বিশ্বের অনেক দেশে গ্রীষ্মকাল মানেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) ছাড়া জীবন কল্পনা করা কঠিন। তবে ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি জার্মানিতে এখনও অধিকাংশ বাড়িতে এসি নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ইউরোপে তাপপ্রবাহ তীব্র হওয়ায় পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে এবং দ্রুত বাড়ছে এসির চাহিদা।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষের বাসায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রয়েছে। অথচ ইউরোপে এই হার গড়ে মাত্র ২০ শতাংশ। স্পেনের মতো উষ্ণ দেশে প্রায় অর্ধেক পরিবারে কেন্দ্রীয় কুলিং ব্যবস্থা থাকলেও জার্মানিতে এই হার মাত্র ৬ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তর ইউরোপের দেশগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে এসিকে বিলাসপণ্য হিসেবে দেখা হতো। কারণ, অতীতে সেখানে গ্রীষ্মকাল তুলনামূলক সহনীয় ছিল। তবে এখন পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে। জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্তঃসরকারি প্যানেল (আইপিসিসি) জানিয়েছে, পশ্চিম ইউরোপে চরম তাপপ্রবাহের ঘটনা জলবায়ু মডেলের পূর্বাভাসের চেয়েও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ইউরোপীয় গবেষণা উদ্যোগ ক্লাইমামিটার-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের জুন মাসে ইউরোপের তাপমাত্রা বিংশ শতাব্দীর শেষভাগের একই ধরনের আবহাওয়ার তুলনায় ২ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। এর ফলে শীতলীকরণ ব্যবস্থার জন্য বিদ্যুতের চাহিদাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এই পরিবর্তনের প্রভাব ইতোমধ্যেই বাজারে পড়েছে। শিল্পসংস্থা ইউরোভেন্ট-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে জার্মানিতে এসি ও কুলিং ইউনিটের চাহিদা ৭৫ শতাংশ বেড়েছে। তবে চাহিদা বাড়লেও ইউরোপের অনেক মানুষ এখনও এসি ব্যবহারে অনীহা দেখাচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর অন্যতম কারণ ইউরোপের আবাসন ব্যবস্থা। জার্মানি ও উত্তর ইউরোপের অধিকাংশ বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে শীতকালে ঘরের তাপ ধরে রাখার জন্য, গরমে ঘর ঠান্ডা রাখার জন্য নয়। পুরোনো ভবনে নতুন করে এসি বসানোও ব্যয়বহুল এবং প্রযুক্তিগতভাবে জটিল। ঐতিহাসিক শহরগুলোতে স্থাপত্য সংরক্ষণবিষয়ক বিধিনিষেধও বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
এ ছাড়া জার্মানি, ডেনমার্ক ও অস্ট্রিয়ার মতো দেশে জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই ভাড়া বাসায় থাকেন। বাড়ির মালিকের অনুমতি ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে এসি স্থাপন করা যায় না। ফলে অনেকেই বিকল্প হিসেবে পর্দা টেনে রাখা, ফ্যান ব্যবহার বা ঘরের নিরোধক ব্যবস্থা উন্নত করার মতো পদ্ধতির ওপর নির্ভর করেন।
অন্যদিকে, উচ্চ বিদ্যুৎমূল্যও একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। ইউরোপীয় ইউনিয়নজুড়ে পরিচালিত এক জরিপে ৩৮ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, তারা গরমের সময় ঘর পর্যাপ্ত ঠান্ডা রাখার খরচ বহন করতে পারেন না। গবেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শীতলীকরণ ব্যবস্থা যত বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠবে, নিম্ন আয়ের মানুষ তত বেশি ঝুঁকিতে পড়বেন।
তবে এসির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে পরিবেশগত উদ্বেগও রয়েছে। বিশ্বব্যাপী মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রায় ১০ শতাংশই শীতলীকরণে ব্যয় হয়। জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ ব্যবহারের কারণে কার্বন নিঃসরণ বাড়ে, যা আবার বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে আরও ত্বরান্বিত করে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যাপক এসি ব্যবহার বাইরের তাপমাত্রাও কয়েক ডিগ্রি পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে।
এ কারণে ইউরোপে পরিবেশবান্ধব বিকল্পের দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নতুন ভবন এমনভাবে নকশা করা হচ্ছে যাতে প্রাকৃতিকভাবে বাতাস চলাচল করতে পারে এবং তাপ কম ধরে রাখে। পাশাপাশি সানশেড, ছাউনি, তাপ প্রতিরোধী নির্মাণসামগ্রী, হিট পাম্প, সবুজায়ন, জলাধার এবং জেলা-ভিত্তিক (ডিস্ট্রিক্ট) কুলিং ব্যবস্থার মতো প্রযুক্তি ব্যবহারে জোর দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া সেন্সর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক এসি প্রচলিত ব্যবস্থার তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে সক্ষম বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ইউরোপে শীতের তুলনায় গ্রীষ্মে শীতলীকরণের প্রয়োজনীয়তা দ্রুত বাড়ছে। ফলে দীর্ঘদিন এসিবিহীন জীবনযাপনে অভ্যস্ত জার্মানিসহ উত্তর ইউরোপের দেশগুলোও এখন নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে শুরু করেছে।
সূত্র: ডয়েচে ভেলে
এআরবি