হোম > বিশ্ব > এশিয়া

কীভাবে শূন্য থেকে সমৃদ্ধির শিখরে ছোট্ট সিঙ্গাপুর

আনিসুর রহমান এরশাদ

প্রাকৃতিক সম্পদ নেই, বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার নেই, স্বাধীনতার সময় ছিল বেকারত্ব, আবাসনসংকট, জাতিগত উত্তেজনা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। এমনকি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকা নিয়েও ছিল সংশয়। অথচ মাত্র কয়েক দশকের ব্যবধানে সিঙ্গাপুর পরিণত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কেন্দ্র, উন্নত নগররাষ্ট্র এবং দক্ষ প্রশাসনের দৃষ্টান্তে।

কীভাবে সম্ভব হলো এই রূপান্তর?

লি কুয়ান ইউর আত্মজীবনী ‘দ্য সিঙ্গাপুর স্টোরি’ এবং তার পরবর্তী গ্রন্থ ‘ফ্রম থার্ড ওয়ার্ল্ড টু ফার্স্ট’-এর অভিজ্ঞতা, ইতিহাস, অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান ও আন্তর্জাতিক গবেষণার আলোকে উঠে আসে এক অসাধারণ রাষ্ট্র নির্মাণের কাহিনি। একটি দেশের ভাগ্য কি বদলে দেওয়া সম্ভব? রাজনৈতিক অস্থিরতা, সীমিত সম্পদ, দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও জাতিগত বিভাজনের মধ্যেও কি গড়ে তোলা যায় একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্র? সিঙ্গাপুরের ইতিহাস এই প্রশ্নগুলোর একটি বাস্তব উত্তর।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালয় উপদ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত ছোট্ট দ্বীপদেশ সিঙ্গাপুর। আয়তন, জনসংখ্যা ও প্রাকৃতিক সম্পদের বিচারে দেশটি অনেক রাষ্ট্রের তুলনায় ক্ষুদ্র। কিন্তু অর্থনীতি, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, শিক্ষা, নগর ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও প্রশাসনিক দক্ষতার বিচারে তার অবস্থান বিশ্বপরিসরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, সিঙ্গাপুরের মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন প্রায় ৯৮ হাজার ৮১৪ মার্কিন ডলার। দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন প্রায় ৬০৪ বিলিয়ন ডলার। অথচ স্বাধীনতার সময় দেশটি ছিল বেকারত্ব, দারিদ্র্য, দুর্বল অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় আক্রান্ত।

এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে ছিলেন সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ। তবে সিঙ্গাপুরের উত্থানকে শুধু একজন নেতার সাফল্য হিসেবে দেখলে ইতিহাসের বড় একটি অংশ বাদ পড়ে যাবে। তার পাশাপাশি ছিলেন দক্ষ অর্থনীতিবিদ, প্রশাসক, পরিকল্পনাবিদ, প্রকৌশলী, শিক্ষাবিদ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণে নিবেদিত একঝাঁক নেতৃত্ব। তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তৈরি হয়েছিল আধুনিক সিঙ্গাপুর।

বইটির ইতিহাস ও রাষ্ট্র নির্মাণের প্রেক্ষাপট

লি কুয়ান ইউর ‘দ্য সিঙ্গাপুর স্টোরি: মেমোয়ার্স অব লি কুয়ান ইউ’ প্রকাশিত হয় ১৯৯৮ সালে। প্রায় ৬৮০ পৃষ্ঠার এই প্রথম খণ্ডে তার শৈশব, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, জাপানি দখলদারত্ব, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, আইন পেশা, রাজনৈতিক আন্দোলন, পিপলস অ্যাকশন পার্টির উত্থান, মালয়েশিয়ার সঙ্গে একীভূত হওয়া এবং ১৯৬৫ সালে সিঙ্গাপুরের স্বাধীনতা পর্যন্ত ঘটনাবলি তুলে ধরা হয়েছে।

এখানে একটি গ্রন্থগত বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। ‘দ্য সিঙ্গাপুর স্টোরি’ মূলত স্বাধীনতার আগের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক পটভূমির বিবরণ। স্বাধীনতার পর ১৯৬৫ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে তার দ্বিতীয় আত্মজীবনী ‘ফ্রম থার্ড ওয়ার্ল্ড টু ফার্স্ট: দ্য সিঙ্গাপুর স্টোরি ১৯৬৫–২০০০’ গ্রন্থে। সুতরাং সিঙ্গাপুরের পূর্ণাঙ্গ উন্নয়নযাত্রা বুঝতে দুটি বইকেই পাশাপাশি পড়া প্রয়োজন।

