বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতে প্রায় ২০ কোটি মুসলমানের রাজনৈতিক অধিকার ও প্রতিনিধিত্ব কতটা নিশ্চিত—এ প্রশ্ন ঘিরে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। কারাবন্দি মুসলিম শিক্ষাবিদ শারজিল ইমামের এক সাক্ষাৎকারে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, সংবিধান ও রাজনীতিতে মুসলমানদের অবস্থান নিয়ে নানা বক্তব্য উঠে এসেছে। তার এসব বক্তব্যের পক্ষে-বিপক্ষে মত দিয়েছেন শিক্ষাবিদ, আইনজ্ঞ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখকেরা।
৩৮ বছর বয়সি শারজিল ইমাম গত ২৯ সেপ্টেম্বর দিল্লির কারাগার থেকে ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য কুইন্টকে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দেন। সেখানে তিনি ভারতের ১৪০ কোটি মানুষের মধ্যে মুসলমানদের সংখ্যা প্রায় ২১ কোটি বলে উল্লেখ করেন।
তার অভিযোগ, এত বিপুল জনগোষ্ঠী হলেও দেশটির গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মুসলমানদের কার্যত কোনো রাজনৈতিক প্রভাব নেই।
ইমাম বলেন, ভারতের সংবিধানে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার প্রবণতা রয়েছে। দেশটির ধর্মনিরপেক্ষতার ধরনকে তিনি ‘বিশেষভাবে ইসলামবিদ্বেষী ও সংকীর্ণ’ বলে আখ্যা দেন। তার দাবি, গণতন্ত্রকে মুসলমানদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও অধিকার থেকে বঞ্চিত করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
কে এই শারজিল ইমাম
ভারতের দরিদ্রতম রাজ্যগুলোর একটি বিহারের জাহানাবাদ জেলার বাসিন্দা শারজিল ইমাম। তিনি মুম্বাইয়ের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (আইআইটি) থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞানে স্নাতক করেন। পরে সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করেন। এরপর আবার পড়াশোনায় ফিরে দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) সেন্টার ফর হিস্টোরিক্যাল স্টাডিজে পিএইচডি গবেষণা শুরু করেন। ভারতের মুসলমানদের রাজনৈতিক ইতিহাস ছিল তার গবেষণার মূল বিষয়।
২০১৯ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার কয়েক মাস পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন হিন্দুত্ববাদী সরকার বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইন পাস করে। ওই আইনে ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে আসা অমুসলিম শরণার্থীদের দ্রুত নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। জাতিসংঘ আইনটিকে মুসলমানদের প্রতি ‘মৌলিকভাবে বৈষম্যমূলক’ বলে আখ্যা দেয়।
আইনটি পাস হওয়ার পর দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। মুসলমানদের নেতৃত্বে, বিশেষ করে নারীদের অংশগ্রহণে, দিল্লির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ঘনবসতিপূর্ণ মুসলিম অধ্যুষিত শাহিনবাগে কয়েক সপ্তাহ ধরে অবস্থান কর্মসূচি চলে। নাগরিকত্ব আইনবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠে এলাকাটি।
শারজিল ইমাম ছিলেন শাহিনবাগের অবস্থান কর্মসূচির অন্যতম সংগঠক। বিক্ষোভের সময় দেওয়া বক্তব্যের মাধ্যমে সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তবে তার গ্রেপ্তারের আগে কোনো সহিংসতা ঘটেনি। পরের মাসে দিল্লির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে নাগরিকত্ব আইনবিরোধী অবস্থান কর্মসূচিতে হামলা চালায় বিভিন্ন দল। ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতাদের বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের পর এসব হামলা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সহিংসতা শুরুর সময় ইমাম কারাগারে থাকলেও তার বিরুদ্ধে দাঙ্গা, হত্যা, হত্যাচেষ্টা, রাষ্ট্রদ্রোহ এবং ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে শত্রুতা ছড়ানোর অভিযোগ আনা হয়। এসব অভিযোগে কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইনও প্রয়োগ করা হয়।
