হোম > বিশ্ব

পাকিস্তানের ‘বন্ধু’ তুরস্ককে কেন কাছে টানছে ভারত

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোয়ান ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ফাইল ছবি

কাশ্মীর ইস্যুতে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেওয়া এবং সামরিক সহযোগিতা বাড়ানোর পরও তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্কের দরজা বন্ধ করতে চায় না ভারত। বরং মাদক পাচার দমন, নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের মতো ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী নয়াদিল্লি। এর পেছনে রয়েছে কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ। তুরস্কের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রেখে ইসলামী বিশ্বে নিজেদের প্রভাব বাড়ানো এবং ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ার বাজারে প্রবেশের সুযোগ কাজে লাগাতে চায় ভারত। অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে আংকারার ঘনিষ্ঠতা ভারতের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় উদ্বেগ তৈরি করছে।

ভারত ও তুরস্কের সম্পর্কের এই টানাপোড়েন নতুন নয়। কাশ্মীর ইস্যুতে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোয়ান বারবার পাকিস্তানের অবস্থানকে সমর্থন করেছেন। সর্বশেষ গত সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া বক্তব্যেও তিনি কাশ্মীর প্রসঙ্গ তোলেন। এর জবাবে ভারত জানিয়ে দেয়, জম্মু-কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং এ বিষয়ে বাইরের কোনো পক্ষের ভূমিকা নেই।

তবে রাজনৈতিক বিরোধের মধ্যেও দুই দেশের সহযোগিতার কিছু ক্ষেত্র রয়েছে। সম্প্রতি তুরস্ক থেকে মাদক পাচারকারী নাভপ্রীত সিংকে ভারতে প্রত্যর্পণ করা হয়েছে। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এ ঘটনাকে ‘ঐতিহাসিক মাইলফলক’ বলে অভিহিত করেছেন। এ ঘটনা দুই দেশের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এনেছে—রাজনৈতিক মতবিরোধ থাকলেও অপরাধ দমন ও নিরাপত্তার মতো বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করতে পারে তারা।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কাশ্মীর ইস্যু ও পাকিস্তানের সঙ্গে তুরস্কের ঘনিষ্ঠতা দুই দেশের সম্পর্কে চাপ তৈরি করলেও অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের কারণে সহযোগিতার সুযোগ ধরে রাখতে চায় উভয় পক্ষ।

কাশ্মীর নিয়ে বিরোধ

ভারত ও তুরস্কের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় বাধা কাশ্মীর ইস্যু। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মঞ্চে এরদোয়ান এ বিষয়ে বক্তব্য দিয়ে আসছেন। পাকিস্তান কাশ্মীর বিরোধের সমাধানে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ চায়। তুরস্কও বিভিন্ন সময়ে এ অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।

অন্যদিকে ভারত বলে আসছে, জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখ তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ ও দ্বিপক্ষীয় বিষয়।

২০১৯ সালে ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করে জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহারের পর এ বিষয়ে সরব হন এরদোয়ান। ২০২০ ও ২০২১ সালেও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে কাশ্মীর প্রসঙ্গ তোলেন তিনি।

গত সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া বক্তব্যে এরদোয়ান বলেন, কাশ্মীরসহ দক্ষিণ এশিয়ার সব বিরোধ জাতিসংঘ সনদ ও সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবের কাঠামোর মধ্যে সংলাপের মাধ্যমে সমাধান করা উচিত।

এর জবাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, জম্মু-কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ বিষয়ে বাইরের কোনো পক্ষের হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই।

পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে উদ্বেগ

গত ৭ আগস্ট সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেয় তুরস্ক। মক্কা চুক্তি নামে পরিচিত এ সমঝোতা ভারতের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এর ফলে তুরস্কের উন্নত ড্রোন ও সামরিক প্রযুক্তি পাকিস্তানের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ভারতের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাকারীরা আঙ্কারা ও ইসলামাবাদের মধ্যে সম্ভাব্য প্রযুক্তিগত ও সামরিক-শিল্প সহযোগিতা পর্যালোচনা করছেন। বিশেষ করে উন্নত ড্রোন এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থার বিষয়ে নজর রাখছে নয়াদিল্লি।

এ চুক্তির কারণে ভবিষ্যতে সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ভারতের সামরিক অভিযান নিয়েও তুরস্ক বা সৌদি আরবের সঙ্গে কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে। অপারেশন সিঁদুরের মতো অভিযানের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

ভারত জানিয়েছে, তিন দেশের এই সমঝোতার ওপর নজর রাখছে তারা। জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত নয়াদিল্লি। এদিকে পশ্চিম এশিয়ায় নতুন কৌশলগত সমীকরণের মধ্যে ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরাইলের সহযোগিতা একটি পাল্টা ভারসাম্য তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

অপরাধ দমনে সহযোগিতা

রাজনৈতিক বিরোধের মধ্যেও ভারত ও তুরস্কের সম্পর্কের একটি কার্যকর ক্ষেত্র হলো অপরাধ দমন। সম্প্রতি পলাতক মাদক পাচারকারীদের ভারতে ফেরাতে সহযোগিতা করেছে তুরস্ক। তাদের মধ্যে সেলিম ডোলার মতো আলোচিত অপরাধীও রয়েছেন।

