মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রকাশ্য বক্তব্য, সংবাদ সম্মেলন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে অশালীন ও গালিগালাজপূর্ণ ভাষার ব্যবহার ক্রমেই নিয়মিত হয়ে উঠছে। একসময় মার্কিন প্রেসিডেন্টদের ব্যক্তিগত কথাবার্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা এ ধরনের ভাষা এখন প্রকাশ্য রাজনৈতিক বক্তব্যেও জায়গা করে নিয়েছে। এর প্রভাব শুধু ট্রাম্পের ভাষাতেই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও পড়ছে বলে ভাষাবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন।
দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প প্রকাশ্যে এমন কিছু অশালীন শব্দ ব্যবহার করেছেন, যা এর আগে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের মুখে প্রকাশ্য রাজনৈতিক বক্তব্যে শোনা যায়নি। তার ভাষার এই ধরন এখন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক কথাবার্তার গ্রহণযোগ্যতার সীমাও বদলে দিচ্ছে।
ট্রাম্পের প্রকাশ্য অশালীন ভাষার অন্যতম আলোচিত ঘটনা ঘটে ২০২৫ সালের জুনে। ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধের পর যুদ্ধবিরতি নিয়ে কথা বলার সময় তিনি দুই দেশকে নিয়ে প্রকাশ্যে অশালীন শব্দ ব্যবহার করেন। এরপর একই বছরের অক্টোবরে ভেনেজুয়েলার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে নিয়েও একই ধরনের ভাষা ব্যবহার করেন।
চলতি বছরও তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে এমন ভাষা দেখা গেছে। এপ্রিল মাসে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ইরানকে উদ্দেশ করে দেওয়া এক পোস্টে তিনি অশালীন শব্দ ব্যবহার করে প্রণালি খুলে দেওয়ার দাবি জানান এবং তা না হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেন।
আগে যা ছিল ব্যক্তিগত, এখন প্রকাশ্য
মার্কিন রাজনীতিতে অশালীন ভাষার ব্যবহার অবশ্য নতুন নয়। সাবেক প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি. জনসন ও রিচার্ড নিক্সন ব্যক্তিগত কথাবার্তায় এ ধরনের ভাষা ব্যবহারের জন্য পরিচিত ছিলেন। তবে তাদের ক্ষেত্রে এসব বক্তব্য মূলত গোপন রেকর্ডিং প্রকাশের পর জনসমক্ষে আসে।
২০০০ সালের নির্বাচনী প্রচারে জর্জ ডব্লিউ বুশের একটি অশালীন মন্তব্য সরাসরি মাইক্রোফোনে ধরা পড়ার পর তিনি প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। তখন রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে প্রকাশ্য বক্তব্যে শালীন ভাষা প্রত্যাশা করা হতো।
ট্রাম্পের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। তিনি অশালীন শব্দ ব্যবহারের জন্য ক্ষমা চাওয়ার পরিবর্তে অনেক সময় সেটিকে তার বক্তব্যের স্বাভাবিক অংশ হিসেবেই ব্যবহার করছেন। ফলে রাজনৈতিক ভাষায় পুরোনো সামাজিক নিষেধাজ্ঞাগুলো দুর্বল হচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন।
‘সাধারণ মানুষের মতো’ শোনানোর কৌশল
ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি ব্লুমিংটনের ইংরেজি ভাষার অধ্যাপক মাইকেল অ্যাডামস, যিনি অশালীন ভাষার ব্যবহার নিয়ে গবেষণা করেছেন, গার্ডিয়ানকে বলেন, ট্রাম্পের গালিগালাজের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। এর একটি হলো নিজের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে জোরালো ও অনির্দেশ্য হিসেবে তুলে ধরা; অন্যটি হলো প্রচলিত রাজনৈতিক শিষ্টাচারের প্রতি তিনি খুব বেশি গুরুত্ব দেন না—এমন একটি ভাবমূর্তি তৈরি করা।
ট্রিনিটি কলেজ ডাবলিনের মার্কিন রাজনীতি বিষয়ক অধ্যাপক জোসেফ ফিলিপসের মতে, রাজনীতিবিদদের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাওয়ার সঙ্গে এই প্রবণতার সম্পর্ক রয়েছে। সাধারণ মানুষের ভাষা ব্যবহার করে রাজনীতিবিদরা নিজেদের আরও ‘আপনজন’ হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছেন বলে তিনি মনে করেন।
অর্থাৎ অশালীন ভাষা শুধু রাগ প্রকাশের মাধ্যম নয়; রাজনৈতিক যোগাযোগের একটি কৌশল হিসেবেও এটি ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রচলিত রাজনৈতিক ভাষার চেয়ে বেশি সরাসরি, উত্তেজনাপূর্ণ ও অনানুষ্ঠানিক ভাষা ব্যবহার করে নেতারা সমর্থকদের সঙ্গে আবেগগত যোগাযোগ তৈরি করার চেষ্টা করছেন।
ট্রাম্প একা নন
এই প্রবণতা শুধু ট্রাম্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও বক্তৃতা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশালীন শব্দ ব্যবহার করেছেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও সামরিক বাহিনীর কিছু পুরোনো নীতির সমালোচনা করতে অশালীন শব্দ ব্যবহার করেছেন।
ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতাদের মধ্যেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। মিনিয়াপোলিসের মেয়র জ্যাকব ফ্রে অভিবাসন ও সীমান্তরক্ষী সংস্থার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অশালীন ভাষা ব্যবহার করেছেন। ইলিনয়ের ডেমোক্র্যাট সিনেটর ট্যামি ডাকওয়ার্থও সম্প্রতি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নীতির সমালোচনায় একই ধরনের ভাষা ব্যবহার করেছেন।
অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিভাজন যত তীব্র হচ্ছে, রাজনৈতিক বক্তব্যেও তত বেশি আক্রমণাত্মক ও অনানুষ্ঠানিক ভাষা ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
রাজনৈতিক শিষ্টাচার কি বদলে যাচ্ছে?