ইমাম একা নন। জেএনইউর আরেক শিক্ষার্থী উমর খালিদসহ প্রায় ১২ জন মুসলিম শিক্ষার্থী ও অধিকারকর্মীকে ২০২০ সালের দিল্লি দাঙ্গার ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের অনেকে এখনো বিচার ছাড়াই কারাগারে রয়েছেন। বারবার জামিনের আবেদনও প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো তাদের দীর্ঘদিনের কারাবাসকে ক্ষমতার ‘চরম অপব্যবহার’ বলে আখ্যা দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, এ ক্ষেত্রে বিচারিক নজরদারির ঘাটতি রয়েছে এবং অভিযুক্তদের নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার আগেই দোষী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
ইমামের মতে, মুসলমানদের লক্ষ্য করে ক্ষমতার এমন অপব্যবহার বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এর শিকড় ভারতের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণার মধ্যেই রয়েছে।
‘ধর্মনিরপেক্ষতা ও হিন্দুত্ববাদ একই ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে’
দ্য কুইন্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা মহাত্মা গান্ধীকে ‘ফ্যাসিবাদী’ বলে আখ্যা দেন ইমাম। তার অভিযোগ, গান্ধী স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া কংগ্রেসকে মূলত একটি হিন্দু দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
তার মতে, গান্ধীর কিছু ধারণা ও চর্চার সঙ্গে এখন মোদির বিজেপি এবং দলটির আদর্শিক সংগঠন উগ্রডানপন্থি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) প্রচারিত ধারণার মিল রয়েছে।
১৯২৫ সালে ইউরোপের ফ্যাসিবাদী দলগুলোর আদলে প্রতিষ্ঠিত আরএসএসের লক্ষ্য হলো সাংবিধানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতকে একটি জাতিগত হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করা।
ইমাম ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকেও সমালোচনা করেন। তার অভিযোগ, নেহরু ‘দ্য ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া’ বইয়ে ভারতকে প্রাচীন ও ‘অনন্য সহনশীল’ সভ্যতা হিসেবে তুলে ধরতে গিয়ে অসত্য ও কল্পকাহিনির আশ্রয় নিয়েছেন।
তবে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী উদারপন্থিদের প্রতি সবচেয়ে কঠোর সমালোচনা করেন ইমাম। তার দাবি, বিজেপি ও আরএসএসের সমর্থকদের সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী উদারপন্থিদের মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই।
ইমাম বলেন, ‘সংক্ষেপে, ধর্মনিরপেক্ষতা ও হিন্দুত্ববাদ—উভয় কাঠামোর মূল ধারণা একই। তা হলো একরূপতার মিথ, ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা এবং ক্ষমতা ভাগাভাগি করতে অস্বীকার করা।’
হিন্দুত্ববাদ বলতে আরএসএস ও বিজেপির প্রচারিত হিন্দু আধিপত্যবাদী আন্দোলনকে বোঝানো হয়েছে। এর লক্ষ্য, সাংবিধানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতকে একটি জাতিগত হিন্দু রাষ্ট্রে রূপান্তর করা।
ইমামের বক্তব্যের সমালোচনাও রয়েছে
দ্য কুইন্টে ইমামের বক্তব্যের জবাবে আইনজ্ঞ মোহাম্মদ জিশান আহমদ বলেন, ইমাম গুরুতর ঐতিহাসিক ও আদর্শিক প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বিচারাধীন বলে এসব প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্গে হিন্দুত্ববাদকে এক করে দেখানোর যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়।
আহমদ লিখেছেন, ইমামের বক্তব্যে মুসলমানদের একটি অভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠী হিসেবে তুলে ধরার ঝুঁকি রয়েছে। এতে শ্রেণি, জাতপাত, লিঙ্গ, অঞ্চল ও আদর্শগত মতপার্থক্য আড়ালে পড়ে যায়।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, ইমামের রাজনৈতিক ভাবনায় পিছিয়ে পড়া জাতপাতের মুসলমানদের অবস্থান কোথায়? মুসলিম সমাজের নারীদের অধিকার ও লিঙ্গসমতার বিষয়টি কোথায়? ‘কওম’ বা সম্প্রদায়ের হয়ে কথা বলার অধিকার কার? একটি রাজনৈতিক কণ্ঠ যখন পুরো সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব দাবি করে, তখন কার অভিজ্ঞতা আড়ালে পড়ে যায়?
