওয়াশিংটন এসব লক্ষ্য অর্জন করতে পারত।
ট্রাম্প আরো বলেছেন, গ্রিনল্যান্ডের মানুষকে উন্নয়ন ও নির্মাণকাজে সহায়তা করবে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি তিনি।
ন্যাটো ডিফেন্স কলেজের ফেলো রিচার্ড ওয়েইটজের মতে, চুক্তিটি ন্যাটোর ভেতরের অন্যতম বড় উত্তেজনার উৎসকে প্রশমিত করতে পারে।
তার মতে, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্প আগের দাবির তুলনায় কম কিছু মেনে নিলেও আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টি ছাড়া তার চাওয়া অনেক কিছুই তিনি পেয়েছেন।
এএম