হোম > বিশ্ব > এশিয়া

ভারত-চীনের আট দফা সমঝোতার পরও আস্থার সংকট বহাল

আমার দেশ অনলাইন

ভারত ও চীনের মধ্যে দীর্ঘদিনের সীমান্ত উত্তেজনা কমাতে আট দফা সমঝোতা নতুন কিছু প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের পথ খুলে দিয়েছে। সামরিক হটলাইন, অতিরিক্ত সীমান্ত বৈঠকস্থল, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের আলোচনা এবং আন্তঃসীমান্ত নদীর পানির তথ্য বিনিময়ের উদ্যোগ—এসব পদক্ষেপ দুই দেশের মধ্যে আকস্মিক সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি কমানোর একটি কাঠামো তৈরি করতে পারে। তবে সীমান্ত বিরোধের মৌলিক প্রশ্নগুলো এখনো অমীমাংসিত থাকায় এটিকে সম্পর্কের পূর্ণাঙ্গ পুনর্মিলন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

আগস্ট ২০২৬-এ বেইজিংয়ে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইর নেতৃত্বে দুই দেশের সীমান্তবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি পর্যায়ের ২৫তম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকের পর আট দফা সমঝোতার কথা সামনে আসে। এর মধ্যে সীমান্তে শান্তি বজায় রাখতে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশনা অনুসরণ, ২০০৫ সালের রাজনৈতিক পরামিতি ও নির্দেশনামূলক নীতির ভিত্তিতে সীমান্ত সমাধানের চেষ্টা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও সীমানা নির্ধারণে বিশেষজ্ঞদের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া এবং মাটির পর্যায়ের সমস্যা কূটনৈতিক ও সামরিক চ্যানেলে দ্রুত সমাধানের বিষয় রয়েছে।

সমঝোতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো পূর্ব ও মধ্য সীমান্ত সেক্টরে দুটি নতুন সামরিক হটলাইন স্থাপনের পরিকল্পনা। একই সঙ্গে ঊর্ধ্বতন সামরিক কমান্ডারদের জন্য আরও দুটি বৈঠকস্থল নির্ধারণের কথাও বলা হয়েছে। এর ফলে সীমান্তে কোনো ভুল বোঝাবুঝি বা আকস্মিক উত্তেজনা তৈরি হলে তা দ্রুত সামরিক পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের সুযোগ বাড়তে পারে।

তবে আট দফার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও তুলনামূলকভাবে নতুন ধারণাগুলোর একটি হলো ‘আর্লি অ্যান্ড সাবস্ট্যানশিয়াল হার্ভেস্ট’—অর্থাৎ পুরো সীমান্ত বিরোধ একসঙ্গে সমাধান করার পরিবর্তে যেসব অংশে মতপার্থক্য তুলনামূলক কম, সেসব এলাকায় আগে সমঝোতা করার চেষ্টা। এর আওতায় নির্দিষ্ট অঞ্চলের সীমা স্পষ্ট করার জন্য মানচিত্র প্রণয়ন ও প্রয়োজনে সীমা চিহ্নিত করার মতো পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বড় ও জটিল বিরোধপূর্ণ অঞ্চলগুলো পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনার জন্য রাখা হবে।

এই পদ্ধতির সম্ভাব্য সুবিধা হলো, কয়েক দশকের অচলাবস্থার মধ্যে ছোট ছোট বাস্তব সমঝোতার মাধ্যমে আস্থা তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। শান্তিপূর্ণ এলাকাগুলোতে সামরিক উপস্থিতি ও দৈনন্দিন উত্তেজনা কমানো গেলে সীমান্তে দুর্ঘটনাজনিত সংঘাতের ঝুঁকিও কমতে পারে। তবে এর বিপরীত ঝুঁকিও রয়েছে। আংশিক সমাধানের প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হলে পূর্ণাঙ্গ সীমান্ত নিষ্পত্তির পরিবর্তে কেবল ‘বর্ডার ম্যানেজমেন্ট’ বা সীমান্ত ব্যবস্থাপনার একটি স্থায়ী কাঠামো তৈরি হতে পারে।

