বিতর্কিত ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়ায় লাখ লাখ ভোটার তালিকা থেকে বাদ
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফা শুরু হতেই সবচেয়ে বড় আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে বিতর্কিত ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে লাখ লাখ ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার অভিযোগ এখন রাজ্যের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। এই নির্বাচন তাই শুধু ক্ষমতার লড়াই নয়; বরং গণতান্ত্রিক অধিকার বনাম প্রশাসনিক কৌশলের এক তীব্র সংঘাতে পরিণত হয়েছে।
সকাল থেকেই কড়া নিরাপত্তার মধ্যে ১৬ জেলার ১৫২টি আসনে ভোটগ্রহণ শুরু হলেও ভোটের পরিবেশকে ঘিরে রয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা ও অবিশ্বাস। নির্বাচন কমিশনের একের পর এক বিধিনিষেধ, বিপুলসংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি, সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত, কিন্তু প্রশ্ন উঠছে: এই নিয়ন্ত্রণ কি নিরাপত্তার জন্য, নাকি রাজনৈতিক ফলাফল প্রভাবিত করার একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ?
সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি করেছে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৯১ লাখ নাম বাদ যাওয়ার অভিযোগ, যার মধ্যে অন্তত ৪০ লাখ বৈধ ভোটার রয়েছেন বলে দাবি শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের। পরিসংখ্যান বলছে, যেখানে আগে ভোটার ছিলেন প্রায় ৩ কোটি ৯৮ লাখ, তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৬০ লাখে। এই হ্রাস কেবল সংখ্যার নয়, বরং প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে বড় ধাক্কা, যা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়া কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়; বরং একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে। অভিযোগ উঠেছে, বিজেপি সরাসরি জনসমর্থনে পিছিয়ে থাকায় ভোটার তালিকায় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে নির্বাচনি সমীকরণ বদলানোর চেষ্টা করছে। বিহারে পূর্বে প্রয়োগ করা অনুরূপ কৌশলের পুনরাবৃত্তি হিসেবেও অনেকে এটিকে দেখছেন।
অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেস এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে জনমত সংগঠিত করার চেষ্টা করছে। ‘ভোটাধিকার রক্ষা মঞ্চ’-এর ‘কালো দিবস’ পালনের ডাক এবং কলকাতাসহ বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ সবই প্রমাণ করছে যে ভোটের আগে জনমনে ক্ষোভ জমে উঠেছে। এই ক্ষোভই নির্বাচনের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
রাজনৈতিক মেরূকরণও এবার চরমে পৌঁছেছে। একদিকে বিজেপি উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, অন্যদিকে ধর্মীয় ইস্যু উসকে দিয়ে ভোটব্যাংক সুসংহত করার চেষ্টা করছে। পাল্টা হিসেবে তৃণমূল বিজেপির এই অবস্থানকে ‘বহিরাগত আগ্রাসন’ হিসেবে তুলে ধরে আঞ্চলিক পরিচয়ের প্রশ্নকে সামনে আনছে।
বিশেষ করে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলাগুলোয় ভোটের সমীকরণ অত্যন্ত স্পর্শকাতর। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা যেমন বিভ্রান্তি তৈরি করেছে, তেমনি এই ভয় সংখ্যালঘু ভোটকে আরও সংহত করেও তুলতে পারে যা শেষ পর্যন্ত উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে বিজেপির জন্য।
সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচন এখন আর শুধু একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়; এটি হয়ে উঠেছে গণতন্ত্রের মৌলিক কাঠামো নিয়ে এক বাস্তব পরীক্ষা। ‘এসআইআর’ ইস্যু যে ছায়া ফেলেছে, তা কাটিয়ে উঠতে না পারলে ফলাফল ঘোষণার পরও রাজনৈতিক অস্থিরতা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
৪ মে ফলাফল যাই হোক, এই নির্বাচন ইতিমধ্যেই একটি প্রশ্ন স্পষ্ট করে দিয়েছে ভোট কি শুধুই সংখ্যা, নাকি নাগরিক অস্তিত্বের শেষ আশ্রয়?
এআরবি