হোম > বিশ্ব > আমেরিকা

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে পুনর্নির্বাচিত মুসলিম নারী লতিফা সাইমন

আমার দেশ অনলাইন

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্যালিফোর্নিয়ার ১২তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী লতিফা সাইমন। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদনে তার জয়ের খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে আরও দুই বছরের মেয়াদ পাচ্ছেন তিনি। এবারের নির্বাচনে তিনি একই দলের প্রার্থী জেমি জয়েসকে পরাজিত করেছেন।

৪৯ বছর বয়সী লতিফা সাইমন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে নির্বাচিত প্রথম মুসলিম নারী। একই সঙ্গে জন্মগত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতা নিয়ে কংগ্রেসে নির্বাচিত প্রথম সদস্য হিসেবেও পরিচিত তিনি। দীর্ঘদিন ধরে নাগরিক অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার, জাতিগত সমতা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে কাজ করে আসছেন এই রাজনীতিক। কংগ্রেসে যাওয়ার আগে স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠক, মানবাধিকারকর্মী ও পরিবহন খাতের জনপ্রতিনিধি হিসেবে তার পরিচিতি ছিল।

শৈশব ও শিক্ষাজীবন

১৯৭৭ সালের ২৯ জানুয়ারি ক্যালিফোর্নিয়ার সান ফ্রান্সিসকোতে জন্ম লতিফা সাইমনের। জন্ম থেকেই তিনি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। নিজের এই প্রতিবন্ধকতা তার চলাফেরা ও দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেললেও পরবর্তী সময়ে গণপরিবহনব্যবস্থার উন্নয়ন ও প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে।

তিনি মিলস কলেজ থেকে জননীতি বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ইউনিভার্সিটি অব সান ফ্রান্সিসকো থেকে জনপ্রশাসনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি দুই কন্যার মা।

কিশোর বয়স থেকেই অধিকার আন্দোলনে

লতিফা সাইমনের সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের শুরু কৈশোরে। মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি ইয়াং উইমেনস ফ্রিডম সেন্টারে প্রচার ও জনসম্পৃক্ততাবিষয়ক সমন্বয়ক হিসেবে কাজ শুরু করেন। প্রতিষ্ঠানটি বিচারব্যবস্থা ও পালক পরিচর্যা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ঝুঁকিতে থাকা তরুণী ও কিশোরীদের সহায়তা করত।

১৯ বছর বয়সে তিনি ওই প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক হন। সেখানে এক দশকের বেশি সময় ধরে প্রান্তিক তরুণীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, নেতৃত্ব বিকাশ এবং বিচারব্যবস্থার বিকল্প সহায়তা নিয়ে কাজ করেন। তার নেতৃত্বে অপরাধপ্রবণ পরিস্থিতিতে থাকা তরুণীদের পুনর্বাসন ও সমাজে ফিরিয়ে আনার বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়।

এই কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৩ সালে তিনি ম্যাকআর্থার ফেলোশিপ লাভ করেন। তখন তার বয়স ছিল ২৬ বছর। সামাজিক পরিবর্তন ও সৃজনশীল নেতৃত্বে বিশেষ অবদানের জন্য দেওয়া এ সম্মাননা সাধারণভাবে ‘জিনিয়াস গ্র্যান্ট’ নামে পরিচিত।

অপরাধ বিচারব্যবস্থার সংস্কারে ভূমিকা

পরবর্তী সময়ে সান ফ্রান্সিসকোর তৎকালীন জেলা অ্যাটর্নি কমলা হ্যারিসের সঙ্গে কাজ করেন সাইমন। তাঁদের উদ্যোগে চালু হওয়া ‘ব্যাক অন ট্র্যাক’ কর্মসূচির নেতৃত্ব দেন তিনি। কম গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত তরুণদের কারাগারে পাঠানোর পরিবর্তে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়াই ছিল এ কর্মসূচির উদ্দেশ্য। পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা কমানোর লক্ষ্যেও এটি কাজ করে।

এ ছাড়া তিনি সান ফ্রান্সিসকো বে এরিয়ার লইয়ার্স কমিটি ফর সিভিল রাইটসের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় অভিবাসী, আশ্রয়প্রার্থী এবং কারাভোগ শেষে সমাজে ফিরে আসা ব্যক্তিদের আইনি সহায়তা বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেন। পরে রোজেনবার্গ ফাউন্ডেশনের কর্মসূচি পরিচালক এবং আকোনাদি ফাউন্ডেশনের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।

পরিবহন খাত থেকে নির্বাচনী রাজনীতি

২০১৬ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার বে এরিয়া র‍্যাপিড ট্রানজিট বা বার্টের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য নির্বাচিত হন লতিফা সাইমন। অস্কার গ্রান্ট হত্যাকাণ্ডের পর পরিবহনব্যবস্থায় নিরাপত্তা ও জবাবদিহি নিয়ে জনমনে তৈরি হওয়া আলোচনার প্রেক্ষাপটে তিনি নির্বাচনে অংশ নেন।

