মালয়েশিয়ার উন্নয়নের ইতিহাসে মাহাথির মোহাম্মদ ও আনোয়ার ইব্রাহিম—দুজনের নামই গুরুত্বপূর্ণ। তবে তাদের অবদানের ধরন এক নয়। মাহাথিরের দীর্ঘ শাসনামলে মালয়েশিয়া কৃষি ও প্রাথমিক পণ্যনির্ভর অর্থনীতি থেকে শিল্পায়ন, রপ্তানি ও আধুনিক অবকাঠামোভিত্তিক অর্থনীতির দিকে বড় রূপান্তর ঘটায়।
অন্যদিকে আনোয়ার ইব্রাহিমের সামনে প্রধান কাজ হলো সেই অর্জনকে আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক, প্রযুক্তিনির্ভর, উচ্চ আয়ের ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে টেকসই অর্থনীতিতে উন্নীত করা। তাই প্রশ্নটি শুধু কে বেশি উন্নয়ন করেছেন, তা নয়; বরং মালয়েশিয়ার উন্নয়নের কোন পর্যায়ে কে কী ভূমিকা রেখেছেন, তাদের নীতি কতটা ফল দিয়েছে এবং কোন সীমাবদ্ধতা রেখে গেছে—সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
মাহাথিরের সময়: শিল্পায়ন ও আধুনিক মালয়েশিয়ার ভিত্তি
মাহাথির মোহাম্মদ ১৯৮১ সালের ১৬ জুলাই মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০০৩ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত টানা ২২ বছরের বেশি সময় তিনি দেশটির নেতৃত্ব দেন। তার শাসনামলেই মালয়েশিয়ার অর্থনীতিতে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটে। কৃষি, খনিজ ও প্রাথমিক পণ্য রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি ক্রমে শিল্প উৎপাদন, ইলেকট্রনিকস, যন্ত্রপাতি, পেট্রোলিয়াম ও আধুনিক সেবাখাতের দিকে অগ্রসর হয়।
মাহাথিরের উন্নয়নদর্শনের কেন্দ্রে ছিল দ্রুত শিল্পায়ন, রাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকা, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং জাপান-দক্ষিণ কোরিয়ার উন্নয়ন অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া। তার ঘোষিত ‘লুক ইস্ট’ নীতির মাধ্যমে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মসংস্কৃতি, প্রযুক্তি, শিল্পব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনাগত অভিজ্ঞতা অনুসরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৮৩ সালে ‘মালয়েশিয়া ইনকরপোরেটেড’ ধারণা এবং বেসরকারীকরণ নীতি চালু করে সরকার ও ব্যবসায়িক খাতের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। একই সময়ে জাতীয় শিল্পনীতি এবং ১৯৯০ সালে ‘ভিশন ২০২০’ ঘোষণার মাধ্যমে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
শিল্পায়নের প্রতীক হিসেবে ১৯৮৫ সালে জাতীয় গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান প্রোটন প্রতিষ্ঠা, ১৯৯৬ সালে মাল্টিমিডিয়া সুপার করিডর চালু এবং পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার, কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, পেনাং ব্রিজ ও পুত্রজায়ার মতো বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব প্রকল্পের সব কটির অর্থনৈতিক সাফল্য একই মাত্রার ছিল না; তবে এগুলো মালয়েশিয়ার শিল্প, যোগাযোগ, নগরায়ণ ও আন্তর্জাতিক পরিচিতি গঠনে ভূমিকা রেখেছে।
বিশ্বব্যাংকের একটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৮৭ থেকে শুরু হওয়া পরবর্তী আট বছরে মালয়েশিয়ার রপ্তানিমুখী ও উৎপাদননির্ভর অর্থনীতি গড়ে ওঠার গতি ছিল উল্লেখযোগ্য। ওই সময়ে গড়ে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশের বেশি ছিল। বিশ্বব্যাংক এই রূপান্তরের সঙ্গে মাহাথির সরকারের বেসরকারীকরণ, অর্থনৈতিক উদারীকরণ ও ‘ভিশন ২০২০’-এর নীতিগত সম্পর্ক চিহ্নিত করেছে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, ১৯৭৫–১৯৮৫ সময়ে মালয়েশিয়ার মোট পণ্য রপ্তানিতে উৎপাদিত শিল্পপণ্যের অংশ ছিল প্রায় ২০ শতাংশ; ১৯৮৫–১৯৯৫ সময়ে তা বেড়ে প্রায় ৫৪ শতাংশে পৌঁছায়। এই পরিবর্তন একক কোনো নেতার সিদ্ধান্তের ফল নয়; এর পেছনে আগের দশকের শিল্পনীতি, সরকারি বিনিয়োগ, অবকাঠামো, বিদেশি পুঁজি এবং মাহাথির সরকারের রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন নীতির সম্মিলিত প্রভাব ছিল।
