মালয়েশিয়ায় নারীদের মধ্যে মাদক অপব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে। ২০২৫ সালে দেশটিতে মাদকের অপব্যবহারের সঙ্গে জড়িত হিসেবে শনাক্ত নারীর সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ৩ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে। ন্যাশনাল অ্যান্টি-ড্রাগ এজেন্সির (এএডিকে) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এমন নারীর সংখ্যা ছিল ৮ হাজার ৬৩৮ জন। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ হাজার ৯২৬ জনে। অর্থাৎ, এক বছরে শনাক্ত নারীর সংখ্যা বেড়েছে ২৮৮ জন।
এএডিকে মহাপরিচালক দাতুক রুসলিন জুসোহের জানিয়েছেন, ২০২৫ সালে মাদকের অপব্যবহারে শনাক্ত নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশের বয়স ১৯ থেকে ৩৯ বছর। এই বয়সসীমায় শনাক্ত হয়েছেন ৬ হাজার ১৯৩ জন। ৪০ থেকে ৫৯ বছর বয়সি ছিলেন ২ হাজার ৫৬৭ জন এবং কিশোরীর সংখ্যা ছিল ১৬৬।
নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক ছিল অ্যামফেটামিন-টাইপ স্টিমুল্যান্টস (এটিএস)। এ ধরনের মাদক ব্যবহারের সঙ্গে জড়িত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন ৭ হাজার ৫৮৮ জন। এরপর রয়েছে অপিয়েটস ৭৬২ জন, ক্যানাবিস ১৩৮ জন, সাইকোট্রপিক পিল ১১৯ জন এবং কেটামিন ও কোকেনসহ অন্যান্য মাদক ৩১৯ জন। ৮ হাজার ৯২৬ জনের মোট সংখ্যার হিসাবে এটিএস-সংশ্লিষ্ট শনাক্ত নারীর অংশ প্রায় ৮৫ শতাংশ।
এএডিকে বলছে, সামগ্রিকভাবে মাদকের অপব্যবহারে নারীর সংখ্যা পুরুষের তুলনায় অনেক কম। ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, শনাক্ত মাদক ব্যবহারকারীদের মধ্যে নারীর অংশ ছিল ৪ দশমিক ৭ শতাংশ, আর পুরুষের অংশ ৯৫ দশমিক ৩ শতাংশ। তবে সংস্থাটির বক্তব্য, সংখ্যাগতভাবে নারীরা সংখ্যালঘু হলেও তাদের মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে পুরুষদের তুলনায় আলাদা এবং অনেক ক্ষেত্রে জটিল বাধার মুখে পড়তে হয়।
এএডিকে মহাপরিচালক রুসলিন জুসোহ বলেন, জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর (ইউএনওডিসি)-এর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নারীদের চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে সামাজিক, আর্থিক ও মানসিক নানা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। মাদকাসক্ত নারীদের সমাজে পুরুষদের তুলনায় বেশি নেতিবাচকভাবে দেখা হয়—ফলে অনেক নারী সামাজিক কলঙ্কের আশঙ্কায় চিকিৎসা নিতে পিছিয়ে থাকেন। পাশাপাশি অনেক নারী অর্থনৈতিকভাবে স্বামী বা সঙ্গীর ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় চিকিৎসার খরচ, যাতায়াত এবং চিকিৎসাকেন্দ্রে যাওয়ার স্বাধীনতাও সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সঙ্গী নিজেও মাদক ব্যবহারকারী হলে তিনি নারীকে চিকিৎসা নিতে বাধা দিতে পারেন।
