বসনিয়া ও হার্জেগোভিনায় আজ রোববার সাধারণ নির্বাচন। দেশটির রাষ্ট্রীয়, এনটিটি ও ক্যান্টন—তিন স্তরেই সরকার ও জনপ্রতিনিধি বেছে নিতে ভোট দেবেন ৩৪ লাখের বেশি ভোটার। দেশটি দুটি এনটিটি—ফেডারেশন অব বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনা ও রিপাবলিকা শ্রপস্কা—এবং ব্রচকো জেলা নিয়ে গঠিত। ফলে একই দিনে একাধিক স্তরে ভোট হওয়া দেশটির জন্য নতুন কিছু নয়।
এবারের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। ভোটারদের পরিচয় যাচাইয়ে বায়োমেট্রিক যন্ত্র ব্যবহার করা হবে। ব্যালটও শুধু বাক্সে ফেলার বদলে স্ক্যান করা হবে। তবে ভোট দেওয়ার পদ্ধতি পুরোপুরি ইলেকট্রনিক হচ্ছে না। ভোট কাগজেই দেওয়া ও সংরক্ষণ করা হবে। নতুন প্রযুক্তির ফলে ভোটার শনাক্তকরণ আরও নির্ভুল এবং ভোট যাচাই ও গণনা দ্রুত ও স্বচ্ছ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রেসিডেন্সিতে কারা লড়ছেন
বসনিয়ার প্রেসিডেন্সিতে তিনজন সদস্য থাকেন। তারা দেশটির তিন প্রধান জনগোষ্ঠী—বসনিয়াক, ক্রোয়াট ও সার্ব—সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করেন।
বসনিয়াক সদস্য পদে লড়ছেন বর্তমান প্রেসিডেন্সি সদস্য ডেনিস বেচিরোভিচ। তিনি সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এসডিপি) প্রার্থী। এ ছাড়া আছেন পার্টি অব ডেমোক্রেটিক অ্যাকশনের (এসডিএ) বাকির ইজেতবেগোভিচ, পার্টি ফর বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনার সেমির এফেন্দিচ এবং ইউনিয়ন ফর এ বেটার ফিউচারের ফাহরুদ্দিন রাদোনচিচ।
দেশের সবচেয়ে বড় বসনিয়াক দল এসডিএর নেতা ইজেতবেগোভিচ ২০২২ সালের নির্বাচনে বেচিরোভিচের কাছে হেরেছিলেন। এবার তিনি তৃতীয় মেয়াদের জন্য লড়ছেন।
ক্রোয়াট সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তিনজন। তারা হলেন ক্রোয়েশিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন অব বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনার দারিয়ানা ফিলিপোভিচ, ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের স্লাভেন কোভাচেভিচ এবং পাঁচটি ক্রোয়াট দলের জোটের সমর্থন পাওয়া জদেনকো লুসিচ।
সার্ব সদস্য পদে দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য লড়ছেন বর্তমান সদস্য জেলকা সিভিয়ানোভিচ। তিনি ডানপন্থি অ্যালায়েন্স অব ইন্ডিপেনডেন্ট সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটসের (এসএনএসডি) নেতা। ২০২২ সালের নভেম্বরে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি রাশিয়া ও দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও ধারাবাহিক যোগাযোগ বজায় রেখেছেন।
এসএনএসডির নেতৃত্বে রয়েছেন রিপাবলিকা শ্রপস্কার সাবেক প্রেসিডেন্ট মিলোরাদ দোদিক। বসনিয়ার সংবিধান ও সাবেক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ ক্রিশ্চিয়ান শ্মিটের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করা এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী পদক্ষেপের জন্য তিনি পরিচিত।
সিভিয়ানোভিচের প্রতিদ্বন্দ্বী সার্ব ডেমোক্রেটিক পার্টির মারিনকো বোজোভিচ এবং লিস্ট ফর জাস্টিস অ্যান্ড অর্ডারের নেবয়শা ভুকানোভিচ।
একসঙ্গে বেছে নেওয়া হবে বহু স্তরের প্রতিনিধি