মাহাথিরের উন্নয়নকালের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল দারিদ্র্য হ্রাস ও সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তন। ১৯৭০-এর দশক থেকে শুরু হওয়া নতুন অর্থনৈতিক নীতি বা নিউ ইকোনমিক পলিসির লক্ষ্য ছিল দারিদ্র্য দূর করা এবং জাতিগত অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো। মাহাথিরের সময়ে এ নীতির বিভিন্ন দিক অব্যাহত ও পরিবর্তিত হয়। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে শিল্পায়ন, শ্রমনির্ভর রপ্তানি এবং অ-কৃষি কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সঙ্গে বুমিপুত্র জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য হ্রাস, শিক্ষা ও পেশাগত অগ্রগতির সম্পর্ক ছিল। তবে এই অর্জনের কৃতিত্ব শুধু মাহাথিরের নয়; পূর্ববর্তী সরকারের নীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক পরিবর্তনও এর অংশ।
তবে মাহাথিরের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। ১৯৮০-এর দশকের প্রথম দিকে ভারী শিল্পায়নে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ও ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়। ১৯৮৫–৮৬ সালে মন্দা দেখা দেয়। পরে সরকার বেসরকারি খাত, রপ্তানি ও বিদেশি বিনিয়োগকে বেশি গুরুত্ব দেয়। ১৯৯৭–৯৮ সালের এশীয় আর্থিক সংকটও মালয়েশিয়ার অর্থনীতিকে বড় ধাক্কা দেয়। মাহাথিরের সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের প্রচলিত ব্যবস্থাপত্র গ্রহণ না করে মূলধন নিয়ন্ত্রণসহ নিজস্ব কিছু পদক্ষেপ নেয়। বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে এসব পদক্ষেপের কিছু ইতিবাচক ফলের কথা বলা হলেও সংকটটি মালয়েশিয়ার আর্থিক ব্যবস্থার দুর্বলতাও সামনে এনেছিল।
মাহাথিরের সময়ে বড় প্রকল্প ও শিল্পায়নের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং ব্যবসায়িক পৃষ্ঠপোষকতার সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। উন্নয়ন গবেষক জোমো কে এস ও হুই উই চং তাদের গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, অর্থনৈতিক উদারীকরণের সঙ্গে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক অভিজাতদের প্রভাবও বেড়েছিল। ফলে উন্নয়নের পরিসংখ্যানের পাশাপাশি সম্পদের বণ্টন, প্রতিযোগিতা, জবাবদিহি ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতার প্রশ্নও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
আনোয়ারের সময়: পুরোনো শিল্পভিত্তি থেকে উচ্চপ্রযুক্তির অর্থনীতির চেষ্টা
আনোয়ার ইব্রাহিম ২০২২ সালের ২৪ নভেম্বর মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার নেতৃত্বাধীন সরকারের সামনে মাহাথিরের সময়ের মতো একেবারে নতুন শিল্পভিত্তি নির্মাণের চ্যালেঞ্জ নেই। বরং প্রতিষ্ঠিত শিল্প, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় মালয়েশিয়ার অবস্থান, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও মানবসম্পদকে আরও উন্নত করা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো তার সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে।
আনোয়ারের অর্থনৈতিক দর্শনের প্রধান কাঠামো ‘মালয়েশিয়া মাদানি’ এবং ‘ইকোনমি মাদানি’। এর মূল লক্ষ্য অর্থনীতির উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানো, জীবনযাত্রার মান উন্নত করা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং সামাজিক সুযোগের বৈষম্য কমানো। সরকারের ঘোষিত ‘রেইজ দ্য সিলিং’ নীতির উদ্দেশ্য উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্প, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় মালয়েশিয়ার অবস্থান শক্তিশালী করা। ‘রেইজ দ্য ফ্লোর’ নীতির লক্ষ্য সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান, সামাজিক সুরক্ষা ও সুযোগের সমতা বাড়ানো।
আনোয়ার সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর কৌশল। ২০২৪ সালের এপ্রিলে তিনি উচ্চপ্রযুক্তির সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং এই খাতে মালয়েশিয়ার সক্ষমতা বাড়াতে একটি সমন্বিত কৌশল তৈরির ঘোষণা দেন। লক্ষ্য শুধু চিপ সংযোজন বা পরীক্ষার কাজেই সীমাবদ্ধ না থেকে শিল্পটির উচ্চমূল্য সংযোজনকারী পর্যায়ে প্রবেশ করা। বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গাড়ি, যোগাযোগব্যবস্থা ও ডেটা সেন্টারের প্রসারের কারণে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের গুরুত্ব বেড়েছে। মালয়েশিয়া এই বৈশ্বিক পরিবর্তনকে কাজে লাগাতে চায়।
