বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে ক্রমেই প্রভাবশালী হয়ে উঠছে ব্রিকস। বিশেষ করে রাশিয়া, ভারত ও চীন নিজেদের মধ্যে কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরো বাড়াতে পারলে এই জোটের সম্মিলিত শক্তি বিশ্বব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
‘সাউথ এশিয়া মনিটর’-এ প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে অবসরপ্রাপ্ত ভারতীয় সেনা কর্মকর্তা ও সমকালীনবিষয়ক বিশ্লেষক কর্নেল কে এল বিশ্বনাথন বলেন, রাশিয়া, ভারত ও চীনের মধ্যে গভীর সহযোগিতা গড়ে উঠলে এবং অন্য ব্রিকস সদস্য ও অংশীদাররা এতে যুক্ত হলে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক কাঠামো তৈরি হতে পারে।
ভারত ২০২৬ সালে ব্রিকসের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে। ১১ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলন আয়োজন করছে দেশটি। এবারের প্রতিপাদ্য—‘বিল্ডিং ফর রেজিলিয়েন্স, ইনোভেশন, কো-অপারেশন অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি’। অর্থাৎ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ব্রিকস এখনো কোনো সামরিক জোট নয়। সদস্য দেশগুলোর অভিন্ন কোনো নিরাপত্তা নীতি বা রাজনৈতিক মতাদর্শ নেই। প্রতিটি দেশ নিজেদের জাতীয় স্বার্থ ও পররাষ্ট্রনীতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয়। এই বৈচিত্র্য একদিকে ব্রিকসের সীমাবদ্ধতা, অন্যদিকে এর শক্তিও।
জনসংখ্যার দিক থেকেও ব্রিকসের বিশাল প্রভাব রয়েছে। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা—এই মূল পাঁচ সদস্যের সম্মিলিত জনসংখ্যা বিশ্বের প্রায় ৪১ দশমিক ৬ শতাংশ। শুধু ভারত ও চীন মিলে বিশ্বের ৩৬ শতাংশের বেশি মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে। ফলে অর্থনীতি, জনসংখ্যা ও ভৌগোলিক বিস্তৃতির কারণে বিশ্বব্যবস্থায় ব্রিকসের গুরুত্ব বাড়ছে।
ব্রিকসের মধ্যে রাশিয়া, ভারত ও চীন জনসংখ্যা, অর্থনীতি, সামরিক সক্ষমতা ও কৌশলগত গুরুত্বের দিক থেকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই তিন দেশ নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে পারলে পশ্চিমা শক্তিকেন্দ্রগুলোর—বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের—প্রভাবের মোকাবিলায় একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভারসাম্য তৈরি হতে পারে।
বাণিজ্য হতে পারে এই সহযোগিতার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। ভারত, রাশিয়া ও চীন নিজেদের বাণিজ্যনীতি সমন্বয় করলে পশ্চিমা শুল্কনীতি ও একতরফা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে অবস্থান নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যব্যবস্থাকে আরও ন্যায্য ও পূর্বানুমানযোগ্য করার দাবিতেও তারা প্রভাব বাড়াতে পারে।
জলবায়ু ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম বা সিবিএএম নিয়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোর উদ্বেগ রয়েছে। ভারত, রাশিয়া ও চীন একসঙ্গে কাজ করলে পরিবেশ সুরক্ষা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য তৈরির জন্য চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের সঙ্গেও ব্রিকসের সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিকল্প অংশীদারত্ব তৈরি হলে পশ্চিমা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
জ্বালানি খাতেও ভারত-রাশিয়া-চীন সহযোগিতার বড় সম্ভাবনা রয়েছে। রাশিয়ার বিপুল জ্বালানি সম্পদ, চীনের উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং ভারতের বড় ও ক্রমবর্ধমান জ্বালানি বাজার একে অপরের পরিপূরক হতে পারে। পারমাণবিক জ্বালানি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ অবকাঠামো ও গবেষণায় যৌথ উদ্যোগ তিন দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে পারে।
ভারতের জন্য এর সম্ভাব্য সুফল আরো বিস্তৃত। প্রতিরক্ষা, গাড়ি, ইলেকট্রনিকস, ইস্পাত, ভারী প্রকৌশল, তেল-গ্যাস ও ওষুধ শিল্পে বড় বাজার ও নতুন সরবরাহব্যবস্থা তৈরি হতে পারে। রাশিয়ার জ্বালানি সম্পদে ভারতের প্রবেশ আরও স্থিতিশীল হতে পারে এবং চীনের নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি ভারতের কাজে লাগতে পারে।
ওষুধ শিল্পকেও সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভারতীয় ওষুধ কোম্পানিগুলো ব্রিকসের বড় বাজারে আরও প্রবেশাধিকার পেতে পারে। একই সঙ্গে জৈবপ্রযুক্তি, ওষুধ গবেষণা এবং ওষুধ তৈরির কাঁচামালের সরবরাহব্যবস্থায় সহযোগিতা বাড়লে আঞ্চলিক উৎপাদন সক্ষমতা শক্তিশালী হতে পারে।
তবে ভারত, রাশিয়া ও চীনকে ঘিরে কোনো আনুষ্ঠানিক নতুন জোট গঠনের সম্ভাবনা এখনই বাস্তবতা নয়। তিন দেশের মধ্যে কৌশলগত স্বার্থ, রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় পার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে ভারত ও চীনের মধ্যে সীমান্ত ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা রয়েছে। ফলে বড় চ্যালেঞ্জ হবে—এসব মতপার্থক্য রেখেই অভিন্ন স্বার্থে কতটা সহযোগিতা করা যায়।
ব্রিকসের ভবিষ্যৎ শক্তি কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক বা রাজনৈতিক জোট গঠনের মধ্যে নয়; বরং ভিন্ন স্বার্থ ও নীতি বজায় রেখেও সদস্য দেশগুলো কতটা অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা গড়ে তুলতে পারে, তার ওপর নির্ভর করবে। ভারত, রাশিয়া ও চীন সেই সহযোগিতাকে গভীর করতে পারলে ব্রিকস বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূরাজনীতির ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।
সূত্র: সাউথ এশিয়া মনিটর