হিমালয়ে হিমবাহ গলে যাওয়ার গতি এক দশক আগের তুলনায় ৬৫ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে বাড়ছে হিমবাহের গলনে সৃষ্ট হ্রদের আকার ও অস্থিতিশীলতা। ফলে হিমালয় অঞ্চল বড় ধরনের পরিবেশগত ও দুর্যোগ ঝুঁকির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এর প্রভাব ভারতের অর্থনীতি ও দক্ষিণ এশিয়ার কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর পড়তে পারে বলে নতুন এক গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে।
গ্লোবাল কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠান সিস্টেমিকের প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ইনিশিয়েটিভের সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি এই গবেষণায় আন্তর্জাতিক পর্বত উন্নয়ন কেন্দ্র (আইসিআইএমওডি) এবং জিবি পান্ত ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হিমালয়ান এনভায়রনমেন্টের কারিগরি সহায়তা নেওয়া হয়েছে। গবেষণায় হিমালয়-ক্যারাকোরাম অঞ্চলের আনুমানিক ৪০ হাজার হিমবাহের মধ্যে মাত্র ২১টি দীর্ঘমেয়াদে ও বিস্তারিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
নেপাল ও তিব্বতে ভয়াবহ বন্যায় ১ হাজার ৩০০-এর বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এসব ঘটনা দ্রুত পরিবর্তনশীল হিমালয় পরিবেশের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির বিষয়টি সামনে এনেছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, হিমবাহ পিছু হটার ফলে পাহাড়ে এমন সব হ্রদ তৈরি হচ্ছে, যেগুলো পাথর ও বরফের অস্থিতিশীল প্রাকৃতিক বাঁধের পেছনে আটকে থাকে। এসব বাঁধ ভেঙে গেলে আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি হতে পারে। পাশাপাশি উষ্ণতা বাড়ার কারণে দীর্ঘদিন জমাট থাকা পারমাফ্রস্ট বা বরফে জমাট মাটির স্তর গলে যাচ্ছে। এতে উঁচু পাহাড়ের ঢালও অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে এবং একের পর এক বিপর্যয় সৃষ্টির আশঙ্কা বাড়ছে।
ভারত ইতোমধ্যে এর ভয়াবহতার নজির দেখেছে। ২০২৩ সালে সিকিমে একটি হিমবাহ-হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় অন্তত ৭০ জন নিহত হয়। ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয় সড়ক, সেতু ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। এর আগে ২০২১ সালে উত্তরাখণ্ডে একই ধরনের ঘটনায় রিশিগঙ্গা ও ধৌলিগঙ্গা উপত্যকায় ব্যাপক বন্যা হয় এবং দুই শতাধিক মানুষ নিহত হয়।
ভারত সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নে ভারতীয় হিমালয় অঞ্চলের ১৮৯টি উচ্চঝুঁকির হিমবাহ হ্রদের মধ্যে ৫৬টিকে ‘অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। দেশটির হিমালয় নদী অববাহিকায় ১০ হেক্টরের বেশি আয়তনের ২ হাজার ৪৮৫টি হিমবাহ হ্রদ পর্যবেক্ষণ করছে কেন্দ্রীয় পানি কমিশন।
হিমালয়ের ঝুঁকি শুধু আকস্মিক বন্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এই পর্বতমালা দক্ষিণ এশিয়ার বিশাল প্রাকৃতিক জলব্যবস্থার ভিত্তি। এখানকার হিমবাহ থেকে উৎপন্ন নদীগুলো শত শত কোটি মানুষের জীবন ও অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখে। আইসিআইএমওডির হিসাবে, হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের অধিকাংশ নদী অববাহিকায় শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ‘পিক ওয়াটার’ বা হিমবাহ থেকে পানি প্রবাহের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। এরপর হিমবাহের ভর কমতে থাকায় পানির প্রবাহও কমে যেতে পারে।
নতুন গবেষণায় হিমালয়ের পানিসম্পদের ওপর ভারতের অর্থনৈতিক নির্ভরতার একটি বড় চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, হিমালয়ের পানি ভারতের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। গম, ধান, চা, জলবিদ্যুৎ ও তীর্থভিত্তিক পর্যটনসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এই পানিসম্পদের ওপর নির্ভরশীল। অথচ এই পানিসম্পদ থেকে সৃষ্ট অর্থনৈতিক মূল্যের মাত্র প্রায় ৫ শতাংশ হিমালয় অঞ্চলের রাজ্যগুলোতে থেকে যায়।
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের গ্রান্থাম রিসার্চ ইনস্টিটিউট অন ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড দ্য এনভায়রনমেন্টের চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ লর্ড নিকোলাস স্টার্ন হিমালয়কে ‘তৃতীয় মেরু’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, আর্কটিক বা অ্যান্টার্কটিকার বিপরীতে এই মেরুর নিচে ও আশপাশে শত শত কোটি মানুষ বসবাস করে। হিমালয়ের পরিবেশব্যবস্থা একটি ‘টিপিং পয়েন্ট’ বা বিপজ্জনক বাঁকবদলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।
তবে হিমবাহ গলার সব কারণই নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়। গবেষণা অনুযায়ী, হিমালয়ের হিমবাহ গলার প্রায় এক-তৃতীয়াংশের জন্য দায়ী ব্ল্যাক কার্বন বা কালো কার্বন। এর বড় একটি অংশ সমতল এলাকার ইটভাটা থেকে উৎপন্ন হয়। তুষার ও বরফের ওপর কালো কার্বন জমে সূর্যের তাপ বেশি শোষণ করে এবং গলন ত্বরান্বিত করে। গবেষকদের মতে, গ্রিনহাউস গ্যাসের তুলনায় এই দূষণ কমানো ভারত ও প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য সরাসরি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করে।
গবেষণায় হিমালয় রক্ষায় ১০টি অগ্রাধিকারভিত্তিক পদক্ষেপের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্ল্যাক কার্বন নিঃসরণ কমানো, হিমবাহ পর্যবেক্ষণ সম্প্রসারণ, দুর্যোগের আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা উন্নত করা এবং পাহাড়ি পর্যটনের ধরন পরিবর্তন করা। দুর্যোগের ঝুঁকি দেখা দিলে কোন পরিস্থিতিতে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এ বিষয়ে সরকারগুলোর আগাম সমন্বিত পরিকল্পনার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
পর্যটনের ক্ষেত্রেও নতুন দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন বলে মনে করছেন গবেষকরা। ভারতীয় হিমালয় অঞ্চলে বছরে প্রায় ৪০ কোটি পর্যটক ভ্রমণ করেন। পর্যটকের সংখ্যা সর্বোচ্চ করার পরিবর্তে স্থানীয় অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি মূল্য সৃষ্টি এবং সেই অর্থ পাহাড়ি অঞ্চলের উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণে পুনঃবিনিয়োগের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
আইসিআইএমওডির মহাপরিচালক পেমা গিয়ামতশো বলেছেন, ঝুঁকিগুলো ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। হিমবাহ পিছু হটছে, পারমাফ্রস্ট ও উঁচু পাহাড়ের ঢাল অস্থিতিশীল হচ্ছে এবং নিম্নাঞ্চলের জনগোষ্ঠী ও অবকাঠামো জটিল ও পরস্পর-সম্পর্কিত দুর্যোগের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকিতে পড়ছে।
গবেষকদের মতে, হিমালয়ের এসব ঝুঁকি কোনো দেশের সীমান্ত মেনে চলে না। ফলে সীমান্তপারের তথ্য বিনিময়, যৌথ পর্যবেক্ষণ, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় যৌথ বিনিয়োগ এখন জরুরি। শুধু প্রাণহানি ঠেকানো নয়, পাহাড়ের ওপর নির্ভরশীল শত শত কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা ও অর্থনীতি রক্ষার জন্যও হিমালয় অঞ্চলের দেশগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।