নয়াদিল্লিতে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের পর ভারতকে ঘিরে চীনা গণমাধ্যম ও নীতিনির্ধারণী মহলের ভাষ্য ও দৃষ্টিভঙ্গিতে সূক্ষ্ম পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। সীমান্ত বিরোধ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের কৌশলগত সম্পর্কের প্রচলিত আলোচনার বাইরে চীনের সাম্প্রতিক বক্তব্যে ভারতকে একটি স্বাধীন কৌশলগত শক্তি এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তবে এর অর্থ দুই দেশের সম্পর্কের সব বিরোধ মিটে গেছে—এমন কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
১৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে সাউথ এশিয়া মনিটর বলেছে, ব্রিকস সম্মেলন ঘিরে চীনা সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলোতে ভারতের বিষয়ে শুধু ইতিবাচক সুরই বাড়েনি; বরং চীনের বৃহত্তর বৈশ্বিক বয়ানে ভারতের অবস্থানও কিছুটা বদলে উপস্থাপিত হয়েছে। আগে যেখানে ভারত-চীন সম্পর্ককে প্রধানত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা অথবা হিমালয় সীমান্ত বিরোধের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হতো, সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে সেখানে বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা, বৈশ্বিক দক্ষিণ ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতার বিষয়গুলো বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
১২ সেপ্টেম্বর ব্রিকস সম্মেলনের সাইডলাইনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠকের পর চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়ার প্রতিবেদনে দুই দেশকে সহযোগিতার অংশীদার হিসেবে দেখানোর ওপর জোর দেওয়া হয়। চায়না ডেইলির প্রতিবেদনে শি জিনপিংয়ের বক্তব্য হিসেবে দুই দেশকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, সহযোগিতার অংশীদার’ হিসেবে দেখার কথা তুলে ধরা হয়। চীনা পক্ষের ভাষ্যে একে অপরের উন্নয়নকে হুমকি নয়, সুযোগ হিসেবে দেখার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্যেও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি সীমান্ত প্রশ্ন সমাধানের কথা বলা হয়েছে। সেখানে সীমান্ত এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে ভারতীয় পক্ষের প্রকাশিত বিবরণে সীমান্তে শান্তি বজায় রাখাকে সম্পর্কের অগ্রগতির ‘অপরিহার্য ভিত্তি’ হিসেবে তুলে ধরার পাশাপাশি বাণিজ্য ঘাটতি, সরবরাহব্যবস্থা এবং পূর্বানুমানযোগ্য বাজারসুবিধার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। অর্থাৎ দুই দেশের প্রকাশিত বক্তব্যে অগ্রাধিকারের জায়গায় পার্থক্যও রয়েছে।
চীনা প্রতিবেদনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভারতের ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ বা স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির ওপর জোর দেওয়া। চীনা সরকারি বিবরণে মোদির বক্তব্য হিসেবে বলা হয়েছে, ভারত স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে এবং চীনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কোনো তৃতীয় পক্ষের দ্বারা প্রভাবিত নয়। তাইওয়ান ও তিব্বত প্রশ্নে ভারতের অবস্থান অপরিবর্তিত থাকার কথাও ওই বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এই বক্তব্যগুলোর ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা রয়েছে। এসব বক্তব্য ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রকাশিত বিবরণে পাওয়া যায়নি। ফলে এগুলোকে যৌথভাবে স্বীকৃত বা হুবহু উদ্ধৃতি হিসেবে নয়, চীনা পক্ষের প্রকাশিত বৈঠক-বিবরণ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কূটনৈতিক বৈঠকের সরকারি রিডআউট সাধারণত পূর্ণাঙ্গ কথোপকথনের প্রতিলিপি নয়; কোন বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করা হবে, সেটিও সংশ্লিষ্ট পক্ষের কূটনৈতিক অবস্থান প্রকাশ করে।
