আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে। এই সময়ে দেশটিতে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে কিছু সাফল্য পেলেও নারী শিক্ষা, মানবাধিকার, অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রে বড় ধরনের ব্যর্থতার মুখে পড়েছে তালেবান সরকার।
২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো বাহিনীর প্রত্যাহারের পর তালেবান আবার কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেয়। গত পাঁচ বছরে দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। আগে যেসব এলাকায় সাধারণ মানুষের চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, সেখানে এখন তুলনামূলকভাবে নিরাপদে যাতায়াত করা সম্ভব হচ্ছে। আইএস-খোরাসানসহ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হুমকিও অনেকটাই দুর্বল করতে পেরেছে তালেবান।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও দেশকে সচল রাখতে সক্ষম হয়েছে তালেবান সরকার। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ার পরও উন্নত কর ও শুল্ক আদায়, প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ, প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলন এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থনীতি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে। কুশ তেপা খাল, তাপি গ্যাস পাইপলাইন এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন প্রকল্পসহ বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রমও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তবে সরকারি অর্থব্যবস্থায় স্বচ্ছতার অভাব ও দুর্নীতির অভিযোগ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে।
তবে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হচ্ছে তালেবানের সামাজিক নীতিকে। দেশটিতে মেয়েদের ষষ্ঠ শ্রেণির পর আনুষ্ঠানিক আধুনিক শিক্ষার সুযোগ বন্ধ রয়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতে নারী চিকিৎসক, শিক্ষক ও অন্যান্য পেশাজীবীর সংকট আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থায় আধুনিক শিক্ষার পরিবর্তে ধর্মীয় শিক্ষার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া সরকারে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও রাজনৈতিক শক্তির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারেনি তালেবান। ক্ষমতা ক্রমেই তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার নেতৃত্বাধীন একটি সীমিত গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পায়নি তালেবান। কয়েকটি দেশ কাবুলের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখলেও এখনো ব্যাপক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করতে পারেনি তারা। নারী শিক্ষা ও অধিকার নিয়ে কঠোর বিধিনিষেধ আফগানিস্তানকে আন্তর্জাতিকভাবে আরও বিচ্ছিন্ন করে তুলছে।
বর্তমানে তালেবানের ক্ষমতার ওপর বড় কোনো সামরিক হুমকি নেই এবং রাজনৈতিক বিরোধীরাও বিভক্ত। তবে দীর্ঘমেয়াদে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ ও সরকারের প্রতি ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতাই তালেবানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
পাঁচ বছর পর তালেবান আফগানিস্তানের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ সুদৃঢ় করতে পারলেও দেশটি কী ধরনের রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলবে, সেই মৌলিক প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো দিতে পারেনি। নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা অর্জনের পাশাপাশি জনগণের আস্থা, নারী শিক্ষা, অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনই এখন তালেবান সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।