ভারত-চীন সীমান্ত বিরোধের জটিলতা এখানেই। দুই দেশ ১৯৮১ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সীমান্ত প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করছে। ২০২০ সালের লাদাখ সংঘর্ষের পর সম্পর্কের অবনতি পরিস্থিতিকে আরো কঠিন করে তোলে। পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের সীমান্ত টহল-সংক্রান্ত সমঝোতা এবং সেনা প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে উত্তেজনা কিছুটা কমে আসে। সাম্প্রতিক সময়ে কূটনৈতিক, ব্যবসায়িক ও জনগণ-থেকে-জনগণ যোগাযোগও ধীরে ধীরে পুনরায় সক্রিয় হয়েছে।

কিন্তু সীমান্ত বিরোধের পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রতিযোগিতাও রয়েছে। ভারত চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করলেও বাস্তবে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বড় আকারে বিদ্যমান। একই সময়ে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, গুরুত্বপূর্ণ শিল্পপণ্য এবং বাজারে প্রবেশাধিকার নিয়ে উভয় পক্ষের উদ্বেগ রয়েছে। ফলে রাজনৈতিক সম্পর্কের উন্নতি অর্থনৈতিক সম্পর্কের সব বাধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে দূর করবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

আট দফা সমঝোতায় আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি ও জলবিদ্যুৎ-সংক্রান্ত তথ্য বিনিময়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। সেপ্টেম্বরেই এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের বৈঠকের কথা বলা হয়েছে। হিমালয় অঞ্চলের নদীগুলো ভারত, চীন ও বাংলাদেশের মতো একাধিক দেশের পানি, কৃষি ও পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় এ ধরনের তথ্য বিনিময় শুধু ভারত-চীন সম্পর্কের বিষয় নয়; বৃহত্তর দক্ষিণ এশিয়ার জন্যও এর তাৎপর্য রয়েছে।

বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র বা চীনা নামের ইয়ারলুং সাংপো নদীকে ঘিরে ভারতের উদ্বেগ দীর্ঘদিনের। তিব্বতে চীনের জলবিদ্যুৎ ও পানি অবকাঠামো সম্প্রসারণ নিয়ে ভারত বিভিন্ন সময়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তবে কোনো প্রকল্পকে সরাসরি ‘পানি অস্ত্র’ হিসেবে অভিহিত করার আগে প্রকল্পের প্রকৃত সক্ষমতা, পরিচালন পদ্ধতি, তথ্য বিনিময় এবং ভাটির দেশগুলোর ওপর সম্ভাব্য প্রভাব আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। দক্ষিণ এশিয়ার জন্য বাস্তব প্রশ্ন হলো, আকস্মিক বন্যা, বাঁধ-সংক্রান্ত জরুরি পরিস্থিতি এবং নদীর প্রবাহ সম্পর্কে কতটা দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য বিনিময় নিশ্চিত করা যায়।

ভারত-চীন সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছে ২০২৬ সালের ব্রিকস সম্মেলনের প্রেক্ষাপটে। ১২-১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত সম্মেলনের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেন। উভয় পক্ষই সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতার গুরুত্ব তুলে ধরে। ভারতের পক্ষ থেকে পারস্পরিক সম্মান, পারস্পরিক সংবেদনশীলতা ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সীমান্তের শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখা হয়েছে।

তবে এখানেও সতর্কতার প্রয়োজন। সাম্প্রতিক অগ্রগতিকে দুই দেশের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার অবসান হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। সীমান্তের চূড়ান্ত সমাধান হয়নি, অরুণাচল প্রদেশ নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে, চীনের পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ভারতের উদ্বেগের বিষয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের কৌশলগত সম্পর্কও বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে ভারতও চীনের সামরিক ও অর্থনৈতিক উত্থানকে নিজের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করে।