তুরস্কের ইবনে খালদুন বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং দক্ষিণ এশিয়ার মুসলমানদের নিয়ে একাধিক বইয়ের লেখক ইরফান আহমদ অবশ্য ইমামের বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকের সঙ্গে একমত।
আলজাজিরাকে তিনি বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে পার্থক্য আছে কি না, তা নিয়ে ইমামের প্রশ্ন তোলা যথার্থ।
ইরফান আহমদের মতে, ভারতীয় জাতীয়তাবাদে কংগ্রেসের ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ জাতীয়তাবাদ এবং ডানপন্থি শক্তির ‘সাম্প্রদায়িক’ জাতীয়তাবাদকে আলাদা করে দেখানো হয়। কিন্তু বাস্তবে কংগ্রেসের ভেতরেও জাতিগত ও বর্ণবাদী হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের উপস্থিতি ছিল।
তিনি বলেন, কংগ্রেস থেকে প্রকাশ্য হিন্দুত্ববাদী দলগুলোতে নেতাদের যাতায়াত ছিল সহজ। উদাহরণ হিসেবে লালা লাজপত রায়, কে এম মুন্সি, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি ও মদনমোহন মালব্যের নাম উল্লেখ করেন তিনি। আরএসএসের প্রতিষ্ঠাতা কে বি হেডগেওয়ারও একসময় কংগ্রেসে ছিলেন।
ইরফান আহমদ বলেন, কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে পার্থক্য অনেকটা যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটিক পার্টির পার্থক্যের মতো। উভয় দলই ‘মার্কিন স্বার্থ’ এগিয়ে নিতে একমত এবং দেশের বাইরে যুদ্ধ চালায়।
তার মতে, ভারতের মুসলমানদের সমস্যাটি কেবল দলীয় রাজনীতির নয়। বরং ভারতীয় বা হিন্দু জাতীয়তাবাদের ধারণাই মূল সমস্যা। বামপন্থি দলসহ ভারতের সব রাজনৈতিক দলই এই জাতীয়তাবাদের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত।
তিনি বলেন, কোনো গণতন্ত্র যদি নিয়মিতভাবে একটি জনগোষ্ঠীকে—এ ক্ষেত্রে মুসলমানদের—আইনসভায় প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে অদৃশ্য করে রাখে, তাহলে সেই গণতন্ত্রের মৌলিক ত্রুটি রয়েছে। ভারতের সংসদে মুসলমানদের প্রতিনিধিত্বের হার কমে আসা তাদের কণ্ঠ স্তব্ধ করে দেওয়ার প্রমাণ।
ইরফান আহমদের মতে, প্রশ্ন হওয়া উচিত—ধর্মনিরপেক্ষ ভারত সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা কতটা সঠিক?
মুসলমানদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রস্তাব
দ্য কুইন্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইমাম ভারতের জন্য এমন একটি ‘সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্রের’ প্রস্তাব দেন, যেখানে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অধিকারের নিশ্চয়তা থাকবে।
তার দাবি, ১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশ ভাগ হওয়ার পেছনে কংগ্রেসের ভূমিকা ছিল। ওই বিভাজনের মধ্য দিয়ে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ পাকিস্তানের জন্ম হয়।
ইমাম পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলি জিন্নাহকে ‘একজন মহান গণতান্ত্রিক নেতা’ বলে আখ্যা দেন। কবি ও দার্শনিক মুহাম্মদ ইকবালকে নিজের রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
ধর্মভিত্তিক ক্ষমতা ভাগাভাগির পক্ষে অবস্থান নিয়ে ইমাম ইকবালের ‘ভারতের মধ্যে একটি মুসলিম ভারত’ প্রতিষ্ঠার ধারণা তুলে ধরেন। ভারতের নির্বাচনে প্রচলিত ‘যে প্রার্থী সবচেয়ে বেশি ভোট পান, তিনিই বিজয়ী’ (এফপিটিপি) পদ্ধতির পরিবর্তে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব চালুর দাবি জানান তিনি।