নারীদের মাদক সমস্যার এই প্রবণতা অবশ্য মালয়েশিয়ায় একেবারে নতুন নয়। ২০১৭ সালে মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি টেকনোলজি মারা (ইউআইটিএম)-এর গবেষকদের প্রকাশিত একটি গবেষণায়ও দেশটিতে নারীদের মাদক ব্যবহারের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন এবং চিকিৎসা গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের বিশেষ বাধাগুলো তুলে ধরা হয়েছিল। গবেষণাটিতে বলা হয়, ন্যাশনাল অ্যান্টি-ড্রাগ এজেন্সির তৎকালীন পরিসংখ্যানে নারীদের অংশ ২০১০ সালের ১ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ২০১৫ সালে ৩ দশমিক ৮ শতাংশে উঠেছিল। গবেষকেরা একই সঙ্গে উল্লেখ করেন, এ ধরনের সরকারি পরিসংখ্যান মূলত শনাক্ত বা নথিভুক্ত ঘটনাকে প্রতিফলিত করে; প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে।
ওই গবেষণায় নারীদের মাদক ব্যবহারের সঙ্গে দারিদ্র্য, পারিবারিক ও সামাজিক অস্থিরতা, সহিংসতা ও মানসিক আঘাত এবং সামাজিক চাপের মতো বিভিন্ন কারণের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করা হয়। গবেষণাটিতে আরো বলা হয়, কিছু ক্ষেত্রে শারীরিক সৌন্দর্য ও ওজন কমানোর আকাঙ্ক্ষাও মাদক ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। তবে এসব কারণকে বর্তমান পরিস্থিতির একমাত্র বা সরাসরি কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এগুলো বিভিন্ন গবেষণায় চিহ্নিত সম্ভাব্য সামাজিক ও ব্যক্তিগত ঝুঁকি।
মালয়েশিয়ায় নারীদের জন্য মাদক চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়টিও সাম্প্রতিক সময়ে গুরুত্ব পেয়েছে। এএডিকে জানিয়েছে, ২২ আগস্ট ২০২৫ থেকে কার্যকর হওয়া সংশোধিত আইনের অধীনে মাদকনির্ভর ব্যক্তিরা স্বেচ্ছায় কমিউনিটি-ভিত্তিক চিকিৎসা নিতে পারেন। নারীরা পুনর্বাসন কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে কমিউনিটি চিকিৎসা অথবা নেশামুক্তি পুনর্বাসনকেন্দ্রে (পুসপেন) বিনামূল্যে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। দুর্গম ও গ্রামীণ এলাকার নারীদের চিকিৎসা পাওয়ার ক্ষেত্রে যাতায়াতের বাধা কমাতে এএডিকে মোবাইল ট্রিটমেন্ট অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন উইদাউট বর্ডার্স (এমআরটি) সেবাও পরিচালনা করছে।
সাম্প্রতিক আঞ্চলিক মাদক পরিস্থিতি নিয়ে ইউএনওডিসির ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে মালয়েশিয়ায় ২০২৫ সালের মাদক চিকিৎসা গ্রহণের তথ্যও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এতে দেশটির চিকিৎসা ব্যবস্থায় মাদকের ধরন ও লিঙ্গভিত্তিক তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে, যা দেখায় যে নারীদের মাদক ব্যবহারকে পৃথকভাবে পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসা করার প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
মালয়েশিয়ার সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান তাই শুধু নারীদের মধ্যে শনাক্ত মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টিই তুলে ধরছে না; একই সঙ্গে কোন বয়সের নারীরা বেশি ঝুঁকিতে, কোন ধরনের মাদক বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে এবং চিকিৎসা গ্রহণে কী ধরনের সামাজিক ও আর্থিক বাধা রয়েছে—সেসব প্রশ্নও সামনে আনছে। ২০২৪ সালের ৮ হাজার ৬৩৮ জন থেকে ২০২৫ সালে ৮ হাজার ৯২৬ জনে উন্নীত হওয়া সংখ্যা নারীদের মাদক সমস্যা মোকাবিলায় প্রতিরোধ, দ্রুত শনাক্তকরণ, সহজলভ্য চিকিৎসা এবং পুনর্বাসন কার্যক্রমকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার দিকে ইঙ্গিত করছে।
সূত্র: নিউ স্ট্রেইটস টাইমস, ইউএনওডিসি ও দ্য স্টার