যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শেষ মুহূর্তে বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর দেশটির পণ্যের ওপর সমপরিমাণ পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। ‘ডলার-ফর-ডলার’ নীতিতে এই শুল্ক আরোপ করা হবে বলে জানিয়েছে অটোয়া।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার মধ্যরাত থেকে যুক্তরাষ্ট্র কানাডীয় পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক কার্যকর করার পরপরই পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় কানাডা। এর আগে শুক্রবার রাতে নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার ঠিক আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা স্থগিতের ঘোষণা দেন কার্নি।
কার্নি বলেন, আলোচনার শেষ পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত শর্তে পরিবর্তন আনা হয়েছিল, যা কানাডার কাছে অন্যায্য ও অর্থনৈতিকভাবে অযৌক্তিক মনে হয়েছে। তার মতে, এ ধরনের পরিবর্তনের কারণে সম্ভাব্য চুক্তির নির্ভরযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
গত জুলাই থেকে দুই দেশের প্রতিনিধিরা বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে নিবিড় আলোচনা চালিয়ে আসছিলেন। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের কানাডীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন। পরে সাময়িকভাবে সেই শুল্ক স্থগিত করে তিনি জানিয়েছিলেন, দুই দেশ একটি পারস্পরিক লাভজনক চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছে।
তবে নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার কয়েক মিনিট আগে কার্নি জানান, আলোচনায় অগ্রগতি হলেও কানাডার প্রত্যাশা পূরণের মতো যথেষ্ট সমঝোতা হয়নি। ফলে আলোচকদের অটোয়ায় ফিরে আসার নির্দেশ দেন তিনি।
ওয়াশিংটনের পাল্টা অভিযোগ
কানাডার ঘোষণার পর মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার অভিযোগ করেন, সপ্তাহের শুরুতে যে শর্তে দুই পক্ষ সম্মত হয়েছিল, কানাডা শেষ পর্যন্ত সেই ভিত্তিতে চুক্তি চূড়ান্ত করতে রাজি হয়নি।
তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র কানাডাকে বড় বাণিজ্য অংশীদারদের মধ্যে সবচেয়ে অনুকূল শুল্ক সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু কানাডার নতুন কিছু দাবি এবং আগের কয়েকটি প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসার কারণে আলোচনায় তৈরি হওয়া সমঝোতা নষ্ট হয়ে যায়।
এর আগে আলোচনায় কানাডার ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর মার্কিন শুল্ক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ এবং কানাডীয় গাড়ির ওপর আরোপিত ২৫ শতাংশ শুল্ক কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার বিষয়টি আলোচনায় ছিল। বিনিময়ে কানাডার প্রদেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের মদ বিক্রির নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ার কথা ছিল।
বাড়ছে দুই দেশের বাণিজ্য উত্তেজনা
ট্রাম্প দ্বিতীয়বার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকেই দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক উত্তেজনা চলছে। নতুন করে আলোচনাও ব্যর্থ হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসন মহামন্দার সময়কার ১৯৩০ সালের ট্যারিফ অ্যাক্ট ব্যবহার করে কানাডীয় বিভিন্ন পণ্যের ওপর নতুন করে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা করছে। এর আওতায় ওয়াইন, দুগ্ধজাত পণ্য, সিমেন্ট, পোশাক ও হকি সরঞ্জামসহ বিভিন্ন পণ্য পড়তে পারে। পাশাপাশি কানাডার ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, গাড়ি ও কাঠের ওপর আগে থেকে থাকা মার্কিন শুল্কও বহাল থাকবে।
কানাডার সবচেয়ে বড় প্রদেশ অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড পাল্টা শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন। তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের জবাবও শুল্ক দিয়ে এবং ডলারের বিপরীতে ডলার দিয়ে দেওয়া উচিত।
এদিকে গত বছর মার্কিন শুল্কের প্রতিক্রিয়ায় কানাডার বেশ কয়েকটি প্রদেশ যুক্তরাষ্ট্রের মদ বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিও জানিয়ে আসছে ওয়াশিংটন।
কানাডার সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৩৬ শতাংশ নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের পাল্টা জবাব দেওয়ার পক্ষে। অন্যদিকে প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ মনে করেন, সরকারের আলোচনার পথেই থাকা উচিত।
তবে পাল্টা শুল্ক কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কানাডার সম্পর্কের উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ারও সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা শুল্ক আরোপের বিষয়টি মেনে নেবে না।
সূত্র: বিবিসি নিউজ
এসআর