ইমাম বলেন, ‘ইকবাল ও জিন্নাহ যথার্থভাবেই আগেই বুঝেছিলেন, কোনো সুরক্ষা ছাড়াই এফপিটিপি পদ্ধতি মুসলমানদের স্থায়ীভাবে প্রান্তিক করে রাখবে। দেশভাগের আগেও মুসলমানেরা ছিলেন ঘৃণিত সংখ্যালঘু, উদীয়মান জাতীয়তাবাদী বক্তব্যে ঘৃণিত “অপর”। ইতিহাস তাদের সঠিক প্রমাণ করেছে।’
তবে দ্য প্রিন্ট ওয়েবসাইটে ছদ্মনামে লেখা এক কলামে ইবনে-ই-খালদুন ভারতী ইমামের বক্তব্যের সমালোচনা করেন। তার দাবি, ইমাম একটি ‘ইসলামপন্থি রাজনৈতিক কর্মসূচি’ তুলে ধরছেন, যার লক্ষ্য ভারতের ভেতরে আরেকটি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করা।
ভারতী ইমামকে ‘উদারতাবাদবিরোধী, ধর্মনিরপেক্ষতাবিরোধী, গণতন্ত্রবিরোধী ও সংবিধানবিরোধী’ বলে আখ্যা দেন। তার মতে, ইমামের চিন্তাবিদেরা ভারত শাসনের অধিকার নিয়ে বিভ্রান্ত। তারা নিজেদের জাতি হিসেবে বিবেচনা করবেন, নাকি সংখ্যালঘু হিসেবে—তা নিয়ে দ্বিধায় রয়েছেন।
ভারতী লিখেছেন, ‘একটি জাতির রাষ্ট্র প্রয়োজন, আর সংখ্যালঘুদের প্রয়োজন সাংবিধানিক নিশ্চয়তা। তত্ত্ব বা বাস্তব—কোনো ক্ষেত্রেই একই সঙ্গে দুটো হওয়া সম্ভব নয়।’
তার অভিযোগ, মুসলিম নেতারা নিজেদের জন্য একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন, আবার সংখ্যালঘু হিসেবে বিশেষ সুবিধাও নিশ্চিত করেছেন।
‘ছয় বছর ধরে কারাগারে, অথচ সহিংসতার আহ্বান জানাননি’
ভারতীর বক্তব্যের সমালোচনা করে রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিম আলি পুরো ঘটনাকে ‘কাফকাসুলভ’ বলে উল্লেখ করেন। কাফকাসুলভ বলতে তিনি এমন এক পরিস্থিতি বোঝান, যেখানে বাস্তবতা অযৌক্তিক ও দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে।
দ্য টেলিগ্রাফ পত্রিকায় এক কলামে আলি লেখেন, ইমাম এমন একটি বক্তব্যের জন্য প্রায় ছয় বছর ধরে কারাগারে রয়েছেন, যেখানে তিনি মূলত ‘চাকা জাম’ বা সড়ক অবরোধের আহ্বান জানিয়েছিলেন; সহিংসতার কোনো আহ্বান জানাননি। অথচ তার বিরুদ্ধে দিল্লি দাঙ্গায় ষড়যন্ত্রের অভিযোগও আনা হয়েছে। ওই দাঙ্গা সংঘটিত হয়েছিল তার কারাবন্দি হওয়ার এক মাস পর।
আলি বলেন, ইমামের মতো মুসলমানদের অভিজ্ঞতার মধ্যে শুধু ব্যক্তিগত বৈষম্যই নেই; বরং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পুনরাবৃত্ত ইতিহাস, সন্ত্রাসবাদী মামলায় মুসলিম পুরুষদের ফাঁসানো, পুলিশের নির্যাতনসহ নানা অভিজ্ঞতাও রয়েছে।
গান্ধী ও জিন্নাহ সম্পর্কে ইমামের মূল্যায়নকে ‘চরম বিকৃত’ এবং স্বাধীনতার আগের ও দেশভাগের ইতিহাস সম্পর্কে তার ব্যাখ্যাকে ‘বিকৃত’ বলে মনে করেন আলি। তবে তিনি স্বীকার করেন, ভারতে এমন একটি উগ্র গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রকল্পের জায়গা থাকা উচিত, যেখানে ইমামের মতো ব্যক্তিরা সবার সমতা ও স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করতে পারেন।
আলির মতে, ইমাম মধ্যবিত্ত মুসলিম অধিকারকর্মীদের একটি বুদ্ধিবৃত্তিক চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর নেতা হিসেবে ভূমিকা রাখতে চান। তার লক্ষ্য, মুসলমানদের দাবি তুলে ধরার ক্ষেত্রে ধর্মীয় নেতাদের পরিবর্তে এই গোষ্ঠীকে প্রধান কণ্ঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
শারজিল ইমাম বনাম উমর খালিদ: ‘আদর্শ’ মুসলিম কে?