চীনা সংবাদমাধ্যম চায়না ডেইলি ১৪ সেপ্টেম্বরের এক প্রতিবেদনে দুই দেশকে অংশীদার হিসেবে দেখানোর পাশাপাশি যৌথ উন্নয়ন, সরাসরি বিমান যোগাযোগ, জনগণের মধ্যে যোগাযোগ এবং বহুপক্ষীয় সমন্বয়ের বিষয়গুলো সামনে আনে। এর আগের এক সম্পাদকীয়তে মোদি-শি বৈঠককে সম্পর্কের জন্য বাস্তববাদী গতিপথ তৈরির সম্ভাবনা হিসেবে তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে প্রতিবেদনের ভাষ্যে দুই দেশের মৌলিক মতপার্থক্যগুলো অদৃশ্য হয়ে গেছে—এমন দাবি করা হয়নি।
চীনের গ্লোবাল টাইমসেও একই ধরনের একটি ব্যাখ্যা দেখা যায়। পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়া গবেষণা কেন্দ্রের ওয়াং শুর বক্তব্য উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যমটি বলেছে, ২০২৪ সালের কাজান বৈঠককে যদি সম্পর্কের মোড় পরিবর্তনের সূচনা এবং ২০২৫ সালের তিয়ানজিন বৈঠককে স্থিতিশীলতার পর্যায় হিসেবে ধরা হয়, তাহলে নয়াদিল্লির বৈঠককে আস্থা তৈরির নতুন পর্যায় হিসেবে দেখা যেতে পারে। এখানে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জনগণের মধ্যে যোগাযোগ এবং বহুপক্ষীয় সহযোগিতাকে রাজনৈতিক সমঝোতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার সম্ভাব্য ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হয়েছে।
তবে চীনা বিশ্লেষকদের সব বক্তব্য যে একই রকম আশাবাদী, তা নয়। ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক লিন মিনওয়াংয়ের একটি মন্তব্যে ভারত-চীন সম্পর্কের সামগ্রিক গতিপথকে স্থিতিশীল ও উন্নতিশীল বলা হলেও ভিসা, চীনা বিনিয়োগ এবং ভারতের চীননীতি কতটা টেকসই হবে—এসব বিষয়ে সতর্কতার কথা বলা হয়েছে। এটি সরকারি চীনা অবস্থান নয়, বরং একজন চীনা শিক্ষাবিদের বিশ্লেষণ।
ব্রিকসকে কেন্দ্র করে চীন-ভারত সম্পর্কের সম্ভাব্য সহযোগিতার ক্ষেত্রও বিস্তৃতভাবে আলোচিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, ডিজিটাল শিল্প, স্মার্ট উৎপাদন এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন—এসব বিষয়কে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সম্ভাব্য ক্ষেত্র হিসেবে চীনা বিশ্লেষণে সামনে আনা হয়েছে। শি জিনপিংয়ের ব্রিকস-সংক্রান্ত বক্তব্যেও উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্ল্যাটফর্ম এবং বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার প্রসঙ্গ গুরুত্ব পেয়েছে।
এখানে ভারতের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বাস্তবতা রয়েছে। নয়াদিল্লি একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, কোয়াড, রাশিয়া, ব্রিকস এবং অন্যান্য বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্মে সক্রিয়। ফলে ভারতকে কেবল কোনো একটি শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। ব্রিকসের বর্তমান কাঠামোতেও ভারত একদিকে চীনের সঙ্গে সহযোগিতা করছে, অন্যদিকে নিজেদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন এবং জাতীয় স্বার্থের বিষয়গুলো আলাদাভাবে তুলে ধরছে। সাম্প্রতিক চীনা ভাষ্যেও ভারতের এই স্বাতন্ত্র্যকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
তবে চীন-ভারত সম্পর্কের সামনে সীমান্ত বিরোধ, বাণিজ্য ভারসাম্য, বিনিয়োগ, বাজারে প্রবেশাধিকার এবং পারস্পরিক আস্থার মতো প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে। তাই ব্রিকস সম্মেলনের পর চীনা গণমাধ্যমের পরিবর্তিত ভাষাকে সরাসরি ‘সম্পর্কের পুনর্মিলন’ হিসেবে দেখা যথাযথ হবে না। বরং এটি দুই দেশের সম্পর্ককে সংঘাতের একক কাঠামোর বাইরে এনে সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতাকে পাশাপাশি রাখার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে।
মূল প্রশ্নটি এখন হলো, এই নতুন ভাষ্য কতটা স্থায়ী হয়। সাম্প্রতিক বৈঠকের পর চীনা আলোচনায় ভারতকে এমন একটি শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে যার সঙ্গে সহযোগিতা চীনের বৃহত্তর বৈশ্বিক দক্ষিণ ও বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু পরবর্তী কোনো গুরুতর সীমান্ত, বাণিজ্য বা কৌশলগত বিরোধ দেখা দিলে এই দৃষ্টিভঙ্গি কতটা টিকে থাকে, সেটিই চীন-ভারত সম্পর্কের বাস্তব পরিবর্তনের গভীরতা বোঝার গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: সাউথ এশিয়া মনিটর, গ্লোবাল টাইমস, সিনহুয়া ও চায়না ডেইলি