২০১৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বার্টের পরিচালনা পর্ষদে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ছিলেন পর্ষদের সভাপতি। দায়িত্ব পালনকালে গণপরিবহনে নিরাপত্তা, যাত্রীসেবার মান, প্রতিবন্ধী ও স্বল্প আয়ের মানুষের যাতায়াতের সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর উদ্যোগে বার্টে ‘অ্যাম্বাসেডর প্রোগ্রাম’ চালু হয়। এ কর্মসূচিতে নিরস্ত্র কর্মী ও সংকট মোকাবিলায় প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করে যাত্রীদের নিরাপত্তা ও সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

এ ছাড়া ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি ব্যবস্থার ট্রাস্টি বোর্ডেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০২০ সালে তৎকালীন গভর্নর গ্যাভিন নিউসম তাকে পুলিশ সংস্কারবিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেন।

কংগ্রেসে প্রবেশ ও দায়িত্ব

২০২৪ সালের নির্বাচনে ক্যালিফোর্নিয়ার ১২তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়ে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে যান লতিফা সাইমন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তার কংগ্রেসের প্রথম মেয়াদ শুরু হয়। ওই নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি ক্যালিফোর্নিয়া থেকে প্রতিনিধি পরিষদে নির্বাচিত প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে ইতিহাস গড়েন।

বর্তমানে তিনি কংগ্রেসের ওভারসাইট অ্যান্ড গভর্নমেন্ট রিফর্ম এবং স্মল বিজনেস কমিটিতে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি কংগ্রেসনাল প্রগ্রেসিভ ককাস ও কংগ্রেসনাল ইকুয়ালিটি ককাসের ভাইস চেয়ার এবং ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নীতিবিষয়ক ডেপুটি হুইপ হিসেবে কাজ করছেন। কংগ্রেসনাল ব্ল্যাক ককাস ও কংগ্রেসনাল এশিয়ান প্যাসিফিক আমেরিকান ককাসেরও সদস্য তিনি।

কোন বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছেন

কংগ্রেসে লতিফা সাইমনের কাজের প্রধান ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে সাশ্রয়ী আবাসন, গণপরিবহন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, গৃহহীন মানুষের সমস্যা, জলবায়ু সহনশীলতা, নারীর অধিকার, প্রতিবন্ধী মানুষের সমান সুযোগ এবং অভিবাসীদের সুরক্ষা।

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও ওষুধের দাম কমিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণের বিষয়েও কাজ করছেন তিনি। তাঁর নির্বাচনী প্রচার ও কংগ্রেসের কার্যক্রমে পূর্ব বে এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সুযোগ বাড়ানো এবং স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়ও গুরুত্ব পেয়েছে।

তার নিজস্ব নির্বাচনী ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, কংগ্রেসে যোগ দেওয়ার পর পূর্ব বে এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সুযোগ সম্প্রসারণে তিনি তিনটি দ্বিদলীয় বিল পাস করাতে ভূমিকা রেখেছেন। এ ছাড়া তাঁর নির্বাচনী এলাকার জননিরাপত্তা, গণপরিবহন ও উন্নয়নমূলক কাজে ১ কোটি ১০ লাখ ডলারের বেশি কেন্দ্রীয় তহবিল নিশ্চিত করেছেন।

যে এলাকা থেকে নির্বাচিত

ক্যালিফোর্নিয়ার ১২তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টের আওতায় রয়েছে আলামেডা কাউন্টির বেশ কয়েকটি শহর ও এলাকা। এর মধ্যে রয়েছে আলামেডা, আলবানি, বার্কলি, এমেরিভিল, ওকল্যান্ড, পিডমন্ট ও সান লিয়ান্দ্রো। এ অঞ্চলের সাত লাখের বেশি মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন লতিফা সাইমন।

এবারের নির্বাচনে একই আসনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমি জয়েসের মুখোমুখি হন তিনি। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে সাইমনের পুনর্নির্বাচিত হওয়ার খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে কংগ্রেসে তার প্রতিনিধিত্বের ধারাবাহিকতা বজায় থাকছে।

নাগরিক অধিকার আন্দোলন থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকার, পরিবহন খাত এবং জাতীয় আইনসভা—দীর্ঘ পথ পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন লতিফা সাইমন। তার পুনর্নির্বাচন দেশটির কংগ্রেসে মুসলিম প্রতিনিধিত্বের ধারাবাহিকতার পাশাপাশি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর কেমন হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া সম্পর্ক

মার্কিন নির্বাচনে ইতিহাস গড়তে যাচ্ছে যে ৪ ঘটনা

কংগ্রেস নির্বাচনে বড় ব্যবধানে এগিয়ে আফগান বংশোদ্ভূত আয়েশা ওয়াহাব

ইরান যুদ্ধ নিয়ে এবার প্রশ্ন তুলবে কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাটরা

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে রেকর্ড গড়লেন যেসব মুসলিম প্রার্থী

বিজয়ের পর প্রথম ভাষণে যা বললেন ইলহান ওমর

নিউইয়র্কের আইনসভায় প্রথম ফিলিস্তিনি মুসলিম নারী আবের কাওয়াস

রিপাবলিকানদের আসন কেড়ে ইলিনয় সিনেটে বিজয়ী নাবিলা সৈয়দ

নিউইয়র্কের প্রথম আফ্রো-লাতিনা মুসলিম কংগ্রেস সদস্য শেভালিয়ের

বিপুল ভোটের ব্যবধানে পুনর্নির্বাচিত মুসলিম কংগ্রেস সদস্য আন্দ্রে কারসন