লি কুয়ান ইউর এই দুটি বইয়ের বিশেষত্ব হলো, তিনি রাষ্ট্র নির্মাণকে কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যাখ্যা করেননি। বরং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, প্রশাসনিক সংস্কার, সামাজিক শৃঙ্খলা, শিক্ষা, আবাসন, বিনিয়োগ এবং জাতীয় পরিচয় নির্মাণের পারস্পরিক সম্পর্ক তুলে ধরেছেন।

তবে এটি একজন রাষ্ট্রনায়কের নিজের লেখা স্মৃতিকথা। ফলে এতে তার সিদ্ধান্তের পক্ষে আত্মপক্ষসমর্থন, নিজের ভূমিকার মূল্যায়ন এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। তাই বইটিকে গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক ঐতিহাসিক উৎস হিসেবে গ্রহণ করলেও এর বক্তব্য স্বাধীন গবেষণা ও অন্যান্য ঐতিহাসিক সূত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

স্বাধীনতা যখন আশীর্বাদের পাশাপাশি অস্তিত্বের সংকট

সিঙ্গাপুরের আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তারিখ ৯ আগস্ট ১৯৬৫। এদিন মালয়েশিয়ার ফেডারেশন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সিঙ্গাপুর স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

১৯৬৩ সালে সিঙ্গাপুর মালয়েশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতা, জাতিগত প্রতিনিধিত্ব, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং জাতীয় পরিচয় নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ ক্রমেই বাড়তে থাকে। বিশেষ করে মালয়েশিয়ার নেতৃত্ব ও সিঙ্গাপুরের পিপলস অ্যাকশন পার্টির মধ্যে বহুজাতিক রাষ্ট্রের কাঠামো নিয়ে মতপার্থক্য প্রকট হয়।

লি কুয়ান ইউ একটি জাতিগত পরিচয়ভিত্তিক রাষ্ট্রের পরিবর্তে মালয়, চীনা, ভারতীয়সহ সব জনগোষ্ঠীর সমান নাগরিকত্বের ভিত্তিতে মালয়েশিয়া গড়ে তোলার পক্ষে ছিলেন। অন্যদিকে মালয়েশিয়ার কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব মালয় জনগোষ্ঠীর বিশেষ সাংবিধানিক অবস্থান বজায় রাখতে চেয়েছিল। রাজনৈতিক বিরোধের পরিণতিতে সিঙ্গাপুরকে ফেডারেশন থেকে পৃথক করা হয়।

স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার সময় লি কুয়ান ইউ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন। কারণ তিনি জানতেন, এটি শুধু একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম নয়; বরং এমন একটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব গ্রহণ, যার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে গভীর অনিশ্চয়তা রয়েছে।

সিঙ্গাপুরের ছিল না নিজস্ব খাদ্য ও পানির পর্যাপ্ত উৎস। শিল্পকারখানা সীমিত, বেকারত্ব বেশি, আবাসন পরিস্থিতি ভয়াবহ এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল। মালয়েশিয়ার সঙ্গে বিচ্ছেদের ফলে বড় অভ্যন্তরীণ বাজার ও অর্থনৈতিক পশ্চাৎভূমি হারিয়ে যায়। এর ওপর ১৯৬৮ সালে ব্রিটিশ সরকার সিঙ্গাপুর থেকে সামরিক ঘাঁটি প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। এতে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান এবং অর্থনীতির একটি বড় অংশ ঝুঁকির মুখে পড়ে।

ব্রিটিশ সামরিক উপস্থিতি সিঙ্গাপুরের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ছিল। ফলে স্বাধীনতার কয়েক বছরের মধ্যেই আরেকটি বড় সংকট সামনে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ঐতিহাসিক নথি এবং সিঙ্গাপুরের জাতীয় আর্কাইভের দলিল থেকে স্বাধীনতার পেছনের রাজনৈতিক বিরোধ ও তৎকালীন পরিস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়।

এখানে সিঙ্গাপুরের প্রথম বড় শিক্ষা হলো, সংকটকে অস্বীকার না করে বাস্তবতা স্বীকার করা এবং দ্রুত বিকল্প পথ তৈরি করা। নেতৃত্ব বুঝতে পেরেছিল, দেশটির টিকে থাকার জন্য প্রচলিত অর্থনৈতিক কাঠামো যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সম্পূর্ণ নতুন উন্নয়ন কৌশল।