এই বাস্তবতায় আট দফা সমঝোতার মূল গুরুত্ব সম্ভবত সীমান্ত বিরোধের চূড়ান্ত সমাধানে নয়, বরং বিরোধকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য রাখার ব্যবস্থায়। নতুন হটলাইন, সামরিক বৈঠক, বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের যোগাযোগ এবং নদীর তথ্য বিনিময়—এসব ব্যবস্থা সংঘাতের সম্ভাব্য ভুল হিসাব কমাতে পারে। কিন্তু আস্থা কেবল বৈঠক বা ঘোষণার মাধ্যমে তৈরি হয় না; মাঠপর্যায়ের আচরণ, চুক্তি বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি ধারাবাহিকতার ওপরও তা নির্ভর করে।

এখানেই ‘আর্লি অ্যান্ড সাবস্ট্যানশিয়াল হার্ভেস্ট’ ধারণার বড় পরীক্ষা। যদি দুই দেশ সীমিত বিরোধপূর্ণ এলাকাগুলোতে বাস্তব ও পারস্পরিকভাবে গ্রহণযোগ্য সমাধান তৈরি করতে পারে, তাহলে তা বৃহত্তর সীমান্ত আলোচনার জন্য একটি নতুন ভিত্তি তৈরি করতে পারে। কিন্তু আংশিক সমঝোতা যদি মূল বিরোধকে কেবল ভবিষ্যতের জন্য ঠেলে দেয়, তাহলে এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের বদলে উত্তেজনা ব্যবস্থাপনার একটি পদ্ধতিতে পরিণত হতে পারে।

ভারত-চীন সম্পর্কের বর্তমান পর্যায়কে তাই ‘সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে গেছে’ বলার চেয়ে ‘সংঘাত নিয়ন্ত্রণ ও যোগাযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর্যায়’ হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত। দুই দেশের নেতারা উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন, সীমান্তে যোগাযোগের নতুন ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে এবং অর্থনৈতিক ও জনগণ-থেকে-জনগণ সম্পর্ক পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ চলছে। কিন্তু সীমান্তের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এবং পারস্পরিক কৌশলগত আস্থার প্রশ্ন এখনো সামনে রয়েছে।

শেষ পর্যন্ত আট দফা সমঝোতার সাফল্য নির্ভর করবে কাগজে কতগুলো পয়েন্ট যুক্ত হয়েছে তার চেয়ে মাঠপর্যায়ে সেগুলো কতটা ধারাবাহিকভাবে কার্যকর হয় তার ওপর। ২০২৭ সালে ভারতের আয়োজনে পরবর্তী বিশেষ প্রতিনিধি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। তার আগ পর্যন্ত নতুন হটলাইন কার্যকর হওয়া, সীমান্ত বৈঠকের ধারাবাহিকতা, আন্তঃসীমান্ত নদীর তথ্য বিনিময় এবং ‘আর্লি হার্ভেস্ট’-এর আওতায় বাস্তব অগ্রগতি—এসবই ভারত-চীন সম্পর্কের বর্তমান কূটনৈতিক উষ্ণতা কতটা স্থায়ী, তার গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে থাকবে।

সূত্র: সাউথ এশিয়া মনিটর, এপি নিউজ এবং রয়টার্স

মায়েরা শুধু পরিবারের অভিভাবক নন, শান্তির নির্মাতাও

হেগের রায়ের পরও বিরোধে ভারত-পাকিস্তান, সিন্ধু পানি চুক্তির ভবিষ্যৎ কী

বৃহৎ মহানগর অঞ্চলে পরিণত হয়েছে ইসলামাবাদ

যৌথ সীমান্ত কমিশন চালু করল পাকিস্তান-চীন

জাতীয় প্রতিরক্ষার অন্যতম স্তম্ভ নিরাপদ ও বিশ্বস্ত যোগাযোগ

বিদেশি শ্রমের ওপর নির্ভরশীল মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার

বন্যার গুজব মোকাবিলায় চীন ও নেপালের ভিন্ন কৌশল

আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে উজবেকিস্তানে

মালয়েশিয়ায় নারীদের মাদক ব্যবহার আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে

বহুজাতিক কোম্পানি গঠনই অর্থনৈতিক উন্নতির কার্যকর পথ নয়