এ ক্ষেত্রে আনোয়ার সরকারের নীতি আগের শিল্পায়ন কৌশলের ধারাবাহিকতা বহন করছে। মাহাথিরের সময়ে মালয়েশিয়া ইলেকট্রনিকস ও উৎপাদনশিল্পের আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় প্রবেশ করেছিল। এখন সেই ভিত্তিকে কাজে লাগিয়ে গবেষণা, নকশা, উন্নত উৎপাদন, প্রযুক্তি ও দক্ষ জনশক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। অর্থাৎ আনোয়ারের লক্ষ্য নতুন শিল্পায়নের চেয়ে বিদ্যমান শিল্পের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও মূল্য সংযোজন বাড়ানো।
আনোয়ার সরকারের সময়ে বিনিয়োগের পরিসংখ্যানও উল্লেখযোগ্য। মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশটিতে অনুমোদিত বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৩৭৮.৫ বিলিয়ন রিঙ্গিত, যা আগের বছরের তুলনায় ১৪.৯ শতাংশ বেশি এবং সে সময় পর্যন্ত সর্বোচ্চ। এর মধ্যে দেশীয় বিনিয়োগ ছিল ২০৮.১ বিলিয়ন এবং বিদেশি বিনিয়োগ ১৭০.৪ বিলিয়ন রিঙ্গিত।
২০২৫ সালেও বিনিয়োগের এই প্রবণতা অব্যাহত থাকার তথ্য পাওয়া যায়। মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ২০২৬ সালের ৬ মার্চ প্রকাশিত তথ্যে জানায়, ২০২৫ সালে অনুমোদিত বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৪২৬.৭ বিলিয়ন রিঙ্গিত, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ১১ শতাংশ বেশি। ৮ হাজার ৩৯০টি অনুমোদিত প্রকল্প থেকে প্রায় ২ লাখ ৪৪ হাজার ৯০২টি নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে অনুমোদিত বিনিয়োগ মানেই সব প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে বা সব কর্মসংস্থান ইতিমধ্যে সৃষ্টি হয়েছে—এমন নয়। বাস্তবায়ন, বিনিয়োগের গুণগত মান এবং স্থানীয় কর্মীদের দক্ষতা ও আয় বৃদ্ধিই হবে প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও আনোয়ার সরকারের সময়ে ইতিবাচক পরিসংখ্যান রয়েছে। মালয়েশিয়ার পরিসংখ্যান বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশটির অর্থনীতি ৫.১ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে ৫.২ শতাংশ সম্প্রসারিত হয়েছে। ২০২৫ সালে জিডিপির বর্তমান বাজারমূল্য ছিল ২.০৩ ট্রিলিয়ন রিঙ্গিত। তবে এই প্রবৃদ্ধিকে শুধু প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত কৃতিত্ব হিসেবে দেখা যথাযথ হবে না। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ, বৈশ্বিক চাহিদা, রপ্তানি, ভোগব্যয়, আগের সরকারের নেওয়া প্রকল্প এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও এতে ভূমিকা রেখেছে।
আনোয়ার সরকারের আরেকটি বড় অগ্রাধিকার রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও ভর্তুকি সংস্কার। জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যে ব্যাপক ভর্তুকির কারণে সরকারি ব্যয়ের ওপর যে চাপ তৈরি হয়, তা কমিয়ে প্রকৃত প্রয়োজনীয় জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি অর্থব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর জন্য সরকারি অর্থ ও রাজস্বসংক্রান্ত সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। এ ধরনের পদক্ষেপ দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতির জন্য সহায়ক হতে পারে; কিন্তু ভর্তুকি কমানোর ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেলে তা নতুন সামাজিক চাপ তৈরি করবে। তাই সংস্কারের সাফল্য নির্ভর করবে সহায়তা কতটা সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছায় তার ওপর।
২০২৫ সালে আনোয়ার সরকার ২০২৬–২০৩০ মেয়াদের ত্রয়োদশ মালয়েশিয়া পরিকল্পনা উপস্থাপন করে। এতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর অর্থনীতি, উচ্চপ্রযুক্তির শিল্প, আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাস, সরকারি সেবা সংস্কার এবং সামাজিক কল্যাণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪.৫ থেকে ৫.৫ শতাংশে রাখা, রাজস্ব ঘাটতি জিডিপির ৩ শতাংশের নিচে নামানো এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এগুলো সরকারের ঘোষিত লক্ষ্য; বাস্তব অর্জন মূল্যায়নের জন্য পরিকল্পনার মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