ভারতীয় সংস্থাগুলোর অভিযোগ, এসব ব্যক্তি আন্তর্জাতিক মাদক পাচারচক্র পরিচালনা করতেন। আফগানিস্তানসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হেরোইন ও কৃত্রিম মাদক ভারতে পাচারের সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা ছিল। ভারতের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ ব্যুরোসহ বিভিন্ন সংস্থা তাদের খুঁজছিল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০০১ সালে ভারত ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রত্যর্পণ চুক্তি গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে আইনি সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি করেছে। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পলাতক ব্যক্তিদের জাল নথি ও ভুয়া বিদেশি নাগরিকত্বের পরিচয় শনাক্ত করতে কাজ করেছে। এ ক্ষেত্রে ইন্টারপোলের রেড নোটিশও ব্যবহার করা হয়। এর ভিত্তিতে তুরস্কের কর্তৃপক্ষ তাদের নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য করা বিনিয়োগসংক্রান্ত আবেদন আটকে দেয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আটক করে।

তুরস্কের জন্যও মাদক পাচার দমন গুরুত্বপূর্ণ। এশিয়া ও ইউরোপের সংযোগস্থলে অবস্থানের কারণে দেশটি আন্তর্জাতিক মাদক পাচারের ঝুঁকির মুখে রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের অপরাধ দমন তুরস্কের নিজস্ব নিরাপত্তা, অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে জড়িত।

চার বছর পর আবার আলোচনা

সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেও চলতি বছরের এপ্রিলে চার বছর বন্ধ থাকার পর দুই দেশের পররাষ্ট্র দপ্তরের আলোচনা আবার শুরু হয়। তুরস্কের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী বেরিস একিনচি ভারতে গিয়ে বৈঠকে অংশ নেন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পশ্চিমবিষয়ক সচিব সিবি জর্জের সঙ্গে যৌথভাবে বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন তিনি।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, পর্যটন, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, জ্বালানি ও শিক্ষাক্ষেত্রে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়। সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলাসহ নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়ও আলোচনায় আসে।

ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুক্তেশ পারদেশি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-কে বলেন, ‘আমরা মনে করি, কথা না বলে মতবিরোধ ও ভুল-বোঝাবুঝি আরো বাড়ানোর চেয়ে সংলাপ চালিয়ে যাওয়া ভালো। আর আলোচনাগুলো সন্তোষজনক হয়েছে।’

ভারতে তুরস্কের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়ার পর আঙ্কারা এশিয়ায় নিজেদের বৃহত্তর অর্থনৈতিক স্বার্থকে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের প্রভাব থেকে আলাদা রাখার উদ্যোগ নেয়। একই সঙ্গে ভারতকে আশ্বস্ত করে তুরস্ক জানায়, দুই দেশের মধ্যে মৌলিক কোনো দ্বিপক্ষীয় বিরোধ নেই।

ভারতের কাছে তুরস্ক কেন গুরুত্বপূর্ণ

তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখলে ভারতের সামনে কয়েকটি কৌশলগত সুযোগ থাকে। প্রথমত, এর মাধ্যমে ইসলামী বিশ্বে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ পায় নয়াদিল্লি। দ্বিতীয়ত, ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ার বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে তুরস্ক গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করতে পারে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তায় সহযোগিতাও দুই দেশের জন্য লাভজনক হতে পারে।

অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক তুরস্কের জন্যও অর্থনৈতিক, ভূরাজনৈতিক ও অবকাঠামোগত সুবিধা এনে দিতে পারে।

ফলে পাকিস্তানের সঙ্গে তুরস্কের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও আঙ্কারার সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করার পথে হাঁটছে না নয়াদিল্লি। কাশ্মীর ও প্রতিরক্ষা নিয়ে বিরোধের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে সম্পর্কের কার্যকর ক্ষেত্রগুলো ধরে রাখতে চাইছে ভারত।

এএম

‘গেরুয়ার ভয়ে করি গেরুয়ার জয়গান’

শান্তিতে নোবেল বিজয়ীর নাম আগে কখনো শুনিনি: ট্রাম্প

যন্তর মন্তরে যাওয়ার আগে জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি আটক

বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার আগে ককরোচপ্রধানের বার্তা

দাবি না মানলে ইরানের অস্তিত্ব মুছে ফেলার হুমকি ট্রাম্পের

দিল্লির বিক্ষোভ ঠেকাতে হোটেল-ছাত্রাবাসে তরুণদের খুঁজছে পুলিশ

দিল্লিতে ককরোচদের বিক্ষোভ ঘিরে আটক ১০০০, বাতিল ২৫৪ ট্রেন

আইসিসির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে মার্কিন ও ইসরাইলি যুদ্ধাপরাধীদের সুরক্ষা দিচ্ছেন ট্রাম্প

বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে দিল্লিতে ইন্টারনেট-রেল বন্ধ, ৪১ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন

হুথিদের থামাতে ইরানের সহায়তা চায় যুক্তরাষ্ট্র