প্রেসিডেন্সির তিন সদস্যের পাশাপাশি ভোটাররা ১৪টি সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিও নির্বাচন করবেন।
দেশটির প্রতিটি এনটির নিজস্ব প্রেসিডেন্ট, পার্লামেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা রয়েছে। এর মধ্যে ফেডারেশন অব বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনা আবার ১০টি ক্যান্টনে বিভক্ত। প্রতিটি ক্যান্টনেরও নিজস্ব সরকার রয়েছে।
দেশটির প্রধান নির্বাচন কমিশন সেন্ট্রাল ইলেকশন কমিশন (সিআইকে) জানিয়েছে, এবার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য ৭৫টি রাজনৈতিক দল ও চারজন স্বতন্ত্র প্রার্থী নিবন্ধিত হয়েছেন।
প্রেসিডেন্সির সদস্য যেভাবে নির্বাচিত হন
বসনিয়ার ভোটাররা সরাসরি একজন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করেন না। তারা প্রেসিডেন্সির তিন সদস্যের একজনকে নির্বাচন করেন। এই তিন সদস্য বসনিয়াক, ক্রোয়াট ও সার্ব—এই তিন জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করেন।
ফেডারেশন অব বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনা থেকে বসনিয়াক ও ক্রোয়াট সদস্য নির্বাচিত হন। আর রিপাবলিকা শ্রপস্কা থেকে নির্বাচিত হন সার্ব সদস্য। এর কারণ, দেশটির অধিকাংশ বসনিয়াক ও ক্রোয়াট ফেডারেশনে এবং অধিকাংশ সার্ব রিপাবলিকা শ্রপস্কায় বসবাস করেন।
প্রেসিডেন্সির ক্রোয়াট সদস্য নির্বাচন নিয়ে বসনিয়াক ও ক্রোয়াটদের মধ্যে বছরের পর বছর ধরে বিরোধ রয়েছে। রাজনৈতিক অচলাবস্থার অন্যতম কারণ হিসেবেও বিষয়টি প্রায়ই সামনে আসে।
ডানপন্থি ক্রোয়েশিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন অব বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনা ঘিরে থাকা দলগুলো নির্বাচনী আইন পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের দাবি, বসনিয়াক ভোটারদের ভোট দিয়ে ক্রোয়াট সদস্য নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ বন্ধ করতে হবে।
তবে এ জন্য সংবিধানেও পরিবর্তন আনতে হবে। বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী, ফেডারেশনের সব নাগরিক বসনিয়াক বা ক্রোয়াট—যে কোনো একজন সদস্যকে বেছে নেওয়ার জন্য ভোট দিতে পারেন।
নিজ সম্প্রদায়ের এলাকায় না থাকলে ভোটের সুযোগ সীমিত
ফেডারেশনে বসবাসকারী কোনো সার্ব কিংবা রিপাবলিকা শ্রপস্কায় বসবাসকারী কোনো বসনিয়াক বা ক্রোয়াট নিজের সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচনে দাঁড়াতে পারেন না। এমনকি তাঁরা নিজেদের সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসেবে যাঁকে বিবেচনা করেন, তাঁকেও ভোট দিতে পারেন না।
এটি বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার নির্বাচনী ব্যবস্থার অনেক বৈপরীত্যের একটি।
রাষ্ট্রীয় সরকার কীভাবে গঠিত হয়
দেশটির পার্লামেন্টারি অ্যাসেম্বলি দুটি কক্ষ নিয়ে গঠিত। ভোটাররা প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য নির্বাচন করেন। এবার প্রতিনিধি পরিষদের ৪২টি আসনে ভোট হবে।
এর দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য সরাসরি ফেডারেশন অব বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনা থেকে এবং এক-তৃতীয়াংশ রিপাবলিকা শ্রপস্কা থেকে নির্বাচিত হবেন। প্রতিনিধি পরিষদে কোরাম গঠনের জন্য নির্বাচিত সব সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন।