প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, ভৌগোলিক অবস্থানকে সম্পদে পরিণত করা

সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতাগুলোর একটি ছিল প্রাকৃতিক সম্পদের অভাব। কিন্তু দেশটির একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা ছিল ভৌগোলিক অবস্থান। ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরকে সংযুক্তকারী গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের কাছে অবস্থিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা ছিল।

লি কুয়ান ইউ ও তার সহকর্মীরা এই ভৌগোলিক সুবিধাকে অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত করার সিদ্ধান্ত নেন। তারা বুঝতে পেরেছিলেন, ছোট অভ্যন্তরীণ বাজারের ওপর নির্ভর করে সিঙ্গাপুরের উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই স্থানীয় বাজারের পরিবর্তে আন্তর্জাতিক বাজারকে লক্ষ্য করে শিল্পায়ন ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন উপপ্রধানমন্ত্রী ও অর্থনীতিবিদ ড. গোহ কেং সুই। তার নেতৃত্বে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট বোর্ড। এর দায়িত্ব ছিল বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা, শিল্পকারখানা স্থাপনের পরিবেশ তৈরি করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনার আধুনিক জ্ঞান দেশে নিয়ে আসা।

প্রাথমিক পর্যায়ে শ্রমঘন শিল্পকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। কারণ তখন সবচেয়ে জরুরি সমস্যা ছিল বেকারত্ব। তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, ইলেকট্রনিকস সংযোজন এবং বিভিন্ন উৎপাদনশিল্পে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা হয়।

পরবর্তী সময়ে সিঙ্গাপুর নিম্নমূল্যের উৎপাদন থেকে ধীরে ধীরে উচ্চপ্রযুক্তির শিল্প, পেট্রোকেমিক্যাল, ওষুধ, সেমিকন্ডাক্টর, আর্থিক সেবা এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হয়। দেশটির সরকার বিদেশি কোম্পানিকে শুধু করছাড় দেয়নি; বরং জমি, অবকাঠামো, দক্ষ শ্রমিক, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, বন্দরসেবা এবং প্রশাসনিক সহায়তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছে।

বিশ্বব্যাংকের ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৬৫ থেকে ১৯৭০ সালের মধ্যে সিঙ্গাপুরের মোট দেশজ উৎপাদন প্রায় ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল। এই প্রবৃদ্ধির পেছনে শিল্পায়ন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং নতুন কর্মসংস্থান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সিঙ্গাপুরের জাতীয় উন্নয়নবিষয়ক সরকারি প্ল্যাটফর্ম এসজি১০১-এর তথ্য অনুযায়ী, সত্তরের দশকের মধ্যেই দেশটি প্রায় পূর্ণ কর্মসংস্থানের কাছাকাছি পৌঁছে যায়।

এই অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, শুধু বিদেশি বিনিয়োগ আহ্বান করলেই হবে না। বিনিয়োগকারীর প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, দক্ষ শ্রমিক, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, দ্রুত প্রশাসনিক সেবা, চুক্তির নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠান: ব্যক্তির সততা নয়, ব্যবস্থার জবাবদিহি

সিঙ্গাপুরের উন্নয়নের অন্যতম আলোচিত ভিত্তি দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ। দেশটির নেতৃত্ব উপলব্ধি করেছিল, দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসন দিয়ে বিনিয়োগ আকর্ষণ, শিল্পায়ন কিংবা দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সম্ভব নয়।

তবে সিঙ্গাপুরের দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থা লি কুয়ান ইউ ক্ষমতায় আসার পর শূন্য থেকে শুরু হয়নি। ১৯৫২ সালে দুর্নীতি তদন্ত ব্যুরো বা সিপিআইবি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৬০ সালে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন প্রণয়ন করে এর আইনি ক্ষমতা ও প্রয়োগের ভিত্তি শক্তিশালী করা হয়।

এই আইনের আওতায় সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের দুর্নীতিকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ঘুষের সংজ্ঞাও বিস্তৃত করা হয়েছে। শুধু নগদ অর্থ নয়, উপহার, চাকরি, চুক্তি, সুবিধা কিংবা অন্য কোনো প্রতিদানও দুর্নীতির অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