দুই নেতার অবদানের তুলনা: সময়, নীতি ও ফলাফল
মাহাথির ও আনোয়ারের অবদান তুলনা করতে গেলে প্রথমেই তাদের দায়িত্ব পালনের সময়কাল ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আলাদা করে দেখতে হবে। মাহাথিরের প্রথম প্রধানমন্ত্রিত্ব ছিল ১৯৮১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত। এই সময় মালয়েশিয়ার অর্থনীতিকে শিল্পায়ন, রপ্তানি, অবকাঠামো ও বিদেশি বিনিয়োগের ভিত্তিতে পুনর্গঠন করা হয়। আনোয়ার দায়িত্ব নিয়েছেন ২০২২ সালে, যখন মালয়েশিয়া ইতিমধ্যে একটি শিল্পোন্নত মধ্যম আয়ের অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক উৎপাদনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ফলে তাদের কাজের ধরন ও ফলাফল একই মাপকাঠিতে মাপা কঠিন।
মাহাথিরের অবদান মূলত অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তরে। তার সময়ে রাষ্ট্রীয় শিল্পনীতি, প্রোটন, বৃহৎ অবকাঠামো, রপ্তানিমুখী উৎপাদন, বিদেশি বিনিয়োগ এবং উন্নত রাষ্ট্র হওয়ার দীর্ঘমেয়াদি স্বপ্ন একসঙ্গে সামনে আসে। এসব উদ্যোগ মালয়েশিয়াকে আন্তর্জাতিক শিল্প ও বাণিজ্যব্যবস্থায় দৃশ্যমান অবস্থান তৈরি করতে সহায়তা করে।
আনোয়ারের অবদান এখন পর্যন্ত মূলত বিদ্যমান অর্থনৈতিক ভিত্তিকে আরো উন্নত করার নীতিগত প্রচেষ্টায়। উচ্চপ্রযুক্তির শিল্প, সেমিকন্ডাক্টর, জ্বালানি রূপান্তর, বিনিয়োগ আকর্ষণ, রাজস্ব সংস্কার, সামাজিক সুরক্ষা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির ওপর তার সরকারের জোর রয়েছে। বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান ইতিবাচক হলেও এসব নীতির দীর্ঘমেয়াদি ফল এখনো পুরোপুরি মূল্যায়নের সময় আসেনি।
দুই নেতার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সম্পর্কের ইতিহাসও উল্লেখযোগ্য। আনোয়ার একসময় মাহাথির সরকারের উপপ্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৯০-এর দশকে তিনি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৭–৯৮ সালের এশীয় আর্থিক সংকট মোকাবিলায় তাদের মধ্যে নীতিগত মতপার্থক্য তৈরি হয়। ১৯৯৮ সালে আনোয়ার সরকার থেকে বরখাস্ত হন। পরবর্তী সময়ে তাদের রাজনৈতিক বিরোধ মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। এই ইতিহাস দেখায়, মালয়েশিয়ার উন্নয়ন কেবল দুই নেতার প্রতিযোগিতার গল্প নয়; এটি নীতি, ক্ষমতা, প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক মতপার্থক্যেরও ইতিহাস।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, উন্নয়ন বলতে আমরা কী বুঝি? শুধু জিডিপি, সুউচ্চ ভবন, বিমানবন্দর ও বিদেশি বিনিয়োগ দিয়ে একটি দেশের উন্নয়ন পরিমাপ করা যায় না। কর্মসংস্থানের মান, আয়বৈষম্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ, আঞ্চলিক ভারসাম্য, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক জবাবদিহি এবং নাগরিকের জীবনযাত্রার নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
মাহাথিরের সময়ে শিল্পায়ন ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন দৃশ্যমান হলেও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সীমাবদ্ধতা এবং ব্যবসায়িক পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। অন্যদিকে আনোয়ারের ঘোষিত সংস্কার কর্মসূচিতে সুশাসন, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও অর্থনৈতিক সুযোগের সমতার কথা থাকলেও এসব লক্ষ্য কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা বিচার করতে হবে প্রকৃত ফলাফল দিয়ে। জীবনযাত্রার ব্যয়, আয়বৈষম্য, কর্মসংস্থানের মান এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি না হলে উচ্চ বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির সুফল সবার কাছে পৌঁছাবে না।
মালয়েশিয়ার উন্নয়ন থেকে বাংলাদেশের শিক্ষা
মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। প্রথমত, উন্নয়নকে স্বল্পমেয়াদি প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করতে হয়। মাহাথিরের ‘ভিশন ২০২০’ এই দৃষ্টিভঙ্গির একটি উদাহরণ। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা, দক্ষ প্রশাসন এবং কার্যকর প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, শুধু সস্তা শ্রম দিয়ে দীর্ঘদিন রপ্তানি আয় বাড়ানো সম্ভব হলেও উচ্চ আয়ের অর্থনীতিতে যেতে হলে প্রযুক্তি, গবেষণা, দক্ষতা ও স্থানীয় শিল্পের সক্ষমতা বাড়াতে হয়। মালয়েশিয়া ইলেকট্রনিকস ও উৎপাদনশিল্পের মাধ্যমে যে অবস্থান তৈরি করেছে, এখন সেমিকন্ডাক্টর ও উচ্চপ্রযুক্তির শিল্পে আরো এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের পাশাপাশি ওষুধ, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালকা প্রকৌশল, ইলেকট্রনিকস, জাহাজ নির্মাণ, তথ্যপ্রযুক্তি ও অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতে এমন রূপান্তর প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য শুধু কর ছাড় বা জমি দিলেই হয় না। নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, বন্দর, যোগাযোগ, দক্ষ জনশক্তি, আইনের শাসন, নীতির ধারাবাহিকতা এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হয়। মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা দেখায়, অবকাঠামো ও শিল্পনীতি একে অন্যের পরিপূরক।
চতুর্থত, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের সব শ্রেণির মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে। প্রবৃদ্ধি বাড়লেও যদি জীবনযাত্রার ব্যয়, বৈষম্য ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা বাড়ে, তাহলে উন্নয়নের সামাজিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। মালয়েশিয়ার নতুন পরিকল্পনায় ‘রেইজ দ্য ফ্লোর’ বা সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পেছনে এই বাস্তবতা রয়েছে।
পঞ্চমত, উন্নয়নের নামে রাজনৈতিক জবাবদিহি ও নাগরিক অধিকারকে উপেক্ষা করা উচিত নয়। কার্যকর প্রশাসন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সঙ্গে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন গণমাধ্যম, আইনের সমতা এবং নাগরিকের মতপ্রকাশের অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে অর্থনৈতিক দক্ষতা ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহির মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে।
মালয়েশিয়ার উন্নয়নে নেতৃত্বের কৃতিত্ব
মালয়েশিয়ার উন্নয়নে মাহাথির মোহাম্মদের ভূমিকা প্রধানত শিল্পায়ন, অবকাঠামো নির্মাণ, রপ্তানিমুখী অর্থনীতি এবং আধুনিক রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরির সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যদিকে আনোয়ার ইব্রাহিমের নেতৃত্বাধীন সরকার সেই ভিত্তিকে উচ্চপ্রযুক্তি, উদ্ভাবন, বিনিয়োগ, রাজস্ব সংস্কার ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে পরবর্তী পর্যায়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
সুতরাং তাদের অবদানকে একটি সরল প্রতিযোগিতায় নামিয়ে এনে একজনকে বিজয়ী ঘোষণা করলে মালয়েশিয়ার উন্নয়নের প্রকৃত ইতিহাস ধরা পড়বে না। মাহাথিরের দীর্ঘ শাসনামলে যে শিল্প ও অবকাঠামোগত ভিত্তি তৈরি হয়েছে, আনোয়ার সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নতুন অর্থনৈতিক রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। আনোয়ারের পরিকল্পনা কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে আগামী কয়েক বছরে বাস্তবায়ন, কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা, আয়বৈষম্য ও জনকল্যাণের পরিমাপযোগ্য ফলাফলের ওপর।
মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতার সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এই যে, কোনো দেশের উন্নয়ন একজন নেতার একক কৃতিত্ব নয়। এটি বহু দশকের নীতি, প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন, উদ্যোক্তা, শ্রমজীবী মানুষ, শিক্ষা, বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সম্মিলিত ফল। নেতৃত্বের কৃতিত্ব নির্ধারিত হয় কে কত বড় ঘোষণা দিয়েছেন তা দিয়ে নয়, বরং তার সময়ে গৃহীত নীতি কতটা কার্যকর হয়েছে এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কতটা শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও অর্থনৈতিক ভিত্তি রেখে গেছে তা দিয়ে।