ইসলামের নাম ব্যবহার করে ঘৃণা, অপবাদ ও গালাগালিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানো যাবে না। কোনো ইসলামি দল বা আন্দোলনের পরিচয় শুধু স্লোগান কিংবা আবেগে নয়, বরং তাদের আচরণ, নৈতিকতা ও বাস্তব কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হতে হবে। রোববার এক ফেসবুক পোস্টে এই মন্তব্য করেছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম।
আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, ইসলামি দল বা আন্দোলন যদি নৈতিকতার নীতি বাদ দিয়ে ঘৃণায় পূর্ণ হয় এবং অপবাদ ও গালাগালিকে প্রতিদিনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, তাহলে সেই আন্দোলনের অর্থ কী? ইসলামি চেতনার নামে পরিচালিত কোনো আন্দোলন রাগ, আবেগ ও উসকানির ওপর নির্ভর করলে তা দুর্বল হয়ে পড়ে।
এর আগে শনিবার রাতে মালয়েশিয়ার বানগিতে ‘থ্রি জেনারেশনস অ্যাপ্রিসিয়েশন ডিনার’ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন আনোয়ার। ওয়াদাহ পেমবেরদাসান উমাত মালয়েশিয়া, অ্যাংকাতান বেলিয়া ইসলাম মালয়েশিয়া ও মালয়েশিয়ান ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব ইসলামিক স্টুডেন্টস যৌথভাবে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে। সেখানে তিনি ইসলামি আন্দোলনের শক্তির ভিত্তি হিসেবে জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের ওপর গুরুত্ব দেন।
আনোয়ার বলেন, কোনো দেশের সংগ্রাম শুধু আবেগ ও উত্তেজনার ওপর নির্ভর করতে পারে না। জ্ঞান মানুষের মধ্যে সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ তৈরি করে। তার ভাষায়, ‘মাদানি’ রাষ্ট্র গড়তেও জ্ঞানকে ভিত্তি হিসেবে শক্তিশালী করতে হবে।
ইসলামি আন্দোলনের ক্ষেত্রে তিনি ‘উসরা’ এবং ইসলামী ‘তুরাথ’ বা ঐতিহ্যগত জ্ঞানভাণ্ডারের গুরুত্বের কথাও তুলে ধরেন। তার মতে, আধুনিক সময়ে ইসলামের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়লেও ইসলামি দল ও সংগঠনগুলোর একটি বড় দুর্বলতা হলো তারা অনেক ক্ষেত্রে ইসলামী জ্ঞান-ঐতিহ্যের সঙ্গে পর্যাপ্তভাবে যুক্ত নয়।
গত ১৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় তুরাথ আলেম সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তব্যেও আনোয়ার একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ইসলামি সচেতনতা ও জ্ঞানচর্চা বাড়লেও অনেক ইসলামি আন্দোলন ও দলের সঙ্গে ঐতিহ্যগত ইসলামী জ্ঞানভাণ্ডারের সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে মতের সংঘাত অনেক সময় কঠোর ও নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে এবং সেখানে প্রজ্ঞা, ধৈর্য ও গবেষণার ঘাটতি দেখা যায়।
তিনি বলেন, ইসলামী ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ আলেমদের জ্ঞানকে শুধু নিজেদের বক্তব্যের সমর্থন হিসেবে ব্যবহার করলে হবে না; সেই জ্ঞানকে যুক্তি ও চিন্তার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। তার মতে, ইসলামি আন্দোলনের নেতৃত্বকে জ্ঞান, নৈতিকতা ও আদর্শের সমন্বয়ে কাজ করতে হবে।
আনোয়ার একই সঙ্গে ইসলামি আন্দোলনের কয়েকটি দায়িত্বের কথাও উল্লেখ করেন। এর মধ্যে রয়েছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান, ‘তাকফিরি’ চিন্তার বিরোধিতা, চরম দারিদ্র্য দূর করার চেষ্টা এবং একই সঙ্গে শিষ্টাচার, নৈতিকতা ও জাতীয় পরিচয়ের প্রতি সম্মান বজায় রাখা।
তার বক্তব্যে ‘তাকফিরি’ চিন্তার বিরোধিতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামি রাজনীতি বা আন্দোলনের নামে ভিন্নমতাবলম্বীদের সহজে ধর্মের বাইরে ঠেলে দেওয়ার প্রবণতা সমাজে বিভাজন বাড়াতে পারে—এমন উদ্বেগের বিপরীতে আনোয়ার জ্ঞান, নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
আনোয়ারের সাম্প্রতিক বক্তব্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসঙ্গও এসেছে। ১৯ সেপ্টেম্বরের তুরাথ সম্মেলনে তিনি বলেন, ইসলামি দাওয়াহ ও জ্ঞানচর্চায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হতে পারে। তবে নৈতিকতা ও আদর্শের কাঠামো ছাড়া এ প্রযুক্তি ক্ষতির কারণও হতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
সব মিলিয়ে আনোয়ার ইব্রাহিমের সাম্প্রতিক বক্তব্যে ইসলামি আন্দোলন সম্পর্কে তিনটি বিষয় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে—জ্ঞান, নৈতিকতা ও দায়িত্বশীল সংগ্রাম। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ইসলামের নামে পরিচালিত কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক আন্দোলন শুধু আবেগ, স্লোগান কিংবা ক্ষোভের ওপর দাঁড়ালে তা টেকসই হতে পারে না। ইসলামী জ্ঞান-ঐতিহ্য, যুক্তিবোধ, শিষ্টাচার ও মানুষের কল্যাণকে আন্দোলনের ভিত্তিতে রাখতে হবে।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী এমন এক সময়ে এই মন্তব্য করলেন, যখন দেশটির রাজনীতিতে ইসলাম ও মালয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্কও রয়েছে। তবে তার সাম্প্রতিক বক্তব্যের মূল বিষয় কোনো নির্দিষ্ট দলকে সমর্থন বা বিরোধিতা নয়; বরং ইসলামি পরিচয় ব্যবহারকারী সংগঠনগুলোর রাজনৈতিক ও সামাজিক আচরণে নৈতিকতা, জ্ঞান ও দায়িত্বশীলতা বজায় রাখার আহ্বান।
তার বক্তব্যের সারকথা হলো—ইসলামের নামে ঘৃণা, অপবাদ ও গালাগালি কোনো আদর্শিক সংগ্রামের বিকল্প হতে পারে না। ইসলামী আন্দোলনের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করবে তার জ্ঞানচর্চা, নৈতিক আচরণ এবং সমাজের জন্য বাস্তব অবদানের ওপর।
সূত্র: দ্য ভাইবস, বার্নামা ও প্রাইম মিনিস্টারস অফিস অব মালয়েশিয়া