হোম > বিশ্ব > আমেরিকা

ইরানের ১০০ বিলিয়ন ডলারের জব্দ সম্পদগুলো কী, কোথায় আছে

আমার দেশ অনলাইন

ইরানের রাজধানী তেহরানে একটি যুক্তরাষ্ট্র-বিরোধী বিলবোর্ডের সামনে ইরানের পতাকা হাতে নিয়ে এক ব্যক্তি বিজয় চিহ্ন দেখাচ্ছেন। ছবি: সংগৃহীত।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে দ্বিতীয় দফা আলোচনার গতি বাড়ার সাথে সাথে, একটি প্রধান বিষয় বিবাদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, আর তা হল অন্যান্য দেশে থাকা তেহরানের জব্দকৃত সম্পদ।

১০ এপ্রিল, পাকিস্তানে প্রথম দফা যুদ্ধবিরতি আলোচনা শুরু হওয়ার আগে, ইরানের সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এক্স-এ বলেন যে, যেকোনো আলোচনা শুরু হওয়ার আগে বিদেশি ব্যাংকে ইরানের জব্দকৃত সম্পদ অবশ্যই মুক্ত করতে হবে।

একদিন পর পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যুদ্ধবিরতি আলোচনায় কিছু প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, যেখানে বলা হয় যে ওয়াশিংটন দেশের বাইরে রাখা ইরানের অন্তত কিছু সম্পদ অবমুক্ত করতে সম্মত হয়েছে। কিন্তু মার্কিন সরকার দ্রুত সেই প্রতিবেদনগুলো নাকচ করে দিয়ে জোর দিয়ে বলে যে, ওই সম্পদগুলো এখনও অবরুদ্ধ রয়েছে।

কিন্তু ইরানের ঠিক কত সম্পদ অবরুদ্ধ রয়েছে, তেহরান কেন সেগুলো ব্যবহার করতে পারছে না, এই তহবিলগুলো বর্তমানে কোথায় আছে এবং এগুলো ইরানের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ইরানের অবরুদ্ধ সম্পদের পরিমাণ কত?

যদিও ইরানের অবরুদ্ধ সম্পদের সঠিক পরিমাণ অস্পষ্ট, তবে ইরানের সরকারি প্রতিবেদন এবং বিশেষজ্ঞরা বিদেশে অবরুদ্ধ ইরানি সম্পদের মোট পরিমাণ ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বলে নির্ধারণ করেছেন।

মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স-এর অনাবাসী সিনিয়র ফেলো ফ্রেডেরিক স্নাইডার আলজাজিরাকে বলেছেন যে, এই সম্পদের পরিমাণ হাইড্রোকার্বন বিক্রিত আয় থেকে ইরানের বার্ষিক আয়ের প্রায় চারগুণ।

তিনি বলেন, এটি একটি বিশাল অঙ্কের অর্থ, বিশেষ করে এমন একটি সমাজের জন্য যারা গত কয়েক দশক ধরেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার অধীনে আক্রান্ত।

তবে তিনি আরো বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এই সম্পদগুলো ছেড়ে দিলেও, সেগুলো কীভাবে ব্যবহার করা হবে তার ওপর কোনো শর্ত আরোপ করবে কিনা, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

বর্তমানে, যুদ্ধবিরতি আলোচনায় তেহরানের মূল দাবি হলো আস্থা তৈরির একটি পদক্ষেপ হিসেবে তাদের জব্দকৃত সম্পদের অন্তত ৬ বিলিয়ন ডলার মুক্ত করা।

জব্দকৃত সম্পদ কী?

যখন কোনো ব্যক্তি, কোম্পানি বা দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তহবিল, সম্পত্তি বা সিকিউরিটিজ অন্য কোনো দেশের কর্তৃপক্ষ বা কোনো বৈশ্বিক সংস্থা দ্বারা সাময়িকভাবে আটক করা হয়, তখন তাকে সম্পদ জব্দকরণ বলা হয়।

এটি নিষেধাজ্ঞা, আদালতের আদেশ বা অন্যান্য নিয়ন্ত্রক কারণে মালিকদের এই সম্পদ বিক্রি করার ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করে।

ইরানের সম্পদ কেন জব্দ করা হয়েছে?

মার্কিন সরকারের আর্কাইভ অনুসারে, প্রথম সম্পদ জব্দের ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৭৯ সালের নভেম্বরে, যখন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার বলেছিলেন যে ইরান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি এবং অর্থনীতির জন্য একটি অস্বাভাবিক ও অসাধারণ হুমকি।

সেই সময়, ইরানি ছাত্ররা তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে ৬৬ জন মার্কিন নাগরিককে জিম্মি করে রেখেছিল।

তৎকালীন ট্রেজারি সচিব উইলিয়াম মিলার সাংবাদিকদের বলেছিলেন যে, ইরানের তরল সম্পদের পরিমাণ ছিল ৬ বিলিয়ন ডলারেরও কম, আর এর বড় অংশটি ছিল ১.৩ বিলিয়ন ডলার।

যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশ কর্তৃক আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কারণে বছরের পর বছর ধরে ইরানের অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়েছে।

