যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির বড় পরাজয়ের পর ইসরাইলবিষয়ক নীতিতে কঠোর অবস্থান নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপে যুক্তরাজ্যের নীতিকে অনুসরণ করতে চান দলটির প্রগতিশীল নেতারা। এ লক্ষে ব্রিটিশ লেবার পার্টির সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা চলছে।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইকে (এমইই) ডেমোক্র্যাট নেতারা জানিয়েছেন, কংগ্রেসে নিজেদের অবস্থান কাজে লাগিয়ে ইসরাইলি বসতি স্থাপন এবং এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার উদ্যোগ নিতে চান তারা। গত সেপ্টেম্বরে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডাসহ কয়েকটি দেশ ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের যে পদক্ষেপ নিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রও সে পথে এগোতে পারে।
এদিকে ২০২৮ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাট ও যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির মধ্যে পুরোনো রাজনৈতিক সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করার আলোচনা চলছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের বরাত দিয়ে এমইই জানিয়েছে, ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের অ্যান্ডি বার্নহ্যামের সরকারের অনানুষ্ঠানিক আলোচনা ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। দুই দেশের নেতৃত্বে প্রগতিশীল সরকার এলে তাদের মধ্যে শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
ডেমোক্র্যাট নেতারা বিশেষভাবে নজর রাখছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ডের ওপর। ইসরাইল প্রশ্নে তারা সাবেক প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের পররাষ্ট্রনীতির অবস্থান থেকে সরে এসে যে কঠোর নীতি গ্রহণ করেছেন, তা যুক্তরাজ্যে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে বলে মনে করছেন মার্কিন নেতারা।
ব্রিটিশ নিষেধাজ্ঞা থেকে অনুপ্রেরণা
ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকজন ডেমোক্র্যাট নেতা। টেক্সাসের কংগ্রেস সদস্য হোয়াকিন কাস্ত্রো এড মিলিব্যান্ডের ঘোষণাকে ‘সঠিক পথে একটি পদক্ষেপ’ বলে অভিহিত করেছেন।
কংগ্রেস সদস্য রো খান্নাও যুক্তরাজ্যের উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। গত গ্রীষ্মে অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের হাতে বন্দুকের মুখে পড়েছিলেন তিনি।
ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রগতিশীল অংশের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ওয়াশিংটনের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ম্যাট ডাস বলেন, গুরুত্বপূর্ণ মিত্র দেশগুলোকে এ ধরনের পদক্ষেপ নিতে দেখলে যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতারাও উৎসাহিত হন। তার মতে, ফিলিস্তিনিদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সমর্থন জানাতে আগ্রহী নতুন প্রজন্মের প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসে আসছেন।
ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য গ্রেগ কাসার এরই মধ্যে ইসরাইলি বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেনও বলেছেন, কংগ্রেসের এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে এবং তা নেওয়া উচিত।
যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির চেয়ার এমিলি থর্নবেরি মনে করেন, রো খান্না, গ্রেগ কাসার ও হোয়াকিন কাস্ত্রোর মতো নেতারা যদি ইসরাইল ও অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড নিয়ে মার্কিন নীতি নির্ধারণের দায়িত্ব পান, তাহলে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব।
তিনি বলেন, ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্য যে পদক্ষেপ নিয়েছে, সেটিকে মডেল হিসেবে গ্রহণ করার সুপারিশ করবেন তিনি। এ বিষয়ে শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একযোগে কাজ করার প্রত্যাশাও জানিয়েছেন তিনি।
ইসরাইলি বসতি নির্মাণে নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব
যুক্তরাজ্যের নীতিতে অনুপ্রাণিত হওয়ার আরেকটি নজির দেখা গেছে মার্কিন সিনেটে। গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ১৯ জন ডেমোক্র্যাট সিনেটর একটি নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এতে ইসরাইল সরকারের ‘ই-১’ পরিকল্পনার আওতায় বসতি নির্মাণে সহায়তাকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
