কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী ঝড়ের প্রভাবে সৃষ্ট ভূমিধসে ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলে অন্তত ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই শক্তিশালী ঝড়ের মুখোমুখি হতে এখন প্রস্তুতি নিচ্ছে পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশ।
টাইফুন ‘বাভি’ প্রশান্ত মহাসাগর পেরিয়ে তাইওয়ানের দিকে ধেয়ে আসছে। ঝড়টি তার কেন্দ্রস্থল থেকে প্রায় ১ হাজার কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত, যা প্রায় ফ্রান্সের আয়তনের সমান।
শনিবার চীনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে আঘাত হানার আগে ঝড়টির কারণে তাইওয়ানের উত্তর ও পূর্বাঞ্চল এবং জাপানের কিছু দূরবর্তী দ্বীপে ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঝড়ের কারণে ইতোমধ্যে এ অঞ্চলের শত শত ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে এবং স্কুলগুলোর ক্লাস স্থগিত করা হয়েছে। বাসিন্দারা আগাম রসদ মজুত করায় সুপারমার্কেটগুলোর তাক খালি হয়ে গেছে।
ফিলিপাইনের মিন্দানাও দ্বীপে রাতভর ভূমিধসের কারণে বেশ কিছু পরিবার মাটির নিচে চাপা পড়েছে। উদ্ধারকারীরা এখনও নিখোঁজদের সন্ধানে তল্লাশি চালাচ্ছেন।
দেশটির সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সপ্তাহান্ত জুড়ে ফিলিপাইনের বিভিন্ন অংশে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে।
তাইওয়ান কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে, টাইফুন বাভির কারণে সেখানে ১ মিটার (৩৯ ইঞ্চি) পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হতে পারে।
দ্বীপটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ত্রাণ ও উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য প্রায় ২৯ হাজার সেনাকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
তাইওয়ানের কেন্দ্রীয় আবহাওয়া প্রশাসন রয়টার্সকে জানিয়েছে, আকারের দিক থেকে ১৯৮৭ সালের পর এটিই দ্বীপটিতে আঘাত হানতে যাওয়া সবচেয়ে বড় ঝড়।
গতকাল শুক্রবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকার সময় এ অঞ্চলের কৃষকেরা দ্রুত তাদের ফসল ঘরে তোলার চেষ্টা করেছেন। জেলেরা তাদের নৌকা ও জাহাজগুলো শক্ত করে বেঁধে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছেন।
রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ৬০ বছর বয়সি এক জেলে চেন মিং-হুই বলেন, ‘এখনকার শান্ত আবহাওয়া দেখে প্রতারিত হবেন না। এই ধরনের ঝড় সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হতে পারে।’
বন্যাপ্রবণ এলাকার বাসিন্দা ও দোকানদারদের মধ্যে হাজার হাজার বালুর বস্তা বিতরণ করা হয়েছে।
তাইওয়ান প্রণালির অন্য পাড়ে অবস্থিত চীনও এই টাইফুনের কারণে ‘মারাত্মক প্রভাবের’ বিষয়ে সতর্ক করেছে। ঝড়টি চীনের দক্ষিণ-পূর্ব ফুজিয়ান প্রদেশে আঘাত হানার পর উত্তর দিকে অগ্রসর হতে পারে।
চীনের ইনস্টিটিউট অফ পাবলিক অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল অ্যাফেয়ার্স-এর পরিচালক মা জুন বলেন, ‘বাভির বিশাল আকার এবং প্রচুর শক্তির কারণে এর অবশিষ্টাংশ এবং বাইরের মেঘমালা জিয়াংসু ও আনহুই প্রদেশ থেকে বোহাই সাগর অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হতে পারে।’
তিনি সতর্ক করে বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের তুলনায় চীনের উত্তরের প্রদেশগুলোর টাইফুন মোকাবিলার অভিজ্ঞতা কম, তাই তাদের প্রস্তুতি জোরদার করা উচিত।
কিছু পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, বাভি চীনে দুইবার আঘাত হানতে পারে।
এদিকে জাপানের প্রত্যন্ত সাকিশিমা দ্বীপপুঞ্জের বাসিন্দারাও উচ্চ সতর্কতায় রয়েছেন।
অনলাইনে প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, অনেকে ঘরের জানালায় টেপ লাগাচ্ছেন এবং বাড়ি ও দোকানে বাতাস প্রতিরোধী জাল ব্যবহার করছেন।
ঝড়ের কারণে বিভিন্ন বিমান সংস্থা এই অঞ্চলে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। জাপান এয়ারলাইন্স শুক্রবার ও শনিবারের ১০০টিরও বেশি ফ্লাইট বাতিল করেছে, যার ফলে প্রায় ২০ হাজার যাত্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অল নিপ্পন এয়ারওয়েজ রোববার পর্যন্ত ১৬০টিরও বেশি ফ্লাইট বাতিল করেছে, এতেও প্রায় ২০ হাজার মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছেন। এছাড়া থাই এয়ারওয়েজ এবং মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সও তাইপেইগামী ও তাইপেই থেকে বহির্গামী সব ফ্লাইট বাতিল করেছে।
চীনের দক্ষিণাঞ্চলের কিছু এলাকা চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে আঘাত হানা টাইফুন ‘মাইসাক’-এর ক্ষয়ক্ষতি এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি। মাইসাকের আঘাতে অন্তত ৩৯ জন নিহত হয়েছেন এবং উদ্ধারকারীরা এখনো ধ্বংসস্তূপের মধ্যে নিখোঁজদের সন্ধান করছেন। গুয়াংসি অঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। মাইসাকের কারণে বিপুল সংখ্যক গবাদি পশু মারা গেছে এবং কৃষিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া এর প্রভাবে মধ্য হুবেই প্রদেশে দুটি বিরল টর্নেডোও সৃষ্টি হয়েছিল।
এএম