নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা ও প্রতিনিধিরা বক্তব্য দিচ্ছেন। তবে আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ সংকট সমাধানে জাতিসংঘের কার্যকর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন ক্রমেই এমন একটি মঞ্চে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যেখানে বক্তব্য অনেক হচ্ছে, কিন্তু সিদ্ধান্ত ও কার্যকর পদক্ষেপ তুলনামূলকভাবে কম হচ্ছে।
পরাশক্তিগুলো এখনো জাতিসংঘকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। তবে গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর নেতারা অনেক সময় জাতিসংঘের পরিবর্তে দ্বিপক্ষীয় বা ছোট পরিসরের বৈঠককে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। এবারের অধিবেশনের সময় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করেন। অন্যদিকে চীন জাতিসংঘের সাধারণ বিতর্কে ভাইস প্রেসিডেন্ট হান ঝেংকে পাঠায়। রাশিয়ার পক্ষে নিউইয়র্কে যান পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবগুলো সাধারণত রাজনৈতিক ও নৈতিক গুরুত্ব বহন করলেও সেগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়। অন্যদিকে নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের ভেটো ক্ষমতা রয়েছে। ফলে কোনো একটি স্থায়ী সদস্য আপত্তি জানালে গুরুত্বপূর্ণ কোনো প্রস্তাব আটকে যেতে পারে। গাজা সংকটে এই কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা বিশেষভাবে দৃশ্যমান হয়েছে।
২০২৫ সালের জুনে গাজায় অবিলম্বে, নিঃশর্ত ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতির দাবিতে নিরাপত্তা পরিষদে একটি প্রস্তাব উত্থাপিত হলে যুক্তরাষ্ট্র তাতে ভেটো দেয়। নিরাপত্তা পরিষদের বাকি ১৪ সদস্য প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দিয়েছিল। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন থাকা সত্ত্বেও প্রস্তাবটি কার্যকর হয়নি।
এবারের অধিবেশনে ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় বছরের মতো ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাকে ভিসা দেয়নি। ওয়াশিংটন এর পেছনে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ও পিএলওর বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কথা উল্লেখ করেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ভিসা না পাওয়ার কারণে ফিলিস্তিনি নেতাদের ভার্চুয়ালি উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার পক্ষে দেশগুলো মত দেয়।
জাতিসংঘের কূটনীতি শুধু আনুষ্ঠানিক বক্তৃতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে করিডর, বৈঠক, নৈশভোজ ও অনানুষ্ঠানিক আলোচনায়ও গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা তৈরি হয়। ফলে কোনো প্রতিনিধিদলের শারীরিক উপস্থিতি সীমিত হলে তাদের সরাসরি আলোচনা, জোট গঠন ও সমর্থন আদায়ের সুযোগও কমে যায়।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বক্তব্য শুরু করলে কয়েকটি দেশের প্রতিনিধিদল হল থেকে বেরিয়ে যায়। নেতানিয়াহু গাজায় ইসরাইলের কর্মকাণ্ড নিয়ে অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে সরকারের সামরিক অবস্থানের পক্ষে বক্তব্য দেন। প্রতিনিধিদের ওয়াকআউট কোনো আইনগত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেনি, তবে এটি ইসরাইল ইস্যুতে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিভাজনের একটি দৃশ্যমান চিত্র হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে চীন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতিসংঘের বাইরে সরাসরি রাষ্ট্রীয় কূটনীতির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে ভূমিকা বাড়িয়েছে। ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের চুক্তি হয়। ২০২৪ সালে বেইজিংয়ে ১৪টি ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা বিভাজন অবসান ও জাতীয় ঐক্য জোরদারের বিষয়ে বেইজিং ঘোষণায় স্বাক্ষর করেন। এসব উদ্যোগ জাতিসংঘের বিকল্প হিসেবে চীনের সক্ষমতা প্রমাণ করে না, তবে রাষ্ট্রগুলো কেন সরাসরি আলোচনার জন্য অন্য প্ল্যাটফর্ম বেছে নিচ্ছে, তার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে এগুলো সামনে এসেছে।
তবে জাতিসংঘ অকার্যকর হয়ে গেছে—এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না। মানবিক সহায়তা, খাদ্য, চিকিৎসা ও ত্রাণ কার্যক্রমে জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মূল সমস্যা হচ্ছে, মানবিক সংকট মোকাবিলায় সংস্থাটির সক্ষমতা থাকলেও সেই সংকট সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ঠেকানোর ক্ষেত্রে তার ক্ষমতা অনেক সীমিত।
জাতিসংঘ যদি আন্তর্জাতিক আস্থা পুনরুদ্ধার করতে চায়, তাহলে শুধু সংস্কারের কথা বললেই হবে না। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভেটোজনিত অচলাবস্থা কমানোর মতো কাঠামোগত প্রশ্নগুলোর সমাধান প্রয়োজন। তা না হলে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক দরকষাকষি ক্রমেই জাতিসংঘের বাইরে চলে যেতে পারে—আর নিউইয়র্কে থেকে যেতে পারে মূলত বক্তৃতার মঞ্চ।