দুর্নীতি তদন্ত ব্যুরোকে তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়। সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তদন্তের সুযোগ রাখা হয়। রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রশাসনিক পদমর্যাদাকে আইনের ঊর্ধ্বে স্থান না দেওয়ার নীতিও গুরুত্ব পায়।

এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। সিঙ্গাপুর সরকারি চাকরিকে পেশাগতভাবে আকর্ষণীয় করার জন্য দক্ষতা, যোগ্যতা ও প্রতিযোগিতামূলক বেতন কাঠামো গড়ে তোলে। উদ্দেশ্য ছিল মেধাবীদের প্রশাসনে আকৃষ্ট করা এবং অবৈধ আয়ের প্রলোভন কমানো।

তবে উচ্চ বেতনই দুর্নীতির সমাধান নয়। এর সঙ্গে প্রয়োজন কার্যকর তদন্ত, বিচার, সম্পদের হিসাব, স্বচ্ছ নিয়োগ এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত প্রতিষ্ঠান।

সিঙ্গাপুরের দুর্নীতি তদন্ত ব্যুরোর ২০২৬ সালে হালনাগাদ করা ঐতিহাসিক বিবরণ এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের সরকারি ব্যাখ্যা থেকে এই কাঠামোর বিবর্তন বোঝা যায়।

বাংলাদেশের জন্য এখানকার শিক্ষা অত্যন্ত সরাসরি। দুর্নীতিবিরোধী বক্তব্য দিয়ে দুর্নীতি দূর করা যায় না। প্রয়োজন এমন প্রতিষ্ঠান, যেখানে ক্ষমতাবান ব্যক্তি ও সাধারণ নাগরিকের জন্য একই আইন কার্যকর হবে। তদন্তকারী সংস্থার স্বাধীনতা, সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা, সম্পদের হিসাব, আদালতের কার্যকারিতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন ছাড়া দুর্নীতিবিরোধী অভিযান দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

আবাসন বিপ্লব: রাষ্ট্রের উন্নয়ন মানে মানুষের মাথার ওপর ছাদ

সিঙ্গাপুরের উন্নয়ন কাহিনির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো আবাসনব্যবস্থা। স্বাধীনতার আগে দেশটির বড় জনগোষ্ঠী অস্বাস্থ্যকর বস্তি, ঘিঞ্জি বসতি ও অস্থায়ী ঘরে বসবাস করত। বিশুদ্ধ পানি, পয়োনিষ্কাশন এবং স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশের অভাব ছিল প্রকট। ফলে আবাসন শুধু সামাজিক সমস্যা ছিল না; এটি জনস্বাস্থ্য, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পর্কিত ছিল।

১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় হাউজিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বোর্ড বা এইচডিবি। সংস্থাটির দায়িত্ব ছিল দ্রুত পরিকল্পিত আবাসন নির্মাণ এবং বস্তিবাসীদের স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থানে স্থানান্তর করা। প্রতিষ্ঠার মাত্র তিন বছরের মধ্যে সংস্থাটি ২১ হাজারের বেশি আবাসন ইউনিট নির্মাণ করে। ১৯৬৪ সালে চালু হয় হোম ওনারশিপ ফর দ্য পিপল কর্মসূচি। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে ভর্তুকিমূল্যে ফ্ল্যাট কেনার সুযোগ দেওয়া হয়।

১৯৬৮ সালে সেন্ট্রাল প্রভিডেন্ট ফান্ডের সঞ্চয় আবাসন কেনার কাজে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়। এতে কর্মজীবী মানুষ নিজেদের বাধ্যতামূলক সঞ্চয়ের অর্থ ব্যবহার করে বাড়ির মালিক হতে পারেন। পরবর্তী সময়ে আবাসন প্রকল্পগুলো শুধু থাকার জায়গা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্কুল, বাজার, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, খেলার মাঠ, পরিবহন, কমিউনিটি সেন্টার ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা।