এই নিষেধাজ্ঞাগুলো ১৯৭৯ সাল থেকে আরোপ করা হয়েছে; প্রথমে ইসলামী বিপ্লবের পর তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে জিম্মি থাকা মার্কিন নাগরিকদের জন্য এবং পরে ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির কারণে তা আরো কঠোর করা হয়। এই পদক্ষেপগুলো তেহরানের নিজস্ব সম্পদ, যেমন বিদেশি ব্যাংকে জব্দকৃত তেল বিক্রির রাজস্ব, ব্যবহারের ক্ষমতাকে সীমিত করেছে।

১৯৮১ সালে, আলজেরিয়ার মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলজিয়ার্স চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর ফলে, ইরান তেহরানে আটক থাকা ৫২ জন আমেরিকান বন্দীকে মুক্তি দেওয়ার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র এই সম্পদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অবমুক্ত করে।

তবে, পরবর্তী বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্পর্ক আরো খারাপ হতে থাকে এবং তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটন উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে।

ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে যে, তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি শুধুমাত্র বেসামরিক জ্বালানির উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়, যদিও তারা এর জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে।

কোন কোন দেশে ইরানের জব্দকৃত সম্পদ রয়েছে?

ইরানের জব্দকৃত সম্পদ একাধিক দেশের কাছে রয়েছে। তবে বর্তমানে প্রতিটি দেশের কাছে ঠিক কী পরিমাণ অর্থ রয়েছে তা স্পষ্ট নয়, তবে ইরানের গণমাধ্যম পূর্বে জানিয়েছে যে, ইরানের তেলের গুরুত্বপূর্ণ গ্রাহক জাপানের কাছে প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার, ইরাকের প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার এবং চীনের কাছে অন্তত ২০ বিলিয়ন ডলার এবং ভারতের ৭ বিলিয়ন ডলার রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইরানের জব্দকৃত সম্পদ রয়েছে যার পরিমাণ প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে লুক্সেমবার্গের মতো ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে জব্দের পরিমাণ প্রায় ১.৬ বিলিয়ন ডলার।

এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারের কাছে রয়েছে জব্দকৃত সম্পদের প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার। তবে এই অর্থ দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ইরানকে পরিশোধ করার জন্য পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র তা আটকে দেয়।

ইরানের এই সম্পদগুলো অবমুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ কেন?

ইরানের অর্থনীতি সংকটে রয়েছে; বিশেষ করে গত কয়েক দশকের নিষেধাজ্ঞা দেশটির তেল রপ্তানিকে সীমিত করেছে এবং এর পাশাপাশি বিনিয়োগ আকর্ষণ ও শিল্প-প্রযুক্তি আধুনিকীকরণের ক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে, জব্দকৃত সম্পদগুলো হলো এমন নগদ অর্থ যা ইরান অনেক সহজেই ব্যবহার করতে পারত; যেখানে রয়েছে দেশটির ১০০ বিলিয়ন ডলার যা ইরানের জিডিপির প্রায় এক-চতুর্থাংশ।

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক ডিরেক্টর এবং ইরান বিষয়ে বিশেষজ্ঞ আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রভাষক রোক্সান ফারমানফারমাইয়ান আলজাজিরাকে বলেছেন যে, ইরানের সম্পদ অবমুক্ত করা দেশটির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হবে।

তিনি বলেন, ‘এর অর্থ হবে- তেল বিক্রি থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় অর্জিত তহবিল নিজ অর্থনীতিতে ফিরিয়ে আনতে পারা। এটি দেশটিকে তার মুদ্রার ওঠানামার ওপর নিয়ন্ত্রণ দেবে। আর এর ফলে ডিসেম্বর ২০২৫-এর মতো বিক্ষোভের ঝুঁকি এড়াতে সাহায্য করবে যার সূত্রপাত ঘটে মুদ্রার আকস্মিক পরিবর্তনের কারণে।’

ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ক্রিস ফেদারস্টোন আলজাজিরাকে জানিয়েছেন, ইরানের সম্পদ অবমুক্ত করা হবে কি না, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তা হিসেবেও কাজ করবে।

ফেদারস্টোন বলেন, ‘আন্তর্জাতিকভাবে, সম্পদ অবমুক্ত করা ইরানের অর্থনীতির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ কমার ইঙ্গিত দিতে পারে। এর ফলে অন্যান্য আন্তর্জাতিক পক্ষ এবং আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের সম্পৃক্ততা বাড়তে পারে, যা বাণিজ্য ও একীকরণকে উন্নত করবে।’

রাশিয়া-ইরানের তেলে দেওয়া ছাড় আর বাড়াচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্র

ইরানকে চাপে রাখতে নতুন নিষেধাজ্ঞা জারি যুক্তরাষ্ট্রের

যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুক হামলায় নিহত ১, গুরুতর আহত ১

অতীত ও বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন দেয়নি ন্যাটো, ভবিষ্যতেও দেবে না: ট্রাম্প

ইরানের সঙ্গে পুনরায় আলোচনা শুরুর ঘোষণা ট্রাম্পের, বিশ্ববাজারে ডলারের দরপতন

ইরান যুদ্ধ নিয়ে মেলোনির সাহসের অভাব রয়েছে: ট্রাম্প

ওয়াশিংটনে ইসরাইল-লেবানন বৈঠক নিয়ে যা জানা গেল

ইরান যুদ্ধের কভারেজে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের ক্ষোভ

ট্রাম্পের অবরোধ কৌশল ‘উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ রিয়েল এস্টেট ধাঁচের আলোচনা’

পোপকে নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্য ‘অগ্রহণযোগ্য’: ইতালির প্রধানমন্ত্রী