পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ এখন আর কেবল পরিকল্পিত একটি প্রশাসনিক রাজধানী নয়; জনসংখ্যা, আবাসন, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও পার্শ্বনগর বিস্তারের কারণে এটি ক্রমে একটি বৃহৎ মহানগর অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। কিন্তু শহরের এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রশাসনিক কাঠামো কতটা বদলেছে—সেই প্রশ্নই এখন সামনে আসছে।
২০২৩ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী ইসলামাবাদ ক্যাপিটাল টেরিটরির জনসংখ্যা ২৩ লাখ ৬০ হাজারের বেশি। জনসংখ্যা বৃদ্ধির বার্ষিক হার ২ দশমিক ৮ শতাংশ এবং মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৩ শতাংশ এখনো গ্রামীণ এলাকায় বসবাস করে। অর্থাৎ ইসলামাবাদ একই সঙ্গে একটি জাতীয় রাজধানী, দ্রুত সম্প্রসারিত নগরাঞ্চল এবং বিস্তৃত গ্রামীণ ভূখণ্ড—এই তিনটি বাস্তবতা ধারণ করছে।
সমস্যার বড় জায়গাটি এখানেই। ইসলামাবাদের প্রশাসনে একাধিক সরকারি প্রতিষ্ঠান একই ভৌগোলিক এলাকায় বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করে। ফেডারেল মন্ত্রণালয়, ক্যাপিটাল ডেভেলপমেন্ট অথরিটি বা সিডিএ, ইসলামাবাদ ক্যাপিটাল টেরিটরি প্রশাসনসহ বিভিন্ন সংস্থার দায়িত্ব ও ক্ষমতা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। ফলে সড়ক, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি, আবাসন, পরিবেশ কিংবা নগর সম্প্রসারণের মতো বিষয়ে সাধারণ নাগরিকের কাছে সবসময় পরিষ্কার থাকে না—চূড়ান্তভাবে দায়ী প্রতিষ্ঠানটি আসলে কোনটি।
এই প্রশাসনিক বিভাজনের সঙ্গে রাজনৈতিক জবাবদিহিতার প্রশ্নটিও যুক্ত। ইসলামাবাদের বাসিন্দারা বিভিন্ন নির্বাচিত ফেডারেল প্রতিনিধির মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিতে অংশ নিলেও নগরের দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ নির্বাচিত স্থানীয় সরকার কাঠামো নেই। ফলে কোনো এলাকার রাস্তা খারাপ হলে, পানি সরবরাহে সংকট দেখা দিলে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যর্থ হলে কিংবা অপরিকল্পিত নগরায়ণের সমস্যা তৈরি হলে নাগরিকরা কাকে রাজনৈতিকভাবে দায়ী করবেন, সেই প্রশ্নটি জটিল হয়ে ওঠে।
তাই ইসলামাবাদের জন্য একটি নির্বাচিত আঞ্চলিক সরকার বা বিশেষ ধরনের ক্যাপিটাল টেরিটরি সরকার প্রতিষ্ঠা করা দরকার। জাতীয় রাজধানী হিসেবে যেসব বিষয় ফেডারেল সরকারের হাতে থাকবে—যেমন প্রতিরক্ষা, জাতীয় নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি, সংসদ, কূটনৈতিক মিশন ও কেন্দ্রীয় সরকারি প্রতিষ্ঠান—সেগুলো ফেডারেল কর্তৃপক্ষ পরিচালনা করবে। অন্যদিকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবেশ, স্থানীয় পরিবহন, পানি, পয়োনিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য নাগরিক সেবা নির্বাচিত ইসলামাবাদ সরকারের অধীনে দেওয়া যেতে পারে।
এ ধরনের কাঠামোয় একটি নির্বাচিত অ্যাসেম্বলি স্থানীয় আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন এবং প্রশাসনিক তদারকির দায়িত্ব নিতে পারে। একই সঙ্গে একজন শক্তিশালী নির্বাচিত প্রধান নির্বাহী—চিফ মিনিস্টার বা মেয়র—নগর সরকারের নেতৃত্ব দিতে পারেন। তবে ক্ষমতা হস্তান্তর শুধু রাজনৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকলে কাঙ্ক্ষিত ফল নাও আসতে পারে। স্থানীয় সরকারের হাতে বাস্তব প্রশাসনিক ক্ষমতা ও পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক সম্পদ না থাকলে নতুন নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানও শেষ পর্যন্ত আরেকটি প্রশাসনিক স্তরে পরিণত হতে পারে।
ইসলামাবাদের জন্য অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরার উদাহরণও আলোচনায় এসেছে। অস্ট্রেলিয়ান ক্যাপিটাল টেরিটরিতে একটি নির্বাচিত আইনসভা একই সঙ্গে আঞ্চলিক ও স্থানীয় সরকারের অনেক দায়িত্ব পালন করে। ২৫ সদস্যের আইনসভা আইন প্রণয়ন ও সরকারি ব্যয়ের ওপর নজরদারি করে এবং একজন চিফ মিনিস্টার আঞ্চলিক সরকার পরিচালনা করেন। ক্যানবেরার কাঠামো হুবহু ইসলামাবাদে প্রয়োগের প্রস্তাব নয়; বরং জাতীয় রাজধানীর ভেতরেও নির্বাচিত স্থানীয় শাসন এবং ফেডারেল সরকারের ভূমিকা পাশাপাশি থাকতে পারে।
ইসলামাবাদের নগর ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব। আবাসনকে পরিবহন থেকে আলাদা করে দেখা যায় না; সড়ক পরিকল্পনাকে ভূমি ব্যবহারের পরিকল্পনা থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না; নগর সম্প্রসারণের সঙ্গে পানি, পয়োনিষ্কাশন ও পরিবেশের প্রশ্ন সরাসরি যুক্ত। ফলে পৃথক পৃথক সংস্থার মাধ্যমে এসব সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত মহানগর পরিকল্পনা প্রয়োজন।