ইসরাইলের এই পরিকল্পনার আওতায় জেরুজালেম ও পূর্ব তীরের বিদ্যমান মালে আদুমিম বসতির মধ্যবর্তী এলাকায় হাজার হাজার নতুন আবাসন নির্মাণের উদ্যোগ রয়েছে। এলাকাটি জেরুজালেম থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত।
সমালোচকদের মতে, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে অধিকৃত পশ্চিম তীর কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়বে। এতে ভবিষ্যতে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে।
নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাবের অন্যতম উদ্যোক্তা কংগ্রেস সদস্য ম্যাডেলিন ডিন বলেন, ফিলিস্তিনি জনগণের মর্যাদা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রেরও যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডার মতো মিত্রদের সঙ্গে পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এসেছে। শান্তি প্রতিষ্ঠার অগ্রগতির জন্য এসব অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।
ব্রিটিশ লেবার পার্টির সংসদ সদস্য জন ম্যাকডোনেলও মনে করেন, ফিলিস্তিন ইস্যুতে এড মিলিব্যান্ডের নীতিগত পরিবর্তন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইসরাইলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রচেষ্টায় বড় অগ্রগতি। তার মতে, ইসরাইলকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে বিচ্ছিন্ন করতে একটি আন্তর্জাতিক জোট গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ফলাফল আটলান্টিকের দুই পারের দেশগুলোর মধ্যে কার্যকর নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
বাইডেনের নীতি থেকে দূরে সরে যেতে চায় ডেমোক্র্যাটরা
ইসরাইল ইস্যুতে ডেমোক্রেটিক পার্টির অবস্থান পরিবর্তনের পেছনে দলটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাবও রয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলে গাজা যুদ্ধের সময় ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতি ওয়াশিংটনের সমর্থন নিয়ে দলের ভেতরেই অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। সেই অবস্থান থেকে দূরত্ব তৈরি করতে চান প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাটরা।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে ইসরাইলের কঠোর সমালোচক হিসেবে পরিচিত বেশ কয়েকজন প্রার্থীর জয় এ প্রবণতাকে আরো শক্তিশালী করতে পারে। মিশিগানে আবদুল আল-সাইয়েদের বিজয় এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে। ট্রাম্পের ধারাবাহিক আক্রমণের মুখেও জয়ী হওয়া আল-সাইয়েদকে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও সমর্থন দিয়েছিলেন।
বিশ্লেষকদের ধারণা, নির্বাচনে এ ধরনের প্রার্থীদের সাফল্যের ফলে ডেমোক্রেটিক পার্টির মধ্যে ইসরাইলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার দাবি আরো জোরালো হবে।
বিশেষ করে ট্রাম্প যদি ইসরাইলকে সঙ্গে নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন কোনো সামরিক অভিযান শুরু করেন, তাহলে এ অবস্থান আরো শক্তিশালী হতে পারে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ ভোটার নতুন করে এমন যুদ্ধ শুরুর পক্ষে নন।
ফিরতে পারে লেবার-ডেমোক্র্যাটদের পুরোনো জোট
যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাট ও যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির মধ্যে সম্ভাব্য ঘনিষ্ঠতা দুই দেশের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক সম্পর্কের কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছে। ১৯৯৭ সালে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে টনি ব্লেয়ারের সঙ্গে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। ষাটের দশকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড উইলসন ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসনের মধ্যেও একই ধরনের রাজনৈতিক সমন্বয় দেখা গিয়েছিল।
তাই ডেমোক্র্যাট ও লেবার পার্টির মধ্যে নতুন করে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হলে তা দুই দেশের প্রচলিত কূটনৈতিক সম্পর্কের ধারায় ফিরে যাওয়ার ইঙ্গিত দিতে পারে। ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেই পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করেছে যুক্তরাজ্য।
তবে এবার সেই সম্পর্কের কেন্দ্রে উঠে আসছে ফিলিস্তিন ইস্যু এবং ইসরাইলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান। ২০২৮ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, দুই দেশের প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে এই সহযোগিতা কতটা বিস্তৃত হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
সূত্র: মিডলইস্ট আই
এআরবি