ভারতের মুসলমানদের ভবিষ্যৎ বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনায় শারজিল ইমাম ও উমর খালিদের তুলনা প্রায়ই উঠে আসে। ২০২০ সালের দিল্লি দাঙ্গার ‘মূল পরিকল্পনাকারী’ হিসেবে দুজনকেই অভিযুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে তারা দিল্লির একই কারাগারে রয়েছেন।
তবে তাদের রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
৩৯ বছর বয়সি উমর খালিদ বামপন্থি অধিকারকর্মী। ইমামের মতো তিনি ভারতের সংবিধান, গণতন্ত্র বা ধর্মনিরপেক্ষতাকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন না। বক্তব্য ও লেখায় তিনি প্রায়ই গান্ধীর অহিংস প্রতিরোধের নীতির কথা তুলে ধরেছেন।
ভারতের মার্ক্সবাদী ও উদারপন্থিরা খালিদকে ‘আদর্শ মুসলিম’ হিসেবে তুলে ধরেন। তাদের মতে, বিজেপির বিদ্বেষমূলক রাজনীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করায় মুসলমানবিরোধী সরকার তাকে শাস্তি দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্যক্তি ও মানবাধিকার সংগঠনও তার মুক্তির দাবি জানিয়ে আসছে।
তাদের মধ্যে রয়েছেন নিউইয়র্ক শহরের মেয়র জোহরান মামদানি। চলতি বছরের জুলাইয়ে নেলসন ম্যান্ডেলা গ্লোবাল লিডারশিপ ফোরামে উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি খালিদের কারাবাস নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
মামদানি বলেন, ‘উমর খালিদ যখন দিল্লিতে একই মনগড়া সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে ষষ্ঠ বছরের কারাবাসে প্রবেশ করছেন, তখন আমাদের আর কত দিন অপেক্ষা করতে হবে? মাদিবার (নেলসন ম্যান্ডেলার) বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছিল।’
ভারতীয় বংশোদ্ভূত মামদানি মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর দ্বিতীয়বারের মতো খালিদ প্রসঙ্গে কথা বলেন। এর আগে জানুয়ারিতে তিনি খালিদের মা-বাবার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। খালিদের জন্য হাতে লেখা একটি বার্তাও রেখে যান তিনি। তাতে লেখা ছিল, ‘প্রিয় উমর, তিক্ততা নিয়ে তোমার কথাগুলো প্রায়ই মনে পড়ে। নিজের ভেতর সেই তিক্ততাকে জায়গা না দেওয়ার গুরুত্বও মনে রাখি। তোমার মা-বাবার সঙ্গে দেখা করে ভালো লাগল। আমরা সবাই তোমার কথা ভাবছি।’
গত মাসে আয়ারল্যান্ডভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ফ্রন্ট লাইন ডিফেন্ডার্স ২০২৬ সালের ঝুঁকিতে থাকা মানবাধিকারকর্মীদের পুরস্কারের জন্য খালিদের নাম ঘোষণা করে।
তবে ইমামকে ঘিরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এমন সংহতি দেখা যায় না। তার প্রতি সমর্থন মূলত ভারতের মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
অধ্যাপক ইরফান আহমদ প্রশ্ন তোলেন, ‘জোহরান মামদানির উদাহরণ দেখুন। তিনি উমর খালিদের বিষয়ে কথা বলেছেন। কিন্তু শারজিল ইমামের নাম উল্লেখ করা তো দূরের কথা, তার পক্ষে কথা বলতেও কী বাধা রয়েছে?’
তার মতে, মামদানির মতো ব্যক্তিরা কিংবা ভারতের বামপন্থি উদারপন্থিরা খালিদের পক্ষে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, কারণ খালিদ ‘ধর্মনিরপেক্ষ’। তিনি নিজেকে মুসলিম হিসেবে তুলে ধরেন না কিংবা রাজনীতিতে ইসলামের ভাষা ব্যবহার করেন না।
অন্যদিকে ইমাম ইসলামি পরিভাষায় নিজের রাজনৈতিক বক্তব্য তুলে ধরেন। অধ্যাপক ইরফান আহমদের মতে, খালিদের পক্ষে উদারপন্থীদের জোরালো বক্তব্য এবং ইমামের বিষয়ে নীরবতা বুদ্ধিবৃত্তিক বিভ্রান্তি, এমনকি নৈতিক কাপুরুষতারও লক্ষণ।
মুসলমানদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে ইমাম ভবিষ্যতে ভূমিকা রাখতে পারবেন কি না, জানতে চাইলে অধ্যাপক আহমদ বলেন, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তার কোনো ‘গোপন চাবি’ নেই। তবে তিনি আশঙ্কা করেন, বর্তমান সরকার এমন কণ্ঠগুলোকে দমন করতে পারে।
তার মতে, ইমামের কারাবাসের সঙ্গে ১৯২৬ সালে ইতালির মার্ক্সবাদী চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামশির কারাবন্দি হওয়ার ঘটনার মিল রয়েছে। গ্রামশির বিচারের সময় সরকারি কৌঁসুলি বলেছিলেন, ‘২০ বছরের জন্য আমাদের এই মস্তিষ্কের কাজ বন্ধ করতে হবে।’ ইমামও প্রায় সাত বছর ধরে অন্যায়ভাবে কারাগারে রয়েছেন।
শেষে অধ্যাপক আহমদ ১৯ শতকের দার্শনিক হেনরি ডেভিড থোরোর একটি বক্তব্য তুলে ধরেন। মুসলমান ও অমুসলমান—উভয় সম্প্রদায়ের ইমাম, খালিদ এবং অন্যান্য ‘বিবেকের বন্দির’ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘অন্যায় ব্যবস্থায় একজন ন্যায়পরায়ণ মানুষের প্রকৃত জায়গা কারাগারেও হতে পারে।’
এএম