পরিবেশের প্রশ্নটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামাবাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য তার সবুজ এলাকা, পাহাড়, বন ও প্রাকৃতিক জলাধার। কিন্তু নগর সম্প্রসারণের সঙ্গে এসব সম্পদের ওপর চাপ বাড়ছে। পরিকল্পিত প্রশাসনিক কাঠামো থাকলে উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে সমন্বয় করার সুযোগ বাড়তে পারে। একইভাবে গণপরিবহনের ক্ষেত্রেও শুধু বাসের রুট নির্ধারণ যথেষ্ট নয়; সড়ক, পার্কিং, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, আবাসন এবং ভূমি ব্যবহারের পরিকল্পনাকে একই কাঠামোর মধ্যে বিবেচনা করতে হয়।
অর্থনৈতিক ক্ষমতার প্রশ্নটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। স্থানীয় সরকারের দায়িত্ব দেওয়া হলে তার নিজস্ব রাজস্বের উৎস থাকা প্রয়োজন। সম্পত্তি করসহ স্থানীয় করব্যবস্থা এ ক্ষেত্রে একটি সম্ভাব্য উৎস হতে পারে। আবার জাতীয় রাজধানী হিসেবে ইসলামাবাদে সংসদ, কূটনৈতিক মিশন ও ফেডারেল প্রতিষ্ঠানগুলোর উপস্থিতির কারণে অতিরিক্ত ব্যয়ের যে চাপ তৈরি হয়, তার জন্য ফেডারেল সরকারের কাছ থেকে আলাদা ক্যাপিটাল গ্রান্টের ব্যবস্থাও থাকতে পারে।
তবে ইসলামাবাদের জন্য নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠার ধারণা পাকিস্তানের সাংবিধানিক কাঠামো ও ফেডারেল রাজধানীর বিশেষ মর্যাদার সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্য করা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ইসলামাবাদকে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রদেশে রূপান্তর করাই একমাত্র পথ—এমন নয়। বরং ফেডারেল সরকারের জাতীয় দায়িত্ব এবং ইসলামাবাদের বাসিন্দাদের দৈনন্দিন নাগরিক প্রশাসনের দায়িত্ব পৃথকভাবে নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এই আলোচনায় সাম্প্রতিক একটি রাজনৈতিক উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের জুনে পাকিস্তানের পরিকল্পনামন্ত্রী একটি নির্বাচিত ইসলামাবাদ ক্যাপিটাল টেরিটরি অ্যাসেম্বলি এবং স্থানীয়ভাবে দায়বদ্ধ প্রধান নির্বাহী প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। প্রস্তাবিত কাঠামোয় ২৭ সদস্যের অ্যাসেম্বলি এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবেশ ও জনসেবার মতো ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বায়ত্তশাসনের কথা রয়েছে, যদিও কিছু দায়িত্ব ফেডারেল সরকারের অধীনেই থাকবে।
এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে ইসলামাবাদের শাসনব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে—জাতীয় রাজধানী হিসেবে ফেডারেল সরকারের কর্তৃত্ব বজায় রেখেও স্থানীয় নাগরিক সেবার জন্য একটি পৃথক নির্বাচিত রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ তৈরি হবে। তবে সেই কর্তৃপক্ষের ক্ষমতার সীমানা, অর্থের উৎস, ফেডারেল সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় এবং সিডিএসহ বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা কী হবে, তা স্পষ্ট করা না হলে কাঠামোগত জটিলতা পুরোপুরি দূর নাও হতে পারে।
ইসলামাবাদের অভিজ্ঞতা মূলত একটি বৃহত্তর নগর-শাসনের প্রশ্ন সামনে আনে। একটি শহর যখন দ্রুত জনসংখ্যা, অর্থনীতি ও ভৌগোলিক পরিসরে বাড়তে থাকে, তখন পুরোনো প্রশাসনিক কাঠামো কতদিন কার্যকর থাকে—সেটিই বড় প্রশ্ন। রাজধানী হিসেবে জাতীয় সরকারের উপস্থিতি প্রয়োজন, কিন্তু রাজধানীতে বসবাসকারী মানুষের দৈনন্দিন নাগরিক সমস্যার জন্যও একটি স্পষ্ট জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা প্রয়োজন।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু ‘ইসলামাবাদ কে পরিচালনা করে’—এতটুকু নয়; বরং ‘ইসলামাবাদের নাগরিকদের কাছে কে দায়বদ্ধ’—সেটিও। জাতীয় রাজধানীর নিরাপত্তা, কূটনীতি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ফেডারেল সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা এবং স্থানীয় নাগরিক সেবা নির্বাচিত সরকারের হাতে থাকা—এই দুই স্তরের দায়িত্বের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় তৈরি করা গেলে ইসলামাবাদের দ্রুত নগরায়ণের সঙ্গে প্রশাসনিক ব্যবস্থাকেও সামঞ্জস্যপূর্ণ করা সম্ভব হতে পারে।
সূত্র: সাউথ এশিয়া মনিটরে প্রকাশিত ইসলামাবাদের ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি সারা নাজির এর লেখা ‘হু গভর্নস ইসলামাবাদ? এ ক্যাপিটাল উইদাউট ইটস গভর্নেন্স’।