যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল নির্বাচন হতে যাচ্ছে। নির্বাচনি প্রচারের বিজ্ঞাপনেই ব্যয় হতে পারে ১ হাজার ১৬০ কোটি ডলার। বিজ্ঞাপন ব্যয় পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাডইমপ্যাক্টের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনসহ অতীতের যেকোনো নির্বাচনের তুলনায় এবার বিজ্ঞাপনে বেশি অর্থ ব্যয় হবে।
এবারের নির্বাচনে বিপুল পরিমাণ অর্থ দিচ্ছেন বিশ্বের শীর্ষ ধনকুবের, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন। এসব অনুদানের বড় অংশ সরাসরি প্রার্থীদের নির্বাচনি প্রচারে যাচ্ছে না। বরং অর্থের বড় অংশ দেওয়া হচ্ছে সুপার পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি বা সুপার প্যাকের মাধ্যমে।
আল জাজিরার এক বিশ্লেষণে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল নির্বাচন কমিশনের (এফইসি) তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, এবারের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ৫০ জন ব্যক্তি ও সংগঠন মোট ২৭৭ কোটি ডলার অনুদান দিয়েছে।
এর মধ্যে রিপাবলিকানপন্থী অনুদানদাতারা দিয়েছেন ১৬৭ কোটি ডলার, যা মোট অনুদানের প্রায় ৬০ শতাংশ। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটপন্থীরা দিয়েছেন ৮৩ কোটি ২০ লাখ ডলার বা প্রায় ৩০ শতাংশ। বাকি ২৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার এসেছে দুই দলের প্রতি সমর্থন জানানো এবং বিশেষ স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের কাছ থেকে। এসব সংগঠনের মধ্যে ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ক্রীড়াভিত্তিক বাজি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।
সবচেয়ে বেশি অনুদান দিয়েছেন ইলন মাস্ক
এবারের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বড় ব্যক্তি অনুদানদাতা বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক। টেসলা ও স্পেসএক্সের প্রধান মাস্ক এখন পর্যন্ত ৪৪ কোটি ৬০ লাখ ডলার অনুদান দিয়েছেন।
রিপাবলিকানপন্থী অন্য বড় অনুদানদাতাদের মধ্যে রয়েছেন জাহাজে পণ্য পরিবহনের সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ইউলাইনের প্রতিষ্ঠাতা এলিজাবেথ ও রিচার্ড ইউহলিন। তারা দিয়েছেন ১৫ কোটি ডলার। এ ছাড়া ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান সুসকেহানা ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপের সহপ্রতিষ্ঠাতা জেফ ইয়াস ও তার স্ত্রী জেনিন ইয়াস দিয়েছেন ১১ কোটি ডলার।
অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটপন্থী বড় ব্যক্তি অনুদানদাতাদের মধ্যে রয়েছেন ধনকুবের বিনিয়োগকারী ও ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা জর্জ সরোস, নিউইয়র্কের সাবেক মেয়র মাইক ব্লুমবার্গ এবং লিংকডইনের সহপ্রতিষ্ঠাতা রিড হফম্যান ও তার স্ত্রী মিশেল ই।
ডেমোক্র্যাটপন্থী অনুদানদাতাদের মধ্যে সরোস দিয়েছেন ১০ কোটি ২০ লাখ ডলার, ব্লুমবার্গ দিয়েছেন ৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার এবং হফম্যান ও তার স্ত্রী দিয়েছেন ৪ কোটি ১০ লাখ ডলার।
সুপার প্যাকের মাধ্যমে যাচ্ছে বিপুল অর্থ
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে একজন ব্যক্তি কোনো প্রার্থীকে প্রতি নির্বাচনে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫০০ ডলার অনুদান দিতে পারেন। কিন্তু এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় অনুদানদাতাদের তালিকায় থাকা কয়েকজন ব্যক্তি শত শত মিলিয়ন ডলার দিয়েছেন। প্রশ্ন হলো, এত বিপুল অর্থ কীভাবে দেওয়া সম্ভব?