জাতিগত বিভাজন কমাতেও আবাসননীতি ব্যবহার করা হয়েছে। ১৯৮৯ সালে চালু হয় ইথনিক ইন্টিগ্রেশন পলিসি। এর উদ্দেশ্য ছিল সরকারি আবাসন এলাকায় কোনো একটি জাতিগোষ্ঠীর অতিরিক্ত ঘনত্ব তৈরি হতে না দেওয়া এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ বৃদ্ধি করা। বর্তমানে সিঙ্গাপুরের প্রায় ৮০ শতাংশ বাসিন্দা এইচডিবির নির্মিত আবাসনে বসবাস করেন। তাদের বড় অংশ নিজেদের বসবাসের ফ্ল্যাটের মালিক।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক দর্শন কাজ করেছে। নাগরিকের নিজের বাড়ি থাকলে শুধু তার জীবনযাত্রার মান বাড়ে না; রাষ্ট্রের সঙ্গে তার অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্কও দৃঢ় হয়। নিজের বাড়ি, সঞ্চয় ও ভবিষ্যৎ সম্পদের সঙ্গে নাগরিকের এক ধরনের অংশীদারত্ব তৈরি হয়।

বাংলাদেশে আবাসন সংকট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বস্তি, ভাড়া বৃদ্ধি এবং নিম্ন আয়ের মানুষের বাসস্থানের সমস্যা মোকাবিলায় সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। তবে বাংলাদেশের জনসংখ্যা, ভূমির মালিকানা, আয় ও নগর কাঠামো ভিন্ন। তাই হুবহু অনুকরণ নয়, বরং পরিকল্পিত সরকারি আবাসন, দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জন্য সাশ্রয়ী বাসস্থানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

শিক্ষা ও দক্ষ জনশক্তি: উন্নয়নের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ

সিঙ্গাপুরের নেতৃত্ব খুব দ্রুত বুঝতে পেরেছিল, প্রাকৃতিক সম্পদ না থাকলেও মানুষের দক্ষতাকে জাতীয় সম্পদে পরিণত করা যায়। স্বাধীনতার পর শিক্ষাব্যবস্থাকে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার বিস্তার, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, কারিগরি শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

শিক্ষার ভাষা, পাঠ্যক্রম ও দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে ইংরেজিকে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা হয়। পাশাপাশি মাতৃভাষা শিক্ষার ব্যবস্থাও রাখা হয়। চীনা, মালয় ও তামিল ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় ধরে রাখার সুযোগ দেওয়া হয়। এই দ্বিভাষিক শিক্ষানীতি একদিকে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও প্রযুক্তির সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করে, অন্যদিকে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষায় সহায়তা করে।

শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা নয়, শিল্পকারখানার প্রয়োজন অনুযায়ী কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষারও সম্প্রসারণ করা হয়। কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে।

পরবর্তী সময়ে সিঙ্গাপুরের শিক্ষাব্যবস্থা গবেষণা, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি এবং জীবনব্যাপী দক্ষতা উন্নয়নের দিকে অগ্রসর হয়। ২০১৫ সালে চালু হওয়া স্কিলসফিউচার কর্মসূচির মাধ্যমে নাগরিকদের কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে নতুন দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করা হয়।

বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের মানবসম্পদ সূচক প্লাসে সিঙ্গাপুরের অবস্থান বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর মধ্যে। এর পেছনে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দক্ষতা উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ভূমিকা রয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য এর তাৎপর্য গভীর। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় সনদ অর্জনের প্রবণতা বেশি; কিন্তু চাকরির বাজার, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি, গবেষণা ও উদ্যোক্তা তৈরির সঙ্গে শিক্ষার সংযোগ আরো শক্তিশালী করা প্রয়োজন। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়িয়ে উন্নত মানবসম্পদ তৈরি করা যায় না। প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষা, দক্ষ শিক্ষক, গবেষণার পরিবেশ এবং কর্মসংস্থানমুখী প্রশিক্ষণ।

দক্ষ প্রশাসন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা

সিঙ্গাপুরের উন্নয়নের পেছনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তি ছিল প্রশাসনিক দক্ষতা। দেশটির নেতৃত্ব প্রশাসনকে রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তে পেশাগত যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে।

সরকারি সংস্থাগুলোর দায়িত্ব নির্দিষ্ট করা হয়েছে। উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা হয়েছে। পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

সিঙ্গাপুরের প্রশাসনিক ব্যবস্থার একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। নগর উন্নয়ন, পরিবহন, পানি, বিদ্যুৎ, আবাসন, শিল্পায়ন ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনাকে বিচ্ছিন্ন বিষয় হিসেবে দেখা হয়নি। একটি খাতের সিদ্ধান্ত অন্য খাতের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

উদাহরণ হিসেবে শহরের ভূমি ব্যবস্থাপনা ও পরিবহন পরিকল্পনার কথা বলা যায়। সীমিত ভূমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে আবাসিক এলাকা, শিল্পাঞ্চল, বন্দর, বিমানবন্দর ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রের মধ্যে পরিকল্পিত সম্পর্ক তৈরি করা হয়েছে।

