যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা জয়ী হলে ইউরোপের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কের উন্নতির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে এর উল্টো প্রভাবও পড়তে পারে ইউরোপের ওপর। ইউরোপের উগ্র ডানপন্থি রাজনৈতিক শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে উদ্বেগ কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে ইউক্রেনকে রাশিয়ার সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো শান্তিচুক্তিতে রাজি করাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপ বাড়ানোর আশঙ্কাও রয়েছে।
মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের জনমত জরিপে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের গড় ব্যবধান প্রায় ৮ পয়েন্ট। দলটি এক বা দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলে ইউরোপের জন্য সম্ভাব্য এসব ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ইউরোপের নীতিনির্ধারকদের কাছে ডেমোক্র্যাটদের জয় স্বস্তির খবর মনে হলেও, এর রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
কার্নেগি ইউরোপের গবেষক ক্যাথরিন ফিয়েশির মতে, ডেমোক্র্যাটদের জয়কে অনেকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন যে গণতন্ত্র শেষ পর্যন্ত ঘুরে দাঁড়াতে পারে। এতে ইউরোপে স্বৈরাচারী শাসন প্রতিষ্ঠার আশঙ্কা নিয়ে উদ্বেগ কমে যেতে পারে। অথচ ইউরোপের কয়েকটি দেশে উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তির প্রভাব বাড়ছে।
ফ্রান্সে আগামী ১৮ এপ্রিল অনুষ্ঠেয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে উগ্র ডানপন্থী রাজনীতিক মেরিন লো পেনের জনসমর্থন প্রায় ৩৪ শতাংশ। ফিয়েশির আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্র্যাটদের জয় ইউরোপের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অতিরিক্ত আত্মতুষ্টি তৈরি করতে পারে।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মানুষের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে মনোভাবেও পার্থক্য রয়েছে। ২০২৫ সালের জুনে ইউরোপীয় পররাষ্ট্র সম্পর্ক কাউন্সিলের (ইসিএফআর) এক জরিপে দেখা যায়, পশ্চিম ইউরোপের অধিকাংশ মানুষ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। অন্যদিকে, পূর্ব ইউরোপের অধিকাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভালোভাবেই কাজ করছে। পূর্ব ইউরোপে ডানপন্থী ভোটারের অনুপাতও তুলনামূলক বেশি।
গ্রিসের অভিবাসনমন্ত্রী থানস প্লেভরিস বলেছেন, আশ্রয়প্রার্থী ও অর্থনৈতিক অভিবাসীদের বিষয়ে ইউরোপের জনমত এমনিতেই কঠোর হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও এ ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে। ওয়াশিংটন এখন সীমান্ত সুরক্ষা, অভিবাসীদের নিরুৎসাহিত করা, তাঁদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো এবং নিয়ম ভাঙার পরিণতির ওপর বেশি জোর দিচ্ছে।
ফ্রান্সে লো পেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে ইউরোপের জন্য আরেক ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। তাঁর প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে আগেভাগে অবসরে যাওয়ার সুবিধা দিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজেটে ফ্রান্সের অবদান কমানো, ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা হ্রাস করা এবং ইউরো ছেড়ে অবমূল্যায়িত ফ্রাঁ চালুর সম্ভাবনা। কিয়েল ইনস্টিটিউটের ইউক্রেন সহায়তা ট্র্যাকার অনুযায়ী, ফ্রান্স সামরিক সহায়তা কমালে ইউক্রেনের বিদেশি সামরিক সহায়তার ৩ দশমিক ৫ শতাংশ কমে যেতে পারে।
ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও ইউরোপের উদ্বেগ রয়েছে। ফিয়েশির আশঙ্কা, ট্রাম্প রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সমঝোতা করে ইউক্রেনকে এমন শান্তিচুক্তিতে রাজি করানোর চেষ্টা করতে পারেন, যাতে দেশটিকে পূর্ব দনবাসের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিতে হয়। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এ ধরনের সমঝোতাকে কৌশলগত ভুল বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, এতে ভবিষ্যতে আবার যুদ্ধ শুরু হতে পারে। ইউক্রেনের অধিকাংশ মানুষও এ ধরনের চুক্তির বিরোধী।
ইউক্রেনের ওপর চাপ তৈরিতে ট্রাম্প আগেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত সহায়তাকে কাজে লাগিয়েছেন। ইউক্রেনের দিকে ধেয়ে আসা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের আগাম সতর্কতা এবং স্টারলিংকের স্যাটেলাইটভিত্তিক যোগাযোগ ও নেভিগেশন-সুবিধা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প দুইবার জেলেনস্কিকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে রাশিয়ার আহ্বানের সঙ্গে সুর মিলিয়েছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূরাজনীতি বিশেষজ্ঞ ভিক্টোরিয়া ভদোভিচেঙ্কো বলেছেন, রাশিয়া ইউরোপের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ক্ষেত্রে একযোগে চাপ বাড়াতে পারে। ইউরোপের বিদ্যমান দুর্বলতাগুলো কাজে লাগিয়ে মস্কো এমন পদক্ষেপ নিতে পারে। তাঁর মতে, মানুষের চিন্তা ও মতামতকে প্রভাবিত করার মাধ্যমে পরিচালিত রাশিয়ার ‘কগনিটিভ ওয়ারফেয়ার’ বা মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বিস্তারের যুদ্ধ এখনো থামেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ইউরোপের আস্থাও কমেছে। বার্টেলসম্যান ফাউন্ডেশনের এক জরিপে দেখা গেছে, ইউরোপের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে দেখেন মাত্র ৩১ শতাংশ মানুষ। ২০২৪ সালে এই হার ছিল ৫১ শতাংশ। একই সময়ে ইউরোপের ৭৩ শতাংশ মানুষ বলেছেন, ইউরোপের উচিত নিজের পথে এগিয়ে যাওয়া। ২০২৪ সালে এমন মত দিয়েছিলেন ৬৩ শতাংশ। মধ্য-ডানপন্থী ও ডানপন্থী ভোটারদের মধ্যেও এ ধারণার প্রতি স্পষ্ট সমর্থন রয়েছে।
ইউরোপীয় কমিশনের বসন্তকালীন ইউরোব্যারোমিটার জরিপে ৬৮ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, বৈশ্বিক সংকট ও নিরাপত্তাঝুঁকি থেকে ইউরোপীয়দের সুরক্ষায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভূমিকা বাড়ানো উচিত। ৩৯ শতাংশের মতে, এটিই হওয়া উচিত ইইউর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
ইসিএফআরের জুনের জরিপেও যুক্তরাষ্ট্রকে মিত্র হিসেবে দেখার প্রবণতা কমে যাওয়ার চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে পূর্ব ও পশ্চিম ইউরোপের ২২ শতাংশ উত্তরদাতা যুক্তরাষ্ট্রকে ‘মিত্র’ হিসেবে দেখেছিলেন। ২০২৫ সালের জুনে এ হার কমে ১১ শতাংশে দাঁড়ায়।
যুক্তরাষ্ট্রের পিউ রিসার্চ সেন্টারের জুনের এক জরিপে ৩৬টি দেশের মানুষের মতামত নেওয়া হয়, যার মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নয়টি দেশ ছিল। জরিপে ৭৬ শতাংশ উত্তরদাতা ট্রাম্পের প্রতি আস্থাহীনতার কথা জানান। আর ৫৭ শতাংশের যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয় ইউরোপের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কের কিছু উন্নতির সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে একটি মধ্যবর্তী নির্বাচন দিয়ে ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে জনমতের এই পরিবর্তন উল্টে দেওয়া বা ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দূর করা সহজ হবে না।
এএম