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, সান দিয়েগোর জ্ঞানবিজ্ঞান অধ্যাপক বেঞ্জামিন বার্গেনের মতে, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে তীব্র রাজনৈতিক মতবিরোধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে আগে যেসব জায়গায় অশালীন ভাষা অকল্পনীয় ছিল, সেখানেও ভবিষ্যতে এ ধরনের শব্দ ব্যবহারের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। তাঁর মতে, রাজনৈতিক ভাষার প্রচলিত সামাজিক নিয়মই পরিবর্তিত হচ্ছে।
তবে এই পরিবর্তন স্থায়ী হবে কি না, তা নিশ্চিত নয়। অধ্যাপক বার্গেনের মতে, কোনো এক প্রজন্মের রাজনীতিবিদ অতিরিক্ত অশালীন ভাষা ব্যবহার করলে পরবর্তী প্রজন্ম তার বিপরীত প্রতিক্রিয়াও দেখাতে পারে। অর্থাৎ রাজনৈতিক ভাষা আবার শালীনতার দিকে ফিরে যেতে পারে।
ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড বনাম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির গুরুত্বও এই প্রবণতার পেছনে কাজ করছে। ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি তৈরি এবং সরাসরি ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ এখন রাজনৈতিক নেতাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ফিলিপসের মতে, যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ডের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ব্র্যান্ড তৈরির সুযোগ বেশি। ফলে প্রচলিত রাজনৈতিক আচরণ থেকে বেরিয়ে এসে নিজের আলাদা ভাবমূর্তি তৈরির প্রণোদনাও মার্কিন রাজনীতিবিদদের মধ্যে বেশি।
ট্রাম্পের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি আরও স্পষ্ট। তার রাজনৈতিক পরিচয়ের একটি অংশ হলো প্রচলিত রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও প্রতিষ্ঠিত রীতির বাইরে অবস্থান নেওয়া। অশালীন ভাষা সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক যোগাযোগেরই একটি অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
গণমাধ্যমের সঙ্গেও উত্তেজনা
ট্রাম্পের ভাষার এই পরিবর্তনের সঙ্গে গণমাধ্যমের সঙ্গে তার সম্পর্কের টানাপোড়েনও যুক্ত হয়েছে। ২৬ সেপ্টেম্বর এক নারী সাংবাদিক তার কাছে জানতে চান, তিনি শুধু তাকে সমর্থন করে এমন সংবাদমাধ্যমকেই হোয়াইট হাউসের প্রেস পুলে রাখতে চান কি না। ট্রাম্প প্রশ্নের জবাবে ওই সাংবাদিককে ‘চুপ থাকতে’ বলেন এবং সংবাদমাধ্যমটির বিরুদ্ধে তার পুরোনো অভিযোগ পুনর্ব্যক্ত করেন।
এর আগে ট্রাম্প একাধিক সংবাদমাধ্যমকে ‘ফেক নিউজ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তার দ্বিতীয় মেয়াদে সমালোচনামূলক সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে তার প্রকাশ্য বিরোধ আরও দৃশ্যমান হয়েছে।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে অশালীন ভাষা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। ট্রাম্পের প্রকাশ্য বক্তব্য থেকে শুরু করে তার প্রশাসনের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা এবং বিরোধী দলের কিছু নেতার বক্তব্যেও এ ধরনের ভাষা ব্যবহারের নজির রয়েছে।
ভাষাবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এর পেছনে রাজনৈতিক মেরুকরণ, রাজনীতিবিদদের প্রতি মানুষের আস্থার সংকট, সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিজেকে ঘনিষ্ঠ দেখানোর চেষ্টা এবং ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ব্র্যান্ড তৈরির প্রবণতা কাজ করছে। তবে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মার্কিন রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপর কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
ট্রাম্পের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো—যে ভাষা একসময় মার্কিন প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত কথাবার্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা ছিল, সেটিই এখন প্রকাশ্য রাজনৈতিক যোগাযোগের অংশ হয়ে উঠেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে শুধু নীতি ও মতাদর্শ নয়, রাজনৈতিক ভাষার গ্রহণযোগ্য সীমাও নতুন করে বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে।