হোম > বিশ্ব > এশিয়া

রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে মিয়ানমারের সঙ্গে নতুন কৌশল মালয়েশিয়ার

আমার দেশ অনলাইন

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে দেশটির সামরিক-সমর্থিত সরকারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর নতুন কৌশল নিয়েছে মালয়েশিয়া। এর অংশ হিসেবে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইংকে মালয়েশিয়া সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। তার প্রস্তাব—মিয়ানমার যদি তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে রাজি হয়, তাহলে কুয়ালালামপুর দেশটির সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাড়াতে প্রস্তুত।

সম্প্রতি এক পডকাস্টে আনোয়ার বলেন, তিনি মিন অং হ্লাইংকে মালয়েশিয়ায় আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, মিয়ানমারের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও বাণিজ্য করা সম্ভব, তবে একই সঙ্গে মিয়ানমারকে মালয়েশিয়ায় থাকা তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে হবে। একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষ নেওয়া সম্ভব না হলে ধাপে ধাপে তাদের ফেরত নেওয়ার কথাও বলেন তিনি।

জুলাইয়ে আনোয়ার জানিয়েছিলেন, মিয়ানমার মালয়েশিয়া থেকে ৫ হাজার রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে। এরপর প্রথম দফায় প্রায় দেড় হাজার মানুষকে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে স্বেচ্ছায় ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়। তবে প্রথম দফায় ঠিক কতজন রোহিঙ্গা থাকবেন, তা নিয়ে তখনও স্পষ্টতা ছিল না।

মালয়েশিয়ায় জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থায় নিবন্ধিত ২ লাখের বেশি শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থী রয়েছে। তাদের মধ্যে ১ লাখ ২৬ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা। ফলে দীর্ঘদিন ধরে দেশটির জন্য রোহিঙ্গা ইস্যু একটি বড় মানবিক ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।

কেন মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে কুয়ালালামপুর

২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে মালয়েশিয়া তুলনামূলকভাবে কঠোর অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু আনোয়ারের সাম্প্রতিক বক্তব্যে সেই নীতিতে বাস্তববাদী পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

মালয়েশিয়া এখন পুরোপুরি স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপন না করেও নির্দিষ্ট বিষয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা করার পথ পরীক্ষা করছে। অর্থাৎ রাজনৈতিক স্বীকৃতি ও পূর্ণাঙ্গ সম্পর্কের পরিবর্তে নির্দিষ্ট বিষয়ে সহযোগিতা আদায়ের জন্য কূটনৈতিক যোগাযোগকে ব্যবহার করতে চাইছে কুয়ালালামপুর।

আনোয়ারের যুক্তি হলো, মিয়ানমারের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ না রাখলে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে কার্যকর আলোচনা করা কঠিন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, মিয়ানমারের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা না করে মালয়েশিয়া শেষ পর্যন্ত কাদের সঙ্গে সমঝোতা করবে।

এই নীতিকে বিশ্লেষণে ‘শর্তসাপেক্ষ যোগাযোগ’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অর্থাৎ মিয়ানমারকে পুরোপুরি স্বাভাবিক সম্পর্কের মর্যাদা না দিয়েও নির্দিষ্ট সহযোগিতার বিনিময়ে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানো।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে উদ্বেগ

তবে মালয়েশিয়ার এই উদ্যোগ নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগ রয়েছে। ২৩ সেপ্টেম্বর ১৬০টির বেশি নাগরিক ও মানবাধিকার সংগঠন রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, মিয়ানমারে চলমান সংঘাত ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো হলে তারা নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচও আগস্টে সতর্ক করে বলেছে, মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হলে রোহিঙ্গারা নিপীড়ন ও অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। সংস্থাটি মালয়েশিয়াকে জোরপূর্বক প্রত্যাবাসনের পরিকল্পনা থেকে সরে এসে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থাও প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসম্মতি, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি বিশেষভাবে জটিল। দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার ওই অঞ্চলের সব এলাকায় কার্যকর নিয়ন্ত্রণ রাখে না; আরাকান আর্মিসহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী সেখানে প্রভাব বিস্তার করছে। ফলে শুধু মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে চুক্তি করলেই প্রত্যাবাসিত রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

বাংলাদেশও এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত

মালয়েশিয়ার নতুন কৌশলের প্রভাব বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা অবস্থান করছেন এবং তাদের প্রত্যাবাসনের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা-মিয়ানমার সম্পর্কের অন্যতম প্রধান ইস্যু।

গত ২২ জুন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর আনোয়ার ইব্রাহিম জানিয়েছিলেন, রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া আসিয়ান কাঠামোর মাধ্যমে সহযোগিতা বাড়াবে। এতে মিয়ানমারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আলোচনায় যুক্ত করার কথাও বলা হয়েছিল।

ফলে মালয়েশিয়ার বর্তমান উদ্যোগ শুধু দেশটিতে থাকা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার জন্যও একটি সম্ভাব্য কূটনৈতিক মডেল তৈরি করতে পারে।

আসিয়ানের নীতিতেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত

মিয়ানমারের সংকট মোকাবিলায় আসিয়ানের পাঁচ দফা ঐকমত্যে সহিংসতা বন্ধ, মানবিক সহায়তা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক সংলাপের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু কয়েক বছর পরও এর বাস্তবায়নে বড় অগ্রগতি হয়নি।

এ অবস্থায় মালয়েশিয়া এখন আরও বাস্তববাদী পদ্ধতির কথা বলছে। মে মাসে আনোয়ার আসিয়ানকে মিয়ানমারের সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে আরও কার্যকর ও বাস্তববাদী পদ্ধতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

এর অর্থ হলো, মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতার বদলে নির্দিষ্ট বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে ফল পাওয়ার চেষ্টা করা। তবে এই পদ্ধতির সাফল্য নির্ভর করবে মিয়ানমার বাস্তবে কী ধরনের নিশ্চয়তা ও সহযোগিতা দেয় তার ওপর।

কূটনীতির নতুন পরীক্ষা

মিয়ানমার ইস্যুতে আনোয়ার ইব্রাহিমের নতুন নীতিকে তাই এক ধরনের কূটনৈতিক পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। একদিকে তিনি মিয়ানমারকে পুরোপুরি স্বাভাবিক সম্পর্কের সুযোগ দিতে চাইছেন না; অন্যদিকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের মতো বাস্তব সমস্যা সমাধানে দেশটির সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন।

এ ধরনের কূটনীতিতে যোগাযোগকে ধাপে ধাপে বাড়ানো এবং প্রতিটি পর্যায়ে বাস্তব সহযোগিতার শর্ত যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এর ঝুঁকিও আছে। মিয়ানমার যদি প্রত্যাবাসনের প্রতিশ্রুতি দেয়, অথচ নিরাপদ পরিবেশ তৈরি না করে, তাহলে কূটনৈতিক সুবিধা পেলেও রোহিঙ্গাদের মূল সংকটের সমাধান হবে না।

মালয়েশিয়ার সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—মিয়ানমারের সঙ্গে নতুন এই যোগাযোগ কি সত্যিই নিরাপদ ও স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসনের পথ তৈরি করবে, নাকি শুধু দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেবে।

আনোয়ারের উদ্যোগের ফল তাই শুধু কুয়ালালামপুর ও নেপিদোর সম্পর্কের জন্য নয়; বাংলাদেশসহ পুরো অঞ্চলের রোহিঙ্গা সংকটের ভবিষ্যতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সূত্র: আরব নিউজ, সিএনএ, রয়টার্স ও বার্নামা

বন্যায় বিপর্যস্ত ব্যাংকক, আশ্রয়কেন্দ্রে হাজারো মানুষ

ফিলিস্তিন ইস্যুতে ইসরাইলবিরোধী অবস্থানে অনড় আনোয়ার ইব্রাহিম

মারা গেছেন মাহাথির মোহাম্মদের স্ত্রী সিতি হাসমাহ

নেপাল ভ্রমণে বাংলাদেশি পর্যটকদের সতর্ক করল দূতাবাস

পাকিস্তানের সেনা অভিযানে ভারতীয় মদতপুষ্ট ৭১ সন্ত্রাসী নিহত

নেপালে ফের বিপর্যয়, তুষারধসে পর্বতারোহীসহ নিখোঁজ ১০

এআই নিরাপত্তায় জাতিসংঘের নতুন কাঠামোর প্রস্তাব সিঙ্গাপুরের

নেপালে বন্যায় নিহত বেড়ে ১৪৫৩, এখনো নিখোঁজ প্রায় ৬ হাজার

ভারী বর্ষণে থাইল্যান্ডে বন্যা, ব্যাংককের ৫০ জেলা দুর্যোগপূর্ণ ঘোষণা

মণিপুর রাজ্যে গুলিতে নাগা সম্প্রদায়ের চার নাগরিক নিহত