এমনকি পানি ব্যবস্থাপনাও জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। মালয়েশিয়া থেকে পানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পুনর্ব্যবহারযোগ্য পানি উৎপাদন এবং সমুদ্রের পানি লবণমুক্ত করার প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করা হয়েছে। এই পরিকল্পনার ফলে সিঙ্গাপুর পানি নিরাপত্তা ও নগর ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।

এখানে উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, রাষ্ট্রের নীতি যেন সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পূর্ণ পাল্টে না যায়। জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজনীয় প্রকল্প, অবকাঠামো ও মানবসম্পদ উন্নয়নের পরিকল্পনায় ধারাবাহিকতা থাকতে হবে।

বহুজাতিক সমাজে জাতীয় ঐক্য: পরিচয়ের পার্থক্যকে শক্তিতে পরিণত করা

সিঙ্গাপুরের জনগোষ্ঠী মূলত চীনা, মালয়, ভারতীয় এবং অন্যান্য জাতিগত সম্প্রদায়ের সমন্বয়ে গঠিত। ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি ও ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার পার্থক্য দেশটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।

বিশেষ করে স্বাধীনতার আগে জাতিগত উত্তেজনা ও দাঙ্গা রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলেছিল। ১৯৬৪ সালে মালয় ও চীনা সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ ঘটে।

লি কুয়ান ইউর নেতৃত্ব উপলব্ধি করেছিল, জাতিগত সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করলে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না। তাই নাগরিকত্বের ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়।

ইংরেজিকে সাধারণ প্রশাসনিক ও শিক্ষাগত যোগাযোগের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মাতৃভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণের ব্যবস্থাও রাখা হয়।

রাষ্ট্রীয় আবাসন, শিক্ষা, প্রশাসন ও কর্মসংস্থানে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা হয়। ১৯৬৫ সালের স্বাধীনতার ঘোষণাতেও একটি বহুজাতিক ও বহুসাংস্কৃতিক রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যয় প্রকাশ পেয়েছিল।

সিঙ্গাপুরের জাতীয় আর্কাইভে সংরক্ষিত স্বাধীনতার ঘোষণা এবং দেশটির রাষ্ট্রীয় ইতিহাসবিষয়ক প্রকাশনায় এই নীতির ঐতিহাসিক ভিত্তি পাওয়া যায়।

বাংলাদেশের জন্যও এই অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। ধর্ম, ভাষা, জাতিগত পরিচয়, অঞ্চল কিংবা রাজনৈতিক মতপার্থক্য যেন নাগরিক অধিকার ও রাষ্ট্রীয় সুযোগের ক্ষেত্রে বৈষম্যের কারণ না হয়। জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন ন্যায়বিচার, সমান মর্যাদা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা।

বন্দর, বিমানবন্দর ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের শক্তি

সিঙ্গাপুরের উন্নয়নের আরেকটি বড় ভিত্তি আন্তর্জাতিক যোগাযোগব্যবস্থা। দেশটি তার ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যকেন্দ্র এবং পুনঃরপ্তানি বন্দরে পরিণত হয়েছে।

সিঙ্গাপুর বন্দর শুধু আমদানি-রপ্তানির কেন্দ্র নয়; আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পণ্য এখানে এসে অন্য দেশে পুনরায় পাঠানো হয়।

বিমান পরিবহনেও সিঙ্গাপুরের অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী। চাঙ্গি বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এর সঙ্গে রয়েছে উন্নত সড়ক, রেল, বন্দর, গুদাম ও ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থা।

বিশ্বব্যাংকের ২০২৩ সালের লজিস্টিকস পারফরম্যান্স সূচকে সিঙ্গাপুর প্রথম স্থান অর্জন করেছিল। দেশটির বন্দর প্রতিবছর তিন কোটির বেশি বিশ-ফুট সমমানের কনটেইনার পরিচালনা করে।

এখানে সিঙ্গাপুরের কৌশল ছিল, শুধু পণ্য পরিবহন নয়, বরং পরিবহনকে কেন্দ্র করে আর্থিক সেবা, বীমা, আন্তর্জাতিক ব্যবসা, গুদামজাতকরণ, প্রযুক্তি ও সরবরাহব্যবস্থার একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা।

বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, পায়রা বন্দর এবং বিমান পরিবহন খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে এই অভিজ্ঞতা বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে বন্দর নির্মাণের পাশাপাশি কাস্টমসের দক্ষতা, পণ্য খালাসের সময়, পরিবহন সংযোগ, বিনিয়োগকারীর আস্থা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।

সাফল্যের আড়ালে যে বিতর্ক ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে

সিঙ্গাপুরের উন্নয়নকে মূল্যায়ন করতে গেলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। অর্থনৈতিক সাফল্য এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা একই বিষয় নয়।

লি কুয়ান ইউর শাসনামলে রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধীদের কার্যক্রম, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, সমাবেশ ও মতপ্রকাশের অধিকার নিয়ে দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থার সমালোচনা রয়েছে।

ফ্রিডম হাউসের ২০২৬ সালের ‘ফ্রিডম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ প্রতিবেদনে সিঙ্গাপুরকে ১০০-এর মধ্যে ৪৮ নম্বর দিয়ে ‘পার্টলি ফ্রি’ বা আংশিক স্বাধীন হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে দীর্ঘদিন ধরে পিপলস অ্যাকশন পার্টির আধিপত্য এবং বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনেও মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

এ ছাড়া দেশটিতে অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার, আয়বৈষম্য, আবাসনের ব্যয়, প্রবীণ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা এবং জনসংখ্যার বার্ধক্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

সুতরাং সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা থেকে প্রশাসনিক দক্ষতা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষা, শিল্পায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে; কিন্তু রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার সংকুচিত করে উন্নয়ন অর্জনের ধারণাকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়।

একটি সফল রাষ্ট্রের প্রকৃত মানদণ্ড শুধু মাথাপিছু আয় কিংবা অবকাঠামো নয়; নাগরিকের স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও অংশগ্রহণের সুযোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের জন্য সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা: কী গ্রহণ করা যায়?

বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে আয়তন, জনসংখ্যা, ভূপ্রকৃতি, অর্থনৈতিক কাঠামো ও রাষ্ট্রীয় বাস্তবতায় ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। সিঙ্গাপুর একটি ক্ষুদ্র নগররাষ্ট্র। বাংলাদেশ বৃহৎ জনসংখ্যার কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতনির্ভর দেশ। তাই সিঙ্গাপুরের মডেল সরাসরি প্রয়োগ করা সম্ভব নয়। তবে তাদের রাষ্ট্র নির্মাণের কিছু মৌলিক নীতি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

প্রথমত, রাজনৈতিক নেতৃত্বকে স্বল্পমেয়াদি ক্ষমতার হিসাবের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। পাঁচ বা দশ বছরের প্রকল্পের পাশাপাশি আগামী ২৫ থেকে ৩০ বছরের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন, জ্বালানি, পানি, পরিবহন ও নগর উন্নয়নের পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যক্তিনির্ভর অভিযান নয়, প্রতিষ্ঠাননির্ভর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশন, সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা, রাজস্ব প্রশাসন, পুলিশ, বিচার বিভাগ ও সরকারি নিয়োগব্যবস্থায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

তৃতীয়ত, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে বাস্তব সংযোগ তৈরি করতে হবে। কোন শিল্পে কতজন দক্ষ কর্মী প্রয়োজন, আগামী দশকে কোন প্রযুক্তির চাহিদা বাড়বে, কোন পেশায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে—এসব বিবেচনায় শিক্ষানীতি নির্ধারণ করতে হবে।

চতুর্থত, বিদেশি বিনিয়োগের জন্য শুধু করছাড় নয়, নির্ভরযোগ্য আইন, দ্রুত সেবা, দক্ষ শ্রমশক্তি, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ও আন্তর্জাতিক মানের অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে।

পঞ্চমত, পরিকল্পিত আবাসন ও নগর ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দিতে হবে। নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জন্য সাশ্রয়ী বাসস্থান, গণপরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সুবিধাকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।

ষষ্ঠত, প্রশাসনে মেধা ও যোগ্যতাকে প্রাধান্য দিতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত আনুগত্য কিংবা তদবির নয়; সততা, দক্ষতা ও কর্মসম্পাদনের ভিত্তিতে নিয়োগ, পদোন্নতি ও মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

সপ্তমত, জাতীয় ঐক্যকে রাজনৈতিক স্লোগানে সীমাবদ্ধ না রেখে নাগরিক সমতা, আইনের শাসন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