পার্লামেন্টের দ্বিতীয় কক্ষ হাউস অব পিপলস। এই কক্ষে ১৫ জন প্রতিনিধি থাকেন। বসনিয়াক, ক্রোয়াট ও সার্ব—প্রতিটি সম্প্রদায় থেকে পাঁচজন করে প্রতিনিধি থাকেন। তাঁরা সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন না; বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হন।
দুই এনটিটিতে ভোটের নিয়ম আলাদা
রিপাবলিকা শ্রপস্কায় ভোটাররা সরাসরি জাতীয় পরিষদ, এনটির প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করবেন। তবে এনটির সরকার সরাসরি নির্বাচিত হবে না। জাতীয় পরিষদের অনুমোদনের মাধ্যমে সরকার গঠিত হবে।
ফেডারেশন অব বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনায় ভোটাররা সরাসরি ফেডারেশন পার্লামেন্টের প্রতিনিধি পরিষদ ও ক্যান্টনগুলোর আইনসভা নির্বাচন করবেন। পরে ক্যান্টন আইনসভাগুলো ফেডারেশনের হাউস অব পিপলসের প্রতিনিধি নির্বাচন করবে।
ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট, এনটির সরকার এবং ক্যান্টন সরকারগুলো নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে গঠিত হবে।
সরকার গঠন কেন কঠিন
শুধু নির্বাচনী ব্যবস্থা জটিল বলেই নয়, তিন প্রধান জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের মধ্যে মতৈক্যের অভাবও সরকার গঠনের বড় বাধা। বিভিন্ন পর্যায়ে রাজনৈতিক অবরোধ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধার কারণে কাজ এগোনো কঠিন হয়ে পড়ে। যদিও অনেক রাজনীতিক সমঝোতার রাজনীতির কথা বলেন।
তাই বসনিয়ার নির্বাচন শুধু কে জিতল, সেই প্রশ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সব সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য তৈরি এই রাজনৈতিক ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত দেশের নাগরিকদের জন্য কতটা কার্যকর হয়, সেটিও বড় প্রশ্ন।
ইইউর পথে অগ্রগতির পরীক্ষাও এই নির্বাচন
নির্বাচনে নতুন প্রযুক্তি সম্ভাব্য জালিয়াতি কমাতে পারে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের পথে বসনিয়ার অগ্রগতির জন্য আরও অনেক কিছু করতে হবে।
নির্বাচনের ফল গুরুত্বপূর্ণ আইন পাসের প্রক্রিয়া এগিয়ে দিতে পারে। আবার রাজনৈতিক অচলাবস্থা আরও বাড়লে ইইউ সদস্যপদের পথে অগ্রগতি ধীরও হতে পারে।
২০২২ সালের ডিসেম্বরে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে ইইউ প্রার্থী দেশের মর্যাদা দেওয়া হয়। ২০২৪ সালে দেশটির সঙ্গে সদস্যপদ নিয়ে আলোচনা শুরুর সিদ্ধান্ত হয়। তবে এরপর দেশটির অগ্রগতি খুবই সীমিত বলে মূল্যায়ন করা হয়েছে। রাজনৈতিক অবরোধের কারণে সেই অগ্রগতি আরো ধীর হয়েছে।
এবারের নির্বাচন ক্ষমতাসীন জোটের জন্যও পরীক্ষা। জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার মধ্যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল জোটটি।
ফল কবে
আজ রাতেই সিআইকে প্রথম প্রাথমিক ফল প্রকাশ শুরু করবে। এরপর কয়েক ঘণ্টা পরপর ফল হালনাগাদ করা হবে।
পরবর্তী দিনগুলোতে দেশের বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র, মোবাইল ভোটিং দল, ডাকযোগে পাঠানো ব্যালট এবং কূটনৈতিক ও কনস্যুলার মিশন থেকে পাওয়া ব্যালটের হিসাব যুক্ত করবে সিআইকে।
চূড়ান্ত ফল ২০ নভেম্বরের মধ্যে প্রকাশ করা হবে।
এএম