এর কারণ, এসব অর্থের বেশির ভাগ সরাসরি প্রার্থীদের দেওয়া হয়নি। দেওয়া হয়েছে সুপার প্যাকগুলোকে। এসব সংগঠন কোনো প্রার্থীকে সমর্থন বা বিরোধিতা করার জন্য সীমাহীন অর্থ সংগ্রহ ও ব্যয় করতে পারে। তবে প্রার্থী কিংবা তার নির্বাচনি প্রচার দলের সঙ্গে সমন্বয় করে এসব অর্থ ব্যয় করার সুযোগ নেই তাদের।
২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি আদালতের রায়ের পর সুপার প্যাকের কার্যক্রম শুরু হয়। ওই রায়ের ফলে প্রার্থীদের কাছ থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করা সংগঠনগুলোর নির্বাচনী ব্যয়ের ওপর সীমাবদ্ধতা উঠে যায়।
সুপার প্যাকগুলোকে তাদের অনুদানদাতাদের তথ্য ফেডারেল নির্বাচন কমিশনকে জানাতে হয়। তবে ওয়ান নেশন ও মেজরিটি ফরোয়ার্ডের মতো কিছু অলাভজনক সংগঠনকে তাদের অর্থের উৎস প্রকাশ করতে হয় না। ফলে রাজনৈতিক অনুদানের প্রকৃত উৎস অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়। এ ধরনের অর্থায়নকে বলা হয় ‘ডার্ক মানি’ বা অপ্রকাশিত অর্থ।
হার্ভার্ড ল স্কুলের অধ্যাপক লরেন্স লেসিগের মতে, এসব অর্থের উৎস রাজনীতিবিদদের কাছে গোপন থাকে না, বরং ভোটারদের কাছেই অজানা থেকে যায়। তাঁর ভাষায়, রাজনীতিবিদেরা জানেন অর্থ কোথা থেকে আসছে এবং তাদের কী করতে হবে।
অনুদানে এগিয়ে রাজনৈতিক সংগঠন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান
রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অনুদান দিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। রিপাবলিকানপন্থী সংগঠনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ওয়ান নেশন। সংগঠনটি সিনেটে রিপাবলিকান নেতৃত্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এরপর রয়েছে প্রতিনিধি পরিষদের রিপাবলিকান নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত আমেরিকান অ্যাকশন নেটওয়ার্ক।
অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটপন্থী সংগঠনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অনুদান দিয়েছে মেজরিটি ফরোয়ার্ড ও হাউস মেজরিটি ফরোয়ার্ড। সংগঠন দুটি যথাক্রমে সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাট নেতৃত্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
রিপাবলিকানপন্থী সংগঠনগুলোর মধ্যে ওয়ান নেশন দিয়েছে ১৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার, আমেরিকান অ্যাকশন নেটওয়ার্ক দিয়েছে ৬ কোটি ৪৩ লাখ ডলার এবং আমেরিকান প্রসপারিটি অ্যালায়েন্স দিয়েছে ৫ কোটি ৭ লাখ ডলার।
অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটপন্থী মেজরিটি ফরোয়ার্ড দিয়েছে ১০ কোটি ২০ লাখ ডলার, হাউস মেজরিটি ফরোয়ার্ড দিয়েছে ৯ কোটি ৩৭ লাখ ডলার এবং ইকোনমিক অপরচুনিটি ফান্ড দিয়েছে ৪ কোটি ১৫ লাখ ডলার।
ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোও এবারের নির্বাচনে বড় অঙ্কের অর্থ অনুদান দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ কয়েনবেস দিয়েছে ৫ কোটি ৭৮ লাখ ডলার। ব্লকচেইনভিত্তিক অর্থ লেনদেন প্রতিষ্ঠান রিপল দিয়েছে ৪ কোটি ৯৬ লাখ ডলার। আর ক্রিপ্টো ডটকমের মূল প্রতিষ্ঠান ফরিস ডিএএক্স দিয়েছে ৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার।
এ ছাড়া শিল্পগোষ্ঠী কোচ দিয়েছে ৪ কোটি ৬৮ লাখ ডলার এবং ক্রীড়াভিত্তিক বাজি ধরার প্রতিষ্ঠান ড্রাফটকিংস দিয়েছে ৪ কোটি ৪ লাখ ডলার।
অল্প কয়েকজন ধনীর হাতে অনুদানের বড় অংশ
এবারের নির্বাচনে চারজন ব্যক্তি প্রত্যেকে ১০ কোটি ডলারের বেশি অনুদান দিয়েছেন। নির্বাচনে অর্থের এমন বিপুল প্রবাহ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন হার্ভার্ড ল স্কুলের অধ্যাপক লরেন্স লেসিগ।
তার মতে, নির্বাচনে মোট কত অর্থ ব্যয় হচ্ছে, সেটিই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় নয়। বরং অল্প কয়েকজন ধনকুবেরের হাতে নির্বাচনি অনুদানের বিপুল অর্থ কেন্দ্রীভূত হওয়াই বড় উদ্বেগের কারণ।
তিনি মনে করেন, যাদের হাতে বিপুল অর্থ নেই, নির্বাচনি রাজনীতিতে তাদের প্রভাব বিস্তারের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ছে। ফলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের মতামত ও প্রভাব কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
সূত্র: আল জাজিরা
এআরবি