অষ্টমত, রাষ্ট্রের প্রতিটি বড় প্রকল্পের জন্য বাস্তবসম্মত ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ, সময়সীমা, জবাবদিহি ও স্বাধীন মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকতে হবে। কোনো প্রকল্প রাজনৈতিক প্রচারের মাধ্যম নয়; জনগণের অর্থে জনগণের কল্যাণে পরিচালিত উদ্যোগ—এই নীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

একটি ছোট দেশ, কিন্তু বড় রাষ্ট্রচিন্তা

সিঙ্গাপুরের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, রাষ্ট্রের উন্নয়ন শুধু অর্থের প্রাচুর্যের ওপর নির্ভর করে না। সম্পদ সীমিত হলেও সঠিক নীতি, দক্ষ প্রতিষ্ঠান, যোগ্য নেতৃত্ব, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে একটি দেশ নিজের অবস্থান বদলাতে পারে।

লি কুয়ান ইউর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব ছিল, তিনি রাষ্ট্র পরিচালনাকে শুধু ক্ষমতা ধরে রাখার বিষয় হিসেবে দেখেননি; বরং অর্থনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা, আবাসন, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে একটি সমন্বিত উন্নয়ন কৌশলের আওতায় আনার চেষ্টা করেছিলেন। তবে তার সময়ের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও নাগরিক স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতাও ইতিহাসের অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা আমাদের আরও একটি বিষয় শেখায়—রাষ্ট্রের উন্নয়ন কোনো একক নেতার জাদুতে ঘটে না। প্রয়োজন দক্ষ ও সৎ নেতৃত্বের পাশাপাশি কার্যকর প্রতিষ্ঠান, দায়িত্বশীল নাগরিক, যোগ্য পেশাজীবী এবং নীতির ধারাবাহিকতা।

বাংলাদেশের সামনে আজও বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। আমাদের জনসংখ্যা, ভৌগোলিক অবস্থান, কৃষি, শিল্প, প্রবাসী শ্রমশক্তি, উদ্যোক্তা, তরুণ জনগোষ্ঠী ও সমুদ্রসম্পদকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো গেলে অর্থনৈতিক রূপান্তর সম্ভব।

প্রশ্ন হলো, আমরা কি এই সম্পদগুলোকে সমন্বিত জাতীয় শক্তিতে পরিণত করতে পারছি? আমাদের নীতিনির্ধারকেরা কি আগামী প্রজন্মের কথা ভেবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন? রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কি ব্যক্তির পরিবর্তে নিয়ম ও আইনের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে?

সিঙ্গাপুরের গল্পের সবচেয়ে বড় বার্তা এখানেই। একটি দেশ ছোট হতে পারে, সম্পদ সীমিত হতে পারে, অতীত দুর্বল হতে পারে; কিন্তু রাষ্ট্রের লক্ষ্য, নেতৃত্বের মান, প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা ও নাগরিকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা বড় হলে ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়া সম্ভব।

সিঙ্গাপুরের অনুকরণ নয়, সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব বাস্তবতার উপযোগী উন্নয়ন দর্শন তৈরি করাই হতে পারে আমাদের পরবর্তী জাতীয় অগ্রযাত্রার ভিত্তি।

মাহাথির নাকি আনোয়ার—মালয়েশিয়ার উন্নয়নে কে এগিয়ে

নতুন নকশার প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালাল উত্তর কোরিয়া

আনোয়ার ইব্রাহিমের উদ্যোগে খুশি মালয়েশিয়ার নারীরা, মাতৃত্বকালীন ছুটির পরও মিলবে আর্থিক সহায়তা

মাউন্ট এভারেস্টের কাছে দুই হেলিকপ্টারের সংঘর্ষ, নিহত ১

মধ্যপ্রাচ্য ক্ষমতাধরদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র হওয়া উচিত নয়: জিনপিং

ভারত সীমান্ত ঘেঁষে এক দিনে ১০৮টি বৌদ্ধ প্যাগোডা নির্মাণ করল ভুটান

অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়ে সামরিক শক্তি প্রদর্শন উত্তর কোরিয়ার

দাবানলের ধোঁয়ায় সেপ্টেম্বরে ইন্দোনেশিয়ায় মৃত্যু ৩ হাজার ৫৬০

ভুটানে আকস্মিক বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি, ভারতে সতর্কতা

ভিন্নমত হলেই মুনাফিক বলার সমালোচনা আনোয়ার ইব্রাহিমের